এমএনএ ফিচার ডেস্কঃ চা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থকরী ফসল হিসেবে একসময় বিবেচিত হতো। পাটের পর চা রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের কারণে চা-ই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মূল ভিত্তি গড়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চা উৎপাদন হচ্ছে। সম্প্রতি সিলেটের চা বাগানের শ্রমিকরা তাদের শ্রমের মজুরি সংশোধন করে প্রকৃত মজুরি নির্ধারণের দাবি তুলেছে। ১৯ দিন ধর্মঘট পালন করা শ্রমিকদের দাবী আদায়ে শেষতক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
শ্রমিকদের দাবী আদায়ের লক্ষ্যে প্রথমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চা শিল্পের মালিকদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। গণভবণে দীর্ঘ আলোচনা শেষে একটা সমাধান আসে। চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরী ১২০ টাকা থেকে ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া সরকারের নিয়ন্ত্রণে তাঁদের ন্যায্য দাবীর পাশাপাশি সরকারী সুযোগ সুবিধাও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দর সমাধানের মধ্য দিয়ে চা বাগানের শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন।
চা শ্রমিকদের শ্রমের ন্যায্য মুজুরীর জন্য যে আন্দোলন আপাতত থেমেছে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দূর ভবিষ্যতে এই আন্দোলন আবার দানা বেঁধে উঠতে পারে।
১৬০ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশে চা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবীর ধর্মঘট সত্যি বেমানান। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং খাদ্যদ্রব্যের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে চা শ্রমিকদের মাঝে দিন দিন হতাশা বাড়তে থাকে।
চা শিল্পে বর্তমানে প্রায় দেড় লক্ষ শ্রমিক কাজ করছে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী চা উৎপাদনের ৩% বাংলাদেশে উৎপন্ন হয়। ২০২১ সালে বাংলাদেশে চা শিল্পের বাজার ছিল প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের চা বোর্ডের তথ্য মতে, এদেশে ১৬৭টি বাগানে বানিজ্যিকভাবে চা উৎপাদনের জন্য উপযোগী। এই চা বাগানের মোট আয়তন ২৭৯,৫০৭ একর। যেখানে প্রতি বছর ৬.৭৪ কোটি কেজি চা উৎপাদিত হয়। ২০২১ সালে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ৯.৬৫ কোটি কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। একই বছরে বাংলাদেশ ৬৮০০০০ কেজি চা রপ্তানি করেছে। যার রপ্তানি আয় ১৮০.৫৭ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের জিডিপিতে চায়ের অবদান ১% অবদান। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম চা উৎপাদক দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ প্রায় ২০টির বেশি দেশে চা রপ্তানি করে থাকে। বিশ্বের মধ্যে চা রপ্তানীকারক দেশে হিসেবে বাংলাদেশের স্থান ১০ম। কিন্তু চা শ্রমিকদের বেশিরভাগ শ্রমিক নারী। তারা দীর্ঘসময় কাজ করে থাকে। কিন্ত দেশের শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে কম মজুরী পান চা শ্রমিকরা।
বাংলাদেশের চা শ্রমিকরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের বংশধর। ব্রিটিশ চাষীদের সাথে তারা এদেশের চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করে। এই শ্রমিকরা নিম্নবর্ণের হিন্দু ধর্মালম্বী।
