Don't Miss
Home / আজকের সংবাদ / কোরবানির ইতিবৃত্ত ও আবশ্যকীয় জ্ঞান

কোরবানির ইতিবৃত্ত ও আবশ্যকীয় জ্ঞান

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : পৃথিবীতে মানব সভ্যতার ইতিহাসের মতো কোরবানির ইতিহাসও প্রাচীন। কোরবানির বিধান ছিলো না, এমন কোনো জাতির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘আমি প্রত্যেক জাতির জন্য কোরবানি নির্ধারণ করেছি।’ [সুরা হাজ : ৩৪]।

তবে যুগে যুগে কুরবানির নিয়ম-পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন ধারায় ছিলো। হাসান বসরী (রহ.) এর মতে, সূরা আল কাওছারে বর্ণিত ‘ফাসল্লি লি রবিবকা অনহার’ অর্থাৎ ‘আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন’ আয়াতটি নাযিল করে মহান আল্লাহ তাআলা ঈদুল আযহার সালাত আদায় ও কোরবানির নির্দেশ দান করেন। [আহকামুল কুরআন, ৩য় খন্ড, পৃ. ৪৭৫]।

আল্লাহর নির্দেশে আদিষ্ট হয়ে ২য় হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদুল আযহার সালাত আদায় ও কোরবানি করেন। সেই হতে প্রতিবছর মুসলিম উম্মাহ যথারীতি কোরবানি করে আসছে। এ হিসেবে মুসলিম উম্মাহ এ বছর ১৪৩১তম কোরবানি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে কোরবানি কী, কেন কুরবানি করতে হবে, কীভাবে কোরবানি করতে হবে, কোরবানি শিক্ষাই-বা কী? ইত্যাদি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান থাকা আমাদের একান্ত আবশ্যক।

কোরবানি কি? ‘কোরবানি’ শব্দটির মূল অক্ষর ‘কুরব’ আরবি হলেও শব্দটি ফারসি। উর্দু, হিন্দি বাংলাসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় ব্যবহৃত হয়। যার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করা হয়, তাই কোরবান অভিধায় অবহিত। কোরবানি শব্দটি কুরআন-হাদীসে ‘কোরবান’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে : ‘ইয তাক্বাররবা কুরবানান ফাতুকুবিবলা মিন আহাদিহিমা ওয়ালাম ইয়ুতাক্বাববাল মিনাল আখার…’ অর্থাৎ ‘স্মরণ কর, সে সময়ের কথা, যখন তারা দু’জন (হাবিল ও কাবিল) কোরবানি করলো। তাদের একজনের কোরবানি গৃহীত হলো অপরজনের কোরবানি গৃহীত হলো না।’ কোরবানি বা কোরবান এ শব্দটি আরবি ‘কুরবুন’ মূলধাতু থেকে এসেছে। কুরবুন অর্থ নৈকট্য লাভ। তাই যে বস্তু কারো নৈকট্য লাভের উপায় হয়, সেটাকে কোরবান বা কোরবানি বলা হয়। কোরবানি শব্দটি এ অর্থেই ইবরাহীম আলাইহিস সালামের যুগ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে।

ইতিহাসে দেখা গেছে যে, আদম আলাইহিস সালামের যুগ হতে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের যুগ পর্যন্ত কোরবানির ধরন ছিলো সত্য-মিথ্যা, হক্ব-বাতিলের মধ্যে পার্থক্য করার একটি বিশেষ উপায়। যেমন: হযরত আদম আলাইহিস সালামের পুত্রদ্বয় হাবিল ও কাবিলের মধ্যে বিবাহকে কেন্দ্র করে হক্ব-বাতিলের যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, তা নিরসনের জন্য আল্লাহ আদম আলাইহিস সালামকে অহীর মাধ্যমে কোরবানি দেয়ার বিধান জারি করলেন। এ বিষয়টি আল্লাহ তার প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এভাবে বলেছেন : ‘হে রাসূল আপনি তাদেরকে আদম আলাইহিস সালাম-এর দু‘পুত্রদ্বয়ের বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শুনান, যখন তারা উভয়ই কোরবানি করেছিল। তখন তাদের একজনের কোরবানি গৃহীত হয়েছিল এবং অপরজনের কোরবানি গৃহীত হয়নি।’ তখনকার নিয়ম অনুযায়ী যার যে সম্পদ থাকতো তা একটি উচ্চস্থানে রেখে আসতো। যার কোরবানি গৃহীত হতো; তার কোরবানিকে আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে ভস্মিভূত করে দিতো। ফলে বোঝা যেতো সেই সত্য ও হক্বপন্থী।

