বিশেষ প্রতিনিধি
আগামী ১৮ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া পবিত্র হজ ফ্লাইট কার্যক্রমের ঠিক আগমুহূর্তে গুরুতর উড়োজাহাজ সংকটে পড়েছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বহরে পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ না থাকা, একাধিক বিমানের কারিগরি ত্রুটি এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ উড়োজাহাজ বিদেশে মেরামতে থাকায় ফ্লাইট পরিচালনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই সংকট অব্যাহত থাকলে হজ ফ্লাইট শিডিউল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়তে পারে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজযাত্রী সৌদি আরবে যাওয়ার কথা। এর বড় অংশ পরিবহনের দায়িত্ব বিমানের ওপর বর্তায়।
হজ মৌসুমে সাধারণত প্রশস্ত উড়োজাহাজ (ওয়াইডবডি) বেশি প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই ধরনের উড়োজাহাজের ঘাটতির কারণে শেষ মুহূর্তে বড় ধরনের ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে বিমানের বহরে মোট উড়োজাহাজ রয়েছে ১৯টি, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক রুটে নিয়মিত সচল রয়েছে মাত্র ১৪টি। অথচ বর্তমান যাত্রীচাপ ও রুট পরিচালনার জন্য প্রয়োজন অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি উড়োজাহাজ।
বিমানের বহরে বর্তমানে রয়েছে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর; ছয়টি বোয়িং ৭৮৭ (ড্রিমলাইনার সিরিজ); চারটি বোয়িং ৭৩৭; এবং পাঁচটি ড্যাশ-৮ কিউ৪০০। গত পাঁচ বছরে নতুন কোনো উড়োজাহাজ যুক্ত না হওয়া এবং লিজের মেয়াদ শেষে দুইটি বিমান ফেরত দেওয়ায় বহর সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
বর্তমানে বিমানের অন্তত চারটি প্রশস্ত (ওয়াইডবডি) উড়োজাহাজ অচল রয়েছে—যার মধ্যে তিনটি বোয়িং ৭৮৭ এবং একটি বোয়িং ৭৭৭। এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বোয়িং উড়োজাহাজ ইতালির রোম শহরে মেরামতের জন্য অবস্থান করছে। উড়োজাহাজটি ৮ এপ্রিল দেশে ফেরার কথা থাকলেও এখনো ফেরেনি।
বিমান কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১২ এপ্রিলের মধ্যে উড়োজাহাজটি ফেরত না এলে হজ ফ্লাইটের সময়সূচি ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়বে
ফ্লাইট বাতিলের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
একজন জ্যেষ্ঠ পাইলট বলেন, “উড়োজাহাজের অনিশ্চিত প্রাপ্যতার কারণে কার্যকর শিডিউল তৈরি করা যাচ্ছে না। ফ্লাইট অপারেশন প্রায় ভেঙে পড়ার মতো অবস্থায়।”
গত এক মাসে বিমানের বোয়িং ও ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজে অন্তত ১০টি কারিগরি ত্রুটির ঘটনা ঘটেছে। উড্ডয়নের আগে বা পরে এসব ত্রুটি ধরা পড়ায় যাত্রী নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যে ফ্লাইট পরিচালনায় পড়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা–কুয়েত রুটে ২৪ ঘণ্টা বিলম্ব এবং ঢাকা–চট্টগ্রাম–দুবাই রুটেও একই ধরনের বিলম্বের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষক কাজি ওয়াহিদুল আলম বলেন— “বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বহর সংকটের কারণে বিমান ব্যবসায়িকভাবে পিছিয়ে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। দ্রুত নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করা জরুরি।”
তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর সিদ্ধান্তের অভাব এবং অদক্ষ ক্রয়নীতিই এই সংকটের মূল কারণ।
বিমানের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম জানিয়েছেন— “হজযাত্রীদের যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে আমরা কাজ করছি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধারাবাহিকভাবে বৈঠক চলছে। আশা করছি বড় ধরনের সংকট হবে না।”
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। এরমধ্যে ধীর সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া, লিজিং ব্যর্থতা ও বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, উড়োজাহাজ কেনা বা লিজ নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিল সরকারি নিয়ম ও দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া সময়ক্ষেপণের প্রধান কারণ। গত বছরে একাধিকবার টেন্ডার আহ্বান করেও আন্তর্জাতিক লিজদাতাদের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। বিশ্বব্যাপী উড়োজাহাজের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিমান সরবরাহে ৫–৬ বছর পর্যন্ত সময় লাগছে।
বিমানের ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৩৪ সালের মধ্যে বহর ১৯ থেকে বাড়িয়ে ৪৭টি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বোয়িং উড়োজাহাজ সরবরাহ শুরু হতে ২০৩৭ সাল অতিক্রম করতে পারে। ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসের থেকেও দ্রুত সরবরাহের সম্ভাবনা সীমিত। ফলে স্বল্পমেয়াদে ভাড়া করা বা ইজারা নেওয়া বিমান ছাড়া এই সংকট নিরসনের সম্ভাবনা কম।
দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স বর্তমানে ২৫টি উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে, যার বেশিরভাগই লিজ নেওয়া। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কম জটিল প্রক্রিয়ার কারণে তারা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে বলে সুত্রগুলো দাবি করেছে।
ঢাকার প্রধান বিমানবন্দরে যাত্রী সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৩ সালে ঢাকার প্রধান বিমানবন্দরে মোট যাত্রীর সংখ্যা ছিল ১.১৭ কোটি, যা প্রায় ৭% বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সালে ১.২৫ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। বিদেশগামী শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ফলে মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটে চাপ আরও বেড়েছে।
বিমান সর্বশেষ অর্থবছরে ৯৩৭ কোটি টাকা মুনাফা করলেও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রায় ৬,০৬৮ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে, যার বড় অংশ সারচার্জ।
হজ মৌসুমের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উড়োজাহাজ সংকট শুধু সাময়িক অপারেশনাল সমস্যা নয়; এটি বিমানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত অচল উড়োজাহাজ সচল করা; স্বল্পমেয়াদে লিজিংয়ের মাধ্যমে বহর বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ক্রয়নীতির সংস্কার করা জরুরি। এই তিনটি পদক্ষেপ ছাড়া সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। অন্যথায়, হজযাত্রীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