যাহোক, শ্রমিকরা কেন আন্দোলনে নামলো! কী তাদের দাবী! কত তারা বেতন পান নিশ্চয় তা বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে। কেননা চা শ্রমিকদের আন্দোলনের ঢেউ ঢাকাসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। চা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে অনেক সমাজবাদী, রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন সরব হয়েছে। কিন্তু চা শ্রমিকদের আন্দোলনের পূর্বে চা শ্রমিকদের কেউ খবর রাখেনি। শ্রমিকদের দাবীর প্রতি সরব হয়নি। যখন জিনিষপত্রের উর্ধ্বগতির কারণে তাদের জীবন চলছেনা তখনই তারা বেতন বাড়ানোর জন্য আন্দোলনে নামে।
১৮৫৪ সালে চা শ্রমিকদের ভারতবর্ষ থেকে এখানে নিয়ে আসে ব্রিটিশরা। তাদের চা শ্রমিকের কাজে নিয়োগ করে ব্রিটিশ বেনিয়ারা। তাদের চলাফেরার গন্ডি চা বাগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। তাদের জন্য চালু করা হয় আলাদা মুদ্রা। যাতে সাধারণ মানুষের সাথে তারা মিশতে না পারে। মাত্র মাসে ৫টাকা বেতনে কাজ করে তারা। অন্যান্য সুযোগ সুবিধার নামে তাদের শোষন করা হতো।
একসময় ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ হবার পর শ্রমিকদের বেতন দৈনিক হিসেবে দাঁড়ায়। নারী শ্রমিকদের দৈনিক ১টাকা এক আনা এবং পুরুষ শ্রমিকদের ১টাকা দুই আনা বেতন নির্ধারণ করা হয়। তারপর সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন সময় তাদের বেতন বৃদ্ধি করা হতো। তা এতোই নগণ্য যে অন্য কোন শ্রমিকের পারিশ্রমিকের সাথে তার ফারাক আকাশ সমান।
১৯৫৭ সালের ৪ জুন প্রথম বাঙ্গালি হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহন করেন। বঙ্গবন্ধু চা বোর্ডের দায়িত্ব গ্রহনের পর প্রথমে শ্রমিকদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু অনধাবন করেছিলেন চা শ্রমিকরা এদেশের নাগরিকত্ব পেলে এদেশের নাগরিক হিসেবে সব সুবিধা ভোগ করতে পারে।
বিভিন্ন সময়ে শ্রমিকদের বেতন বেড়েছে ৮ টাকা থেকে ১২ টাকা, ২২ টাকা, ২৪ টাকা, ৩২ টাকা। সর্বশেষ ২০২০ সালে ১২০ টাকা বেতন নির্ধারণ হয়। বেতন ছাড়া তারা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা যেমন, বাসস্থান, বিদ্যুৎ, পানি, স্যানিটেশন রেশন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বোনাস পাবার কথা। কিন্তু এসব শুধু হিসেবের খাতায় দৃশ্যমান।
তাঁদের ও রেশনিংয়ে শুভংকরের ফাঁকি লক্ষ্য করা যায়। যেমন একজন শ্রমিক দৈনিক ২৩ কেজি পাতা তোলার জন্য ১২০ টাকা পাবে। এক কেজি বেশি তুললে ৪ টাকা ২৫ পয়সা অতিরিক্ত পাবে। ১ কেজি কম তুললে ৫টাকা ২০ পয়সা কাটা যাবে। রেশনের ক্ষেত্রেও হিসেবের গোঁজামিল পরিলক্ষিত হয়। স্বামী কাজ করলে ৩ কেজি ২০০ গ্রাম চাল বা আটা পাবে, স্ত্রী পাবে ২ কেজি ৮০০ গ্রাম চাল বা আটা। স্ত্রী কাজ করলে স্বামী কোন রেশন পাবেনা। ১২ বছরের নিচে দুজন শিশু ২ কেজি ৪০০ গ্রাম করে চাল বা আটা পাবে। শিশুর বয়স ১২ বছরের উপরের শিশুদের কোন রেশন বরাদ্দ নেই। কি আজগুবি আইন এই চা পাতা শ্রমিকদের জন্য!
এই ২০২২ সালে এসে চা শ্রমিকদের এই শ্রমের পারিশ্রমিকে কি চলে!
বাংলাদেশের চা শিল্প একসময় দ্বিতীয় অর্থকরী ফসল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল। কিন্তু এখন এই শিল্পের কেন এই অবস্থা। বর্তমানে যে পরিমাণ চা উৎপাদনের জায়গা রয়েছে, সবগুলো জায়গা চা উৎপাদনের জন্য উপযোগী হলেও তার সর্বোত্তম ব্যবহার করা হয়না। আধুনিক টেকনোলজিসহ চা উৎপাদনের একটি আধুনিক নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে চা শিল্পের বিকাশ ও শ্রমিকদের ন্যায্য শ্রমের মূল্য দেয়া সম্ভব। কিন্ত চা মালিকদের এই বিষয়ে পরিকল্পনা নেই, বরং চা শ্রমিকদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত করে নিজেদের সম্পদশালী করায় ব্যস্ত ।
চা শ্রমিকদের সন্তানরা এখন শিক্ষিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে চা শ্রমিকদের অমানবিক জীবন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে পারে। তখন শ্রমিক সংকট হবে চা বাগানে। তখন কি চা বাগানে কোন শ্রমিক কাজ করবে বিদ্যমান বেতন খাটামোতে!