আর আমরা সে মহান আল্লাহরই নির্দেশে কোরবানি করি পশু যবেহ করার মাধ্যমে। এর সূচনা হয় ইবরাহীম আলাইহিস সালাম থেকে। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বপ্নে আদিষ্ট হলেন, তিনি যেনো তার প্রিয় পুত্র তের বছর বয়সী ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে কোরবানি দেন। ছেলে ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে তিনি বললেন: ‘হে প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে তোমাকে যবেহ (কুরবানী) করছি। এখন তুমি ভেবে দেখো এবং স্বপ্নের ব্যাপারে তোমার মতামত কি তা বলো।’ [সূরা আস সাফফাত : ১০২]। যেমন বাপ তেমন বেটা। তৎক্ষণাৎ অবনত মস্তকে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম বললেন: ‘হে আমার পিতা! এটা যদি আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা হয়ে থাকে, তবে আপনি আপনার কাজ সমাধা করুন। ইন্শা আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।’ [সূরা আস সাফফাত : ১০২]

অনেক বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বীয় পুত্রকে কোরবানি দিতে উদ্ধত হলেন। বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে ছুরি চালাচ্ছেন। এদিকে সন্তান ইসমাঈল আলাইহিস সালাম মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে কালেমা পড়ছেন। আল্লাহর কি মহান পরীক্ষা? এ পরীক্ষায় ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উত্তীর্ণ হলেন। সন্তানের পরিবর্তে সেখানে একটি দুম্বা আসলো। অহী নাযিল হলো: ‘হে ইবরাহীম! আপনি আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। আমি এভাবেই সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিঃসন্দেহে এটা ছিলো বড় কঠিন পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্য এক মহান বস্তু (দুম্বা)।’ [সূরা আস সাফফাত : ১০৪-১০৭]। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দুম্বাটিকে যবেহ করলেন। এটাই সেই কোরবানি যা আল্লাহর দরবারে এতোই প্রিয় ও গ্রহণীয় হয়েছিল যে, পরবর্তী সকল উম্মতের মাঝে তা অবিস্মরণীয় রূপে বিরাজমান রাখতে উম্মতে মুহাম্মাদীর উপরেও পশু যবেহ করার মাধ্যমে কোরবানি করার বিধান প্রবর্তন করেন।

কোরবানি কেন করবো? কোরবানি ধনী-গরিব, সুখী-দুঃখী নির্বিশেষে সকলের মাঝে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে। উঁচু-নিচু, জাতি-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলিয়ে একে অপরকে একই কাতারে একই সাথে আনন্দ উপভোগ করার ক্ষেত্র তৈরি করে। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোরবানি জাতির ভাগ্যে ঐক্য ও সাম্যের প্রতীক নিয়ে আসে। তাই ইসলামী শরীয়ত সামর্থবানদের উপর কোরবানি দেয়া ওয়াজিব ঘোষণা করেছে। এছাড়া কোরবানি করার পেছনে নিম্নোক্ত প্রমাণাদি অগ্রগণ্য।

