এমএনএ অর্থনীতি ডেস্ক : করোনার বড় ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে দেশের অর্থনীতি। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ছাড়া অন্য সব সূচকই এখন ইতিবাচক। রফতানি আয়ে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। আমদানি বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। রাজস্ব আদায়ের গতিও বেশ ভালো। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আছে। পুঁজিবাজারেও কিছুদিন ধরে চাঙা ভাব। মাথাপিছু আয়ে ফের ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। তবে বিনিয়োগে স্থবিরতা এখনও রয়েই গেছে। ইতিবাচক খবরে আত্মতুষ্টিতে না ভুগে এখন বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে সরকারকে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
মহামারির কারণে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে। কোনো কোনো দেশে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। সরকার চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। বিশ^ব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, এবার বাংলাদেশে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে আশার কথা শুনিয়ে উন্নয়ন সংস্থাটি বলেছে, ভবিষ্যতে দেশটির অর্থনীতি আরও চাঙা হবে।
ম্যানিলাভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, এই অর্থবছরে বাংলাদেশে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে ৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। আর আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরে হবে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক মূল্যস্ফীতি কিছুদিন ধরে সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। বিবিএসের সর্বশেষ হিসাবে গত সেপ্টেম্বর মাসে পয়েন্ট টু ভিত্তিতে (মাসওয়ারি) মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৩ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে সরকার।
এদিকে রেমিট্যান্স কমায় আর আমদানি বাড়ায় বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েছে। সর্বশেষ গত রোববার ৪৬ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলত রফতানি আয়ের ওপর ভর করেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। করোনা মহামারির মধ্যেই পণ্য রফতানিতে নতুন রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ। গত অক্টোবর মাসে দেশের উদ্যোক্তারা মোট ৪৭২ কোটি ডলার বা ৪০ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকার পণ্য রফতানি করেছেন। অতীতে আর কোনো মাসেই এই পরিমাণ পণ্য রফতানি হয়নি। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ৪১৭ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছিল। এদিকে রফতানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আমদানি। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাওয়া লেগেছে আমদানির পালে। আর এই আমদানি বাড়াকে দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গল বলছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের দুই মাসের (জুলাই-আগস্ট) আমদানির তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, সব মিলিয়ে এই দুই মাসে ১ হাজার ১৭২ কোটি ৪৪ লাখ (১১.৭২ বিলিয়ন) ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৬ শতাংশ বেশি। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের অন্যতম নির্দেশক মূলধনি যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি সবই বাড়ছে।
করোনা মহামারির মধ্যেও গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬৫ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল বাংলাদেশ, যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। আর সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হচ্ছে রাজস্ব আদায়ে জোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অর্থনীতি যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা রাজস্ব আদায়ের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। করোনার প্রভাবে সৃষ্ট গভীর খাদ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে দেশের রাজস্ব খাত। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রাজস্ব আদায় বেড়েছে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় পাঁচগুণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বা রাজস্ব আহরণে সামগ্রিকভাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। এই তিন মাসে মোট রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৫৮ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৪৯ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের এই চিত্র সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে রেকর্ড তৈরি করেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ২১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম থেকে রাজস্ব আয়ে গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে গতি আরও বেড়েছে।
পুঁজিবাজারেও চাঙ্গাভাব বিরাজ করছে। টানা কয়েক মাসের উত্থানের পর মাঝে কয়েকদিন কিছুটা খারাপ অবস্থা গেলেও প্রধান বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স এখনও ৭০০০ পয়েন্টের ওপরে অবস্থান করছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