দেশের মধ্যে চা এর ব্যবহার বেড়েছে। সে তুলনায় রপ্তানি বাড়েনি। ২০০১ সালে বাংলাদেশ বিদেশে ১.২ কোটি কেজির বেশি চা রপ্তানি করেছে। ২০১০ সালে এটি৯ লক্ষ কেজিতে নেমে আসে। ২০২১ সালে আরো কমে ৬.৮ লক্ষ কেজিতে নামে।অতীতে চা খাত ছিল দ্বিতীয় অর্থকরী ফসল এবং চা রপ্তানী করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হতো। এখন সেই চিত্র সম্পূর্ণ রূপে পাল্টে গেছে।
চা বিশেষজ্ঞদের এখন ভাবতে হবে। বাংলাদেশের চা শিল্পকে কিভাবে এগিয়ে নেয়া যায়। বর্তমান আধুনিক বিশ্বে যেখানে অন্যান্য দেশে প্রযুক্তি নির্ভর হয়েছে চা বাগানগুলো, আমাদের দেশ কেনো পিছিয়ে থাকবে। চা শিল্পকে প্রযুক্তি নির্ভর ও আধুনিকায়ন করা হলে চায়ের উৎপাদন বাড়বে। উৎপাদন বাড়লে রপ্তানি বাড়বে। অর্জিত হবে বৈদেশিক মুদ্রা। আমাদের দেশে চায়ের ব্যবহার বেড়েছে। উৎপাদনও খুব একটা কম নয়। তা সত্ত্বেও চা আমদানী করা হয়।
চা রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে ৫৭তম স্থানে। বিদেশের বাজার ধরতে হলে বাংলাদেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানির জন্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে উৎপাদনের পরিধি। সমতল ভূমিতে আমাদের দেশে চা চাষ হতোনা। এদেশের চা উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ বজায় রয়েছে। ফলে উত্তর বঙ্গের সমতল ভূমিতে এখন চা উৎপাদন হচ্ছে।যার যথার্থ উদাহরণ পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও।
বাংলাদেশে বেশিরভাগ সময় বৃষ্টিপাত হয়না এবং উচ্চ আর্দ্রতার কারণে চা গাছ টিকিয়ে থাকতে পারেনা। চা চাষের ক্ষেত্রে এ ধরণের সমাধানের জন্য আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ ও কৃত্রিম সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। পাহাড়ী এলাকায় চা গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকেনা। আর সমতল স্থানে পানি বা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়।
দেশের অনেক পাহাড়ী জায়গা অনাবাদি আছে। আবার চা বাগানের জন্য বরাদ্দকৃত ৪২% জমিতে চা আবাদ করা হয়না। সেই সব পতিত জমিতেও চা উৎপাদন করতে হবে। অনাবাদি জায়গাগুলো চা বাগানের আওতায় আনা গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। বেশ কয়েকটি চা বাগানও এ মুর্হূতে বন্ধ রয়েছে। সেগুলোও চালু করতে হবে।
বাংলাদেশের চা বাগানগুলো ব্রিটিশ সংস্কৃতি অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। এসব চাবাগান আধুনিকীকরণ করা প্রয়োজন। চা চাষের আধুনিকায়ন করা হলে উৎপাদন বাড়বে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব।
এছাড়া চাবাগানের আধুকায়নের পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরী ও সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। মালিকদের পাশাপাশি সরকারেরও ভূমিকা থাকতে হবে।
এক সময় পাট ছিল বাংলাদেশের সোনালী আঁশ। পাট বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রপ্তানিযোগ্য পণ্য। কিন্তু সেই শিল্প ধ্বংসের মুখে। চা শিল্প যাতে পাটের মতো ধ্বংস না হয় সেই দিকে সজাগ থাকতে হবে। চা শিল্পের প্রতি একটু নজর রাখলে চা-ই হতে পারে আমাদের এক নম্বর রপ্তানী পণ্য।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিতে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছেন। আপাতত শ্রমিকরা খুশি মনে কাজে যোগ দিয়েছেন। দ্রব্যমূল্যের ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির ফলে তারা আবারো বেতন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনে নামতে পারে। তার আগেই চা শিল্পকে আধুনিকায়ন করা গেলে চা উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। আর চা উৎপাদনের ফলে আয় বৃদ্ধি পেলে শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি দেয়া সম্ভব; সেই সাথে শ্রমিকরা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার প্রয়োজন হবেনা।
আমরা বিশ্বাস করি, আধুনিক ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে চা শিল্পের উন্নতি সম্ভব হবে।
লেখক : মিয়া মনসফ, যুগ্ম সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ)
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