১. কোরবানি করা মহান আল্লাহর বিধান; তাই সামর্থবান সকলকেই বাধ্যতামূলক কোরবানি করতে হবে। আল্লাহ বলেন : ‘‘তোমার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কোরবানি কর।’ [সূরা আল কাওছার : ২]। এ আয়াতটিতে ‘ইনহার’ তথা ‘কোরবানি কর’ বলে আদেশ দেয়া হয়েছে। অতএব সামর্থবান সকলকেই বাধ্যতামূলক কোরবানি দিতে হবে।

২. কোরবানি করেনি এমন কোনো জাতি যে বিশ্বে ছিলো; তার প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। কোরবানির বিধান সকল যুগে সকল জাতির উপর ছিলো। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেছেন : ‘আমি প্রত্যেক জাতির জন্য কোরবানি নির্ধারণ করেছি।’ [সুরা হাজ : ৩৪]

৩. হাদীসে এসেছে : একদা মহানবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে জিজ্ঞাসা করলেন : কোরবানি কী জিনিস? সাহাবায়ে কিরাম বললেন : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামই এ বিষয়ে ভাল জানেন। রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সুন্নাত।’ সাহাবায়ে কিরাম বললেন: এতে আমাদের জন্য কী ছাওয়াব রয়েছে? মহানবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: কোরবানির পশুর প্রত্যেকটি লোমের বিনিময়ে একটি করে নেকী হবে। [ইবনে মাযাহ]

৪. কোরবানির অসংখ্য ফযিলত রয়েছে। যেমন:

– মহানবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘যে মু‘মিন ব্যক্তি প্রশস্ত হৃদয়ে হাসি-খুশি মনে সাওয়াবের আশায় কোরবানি করবে, আল্লাহ তাআলা তার এ কোরবানিকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষায় জন্যে ঢাল স্বরূপ বানিয়ে দিবেন।’ [ইবনে মাযাহ]

– মহানবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন: ‘কোরবানির দিন আল্লাহর নিকট বনী আদমের পশু যবেহ অপেক্ষা অন্য কোন আমল বেশি পছন্দনীয় নয়। কিয়ামতের দিন কোরবানিকৃত পশুর লোম, খুর ও শিংসহ উপস্থিত হবে।’ [তিরমিযী]

– হুসাইন বিন আলী (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘যে ব্যক্তি পুণ্যের আশায় খুশি মনে বিশুদ্ধ নিয়তে কোরবানি করল, তার জন্য ওই কোরবানি জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য দেয়াল হয়ে যাবে।’

৫. ইবনে উমর (রা.) বলেন: নবী করীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার ১০ বছর জীবনের প্রতি বছরই কোরবানি করেছেন। [তিরমিযী]। অতএব আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু আমাদের উত্তম আদর্শ আর তিনি যেহেতু কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার পর থেকে বাকী যিন্দিগীতে প্রতি বছরই কোরবানি করেছেন, সেহেতু আমাদেরকেও উম্মতে মুহাম্মাদী হিসেবে ঈমানী টানের কারণেই কোরবানি করতে হবে। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এও বলেছেন: ‘যে ব্যক্তির সামর্থ থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করলো না সে যেনো আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে।’ [সহীহ মুসলিম]

কীভাবে কোরবানি করবো? পশু যবেহ করলেই কি কোরবানি হয়ে যাবে। কখনও নয়; কোরবানি শুধুমাত্র পশু যবেহ করার নাম নয়। এ ব্যাপারে আমাদেরকে ইসলামী শরিয়তের দিকে নজর দিতে হবে। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় ‘আল্লাহর সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে, নিদিষ্ট নিয়মে, নির্ধারিত পশু যবেহ করাকে কোরবানি বলে।’ এই সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করলে আমাদের কাছে যে সব বিষয় স্পষ্ট হয়, তা হল:

(এক) কোরবানি দ্বারা উদ্দেশ্য হতে হবে ‘একমাত্র আল্লাহর সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি অর্জন।’ অতএব, তাক্বওয়া, পরহেজগার ও মহান আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করাই হতে হবে কোরবানি দাতার একমাত্র নিয়্যাত ও লক্ষ্য। যদি কোরবানির এই মহান উদ্দেশ্যের আড়ালে গোশত খাওয়া, লৌকিকতা অথবা এরূপ কোনো হীনস্বার্থ জড়িত থাকে তাহলে কোরবানি সম্পূর্ণ বিনিষ্ট হয়ে যাবে। কারণ আল্লাহ বলেন: আল্লাহর নিকট কোরবানির মাংস ও রক্ত কিছুই পৌঁছে না, তবে তোমাদের অন্তরের তাকওয়া পৌঁছে থাকে। [সুরা হাজ : ৩৭]

(দুই) কোরবানি ‘নির্দিষ্ট সময়ে করতে হবে।’ নির্দিষ্ট সময় বলতে ১০, ১১, ১২ যিলহাজ। এ দিনগুলোর যে কোন একদিন কোরবানি করতে হবে। তবে প্রথম দিনে কোরবানি করা উত্তম এবং এ কোরবানি আবশ্যই ঈদের সালাত আদায় করার পর করতে হবে।

(তিন) কোরবানি ‘নির্দিষ্ট নিয়মে করতে হবে।’ নির্দিষ্ট নিয়ম বলতে যা বুঝায়, তা হলো:

১. অন্তবে কোরবানির নিয়্যাত করে আল্লাহর নামে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে যবেহ করতে হবে। ইচ্ছাকৃত ভাবে আল্লাহর নাম না নিলে বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কোরবানি করলে তা গৃহীত হবে না। এখানে একটি কথা না বললেই নয়; আমাদের দেশে অনেকেই বলে থাকেন, বিশেষ করে কোরবানির পশু যবেহ করার সময় অনেক হুজুরও বলে থাকেন: ‘এই কোরবানি কার নামে হবে?’ তখন হুজুরের প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়: ‘হুজুর এটা অমুকের নামে।’ এমনটি না বলে বলতে হবে কোরবানি কার পক্ষ থেকে হবে।’ জবাবে বলবে ‘আল্লাহর নামে অমুকের পক্ষ থেকে। অতপর পশু যবেহ হয়ে গেলে দুয়া পড়তে হবে।

২. কোরবানি দাতা যদি নিজে যবেহ করার ক্ষমতা রাখে তাহলে নিজেই যবেহ করবে। এটাই শরয়ী বিধান। তবে নিজে অক্ষম হলে অন্যের মাধ্যমে যবেহ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে যবেহ করার স্থানে কোরবানি দাতার উপস্থিত থাকা উত্তম।

৩. কোরবানির পশু যবেহ করার আগে ছুরি ধারাল করতে হবে। পশুকে কাবামুখী করে যবেহ করতে হবে। সেই সাথে সম্ভব হলে এক পশুর সামনে অপর পশুকে যবেহ করা হতে বিরত থাকতে হবে।

৪. কোরবানির পশুর চারটি রগ ‘শ্বাসনালী’, ‘খাদ্য নালী’, ও এর দু‘পাশের দুটি মোটা রগ-এর মধ্যে কমপক্ষে তিনটি রগ কাটতে হবে এবং যবেহ করার পর ছুরি দিয়ে পুনরায় পশুর গলায় খোঁচা মারা যাবে না।

৫. পশু যবেহ করার পর তা ঠান্ডা না হওয়া পর্যন্ত চামড়া খুলা যাবে না  বা গোশত বানানোর কাজে হাত দেয়া যাবে না। কারণ এতে পশুর কষ্ট হয়।

(চার) ‘নির্ধারিত পশু যবেহ করতে হবে।’ নির্ধারিত পশু বলতে কোরবানির জন্য কোরবানি দাতা কর্তৃক নির্দিষ্ট পশুকে বোঝানো হয়েছে। এ পশু হতে পারে উট, মহিষ, গরু, ছাগল, ভেড়া কিংবা দুম্বা। এসব পশু অবশ্যই গৃহপালিত, নিখুঁত ও নির্ধারিত বয়সপূর্ণ হতে হবে। যেমন: উটের জন্য পাঁচ বছর, গরু-মহিষের জন্য দুই বছর এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার জন্য এক বছর হওয়া।

কোরবানির শিক্ষা: কোরবানির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্ণিত আলোচনা হতে আমরা কোরবানির যে সব শিক্ষা পাই, তা হলো:

১. আল্লাহর নির্দেশের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করা। তাইতো আমরা লক্ষ্য করি পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে কোরবানির নির্দেশ পাওয়ার পর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর কোনো কারণ জিজ্ঞেস করা তো দুরের কথা; নির্দেশ পালনে তিনি কোনো দ্বিধাও করেন নি।

২. আল্লাহর রাস্তায় সবচেয়ে প্রিয় বস্তু ত্যাগের চেতনা গ্রহণ করা। বৃদ্ধকালের একমাত্র অবলম্বন কিশোর সন্তান ইসমাঈলকে কোরবানি করার চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আমাদেরকে এ শিক্ষা দিয়ে গেছেন যে, প্রাণাধিক প্রিয় বস্তু ত্যাগের মাধ্যমেই মহানুভব হওয়া যায়।

৩. কু-প্রবৃত্তি দমন করা। কোরবানির অন্যতম শিক্ষা হলো কুপ্রবৃত্তির দমন করা। আমরা জানি, মানুষের মধ্যে দুটি সত্ত্বা রয়েছে। একটি সু-প্রবৃত্তি, যা মানুষকে স’ ও মানবিকতার গুণে গুণান্বিত করে। অপরটি কুপ্রবৃত্তি, যা মানুষকে অস’ ও পাশবিকতার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। কোরবানি দাতা পশুর গলায় ছুরি চালাবার সাথে সাথে নিজের নফস নামক কুপ্রবৃত্তির গলায়ও ছুরি চালাতে হবে। অর্থ্যা’ তার শিক্ষা দ্বারা নিজের মধ্যকার হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ, লালসা, ভোগবাদিতা ইত্যাদির মৃত্যু ঘটাতে হবে।

৪. জনস্বার্থে স্বীয় সম্পদ ব্যয় করা। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে সন্তানের স্থলে পশু কোরবানি তথা আর্থিক কোরবানির বিধান দিয়েছেন। তাই আমাদের উচিত আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে কোরবানির গোশত বিতরণের ন্যায় প্রাণাধিক প্রিয় যে সম্পদ আমরা সঞ্চয় করে চলেছি তা হতে কিছু কিছু জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা।

৫. সর্বোপরি জীবন, সম্পদ ও সকল আমিত্বের কোরবানি এবং মানবতা তথা সকল সৃষ্টির কল্যাণে স্বীয় সত্ত্বাকে নিয়োজিত করাই হলো কোরবানির অন্যতম শিক্ষা। যে সমাজে কোরবানির এসব শিক্ষার প্রতিফলন ঘটবে, সে সমাজ একটি সুখী, সমৃদ্ধিশীল ও শান্তিপূর্ণ সমাজে পরিণত হবে- এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়।

অতএব, কোরবানি কেন করবো? এর উপকার কি? এসব কথা না ভেবে এটি যে আল্লাহর বিধান, এটা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে লৌকিকতা নয়; একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে সঠিক পন্থায় আমাদেরকে কোরবানি দিতে হবে। তাহলেই আমাদের কোরবানি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল নেক আমলকে কবুল করুন। আমীন।

x

Check Also

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারে রাজনৈতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে: মির্জা ফখরুল

এমএনএ প্রতিবেদক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এবং কুরুচিপূর্ণ ভাষার ব্যবহারের কারণে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ...