আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চীন আবারও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কিনতে সম্মত হয়েছে। সাম্প্রতিক শুল্কসংক্রান্ত উত্তেজনা ও বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে চীনের বিশাল ক্রেডিট কার্ড বাজারে মার্কিন কোম্পানিগুলোর আরও বেশি প্রবেশাধিকার নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বেইজিংয়ে রাষ্ট্রীয় সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং-এর সঙ্গে বৈঠকের পর মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানান ট্রাম্প।
ট্রাম্প বলেন, চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আবার তেল আমদানির বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। এর আগে শুল্ক আরোপ এবং পাল্টাপাল্টি বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি বাণিজ্য ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল।
বিশ্ববাজারে ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা হিসেবে পরিচিত চীন গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপের পর খুব সীমিত পরিমাণে মার্কিন তেল আমদানি করেছিল। একই সময় তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন আমদানিও নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিয়ে ব্রাজিলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে কৃষি ও জ্বালানি খাতে মার্কিন রপ্তানিকারকদের বড় ধাক্কা খেতে হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের পুনরায় মার্কিন তেল কেনার সিদ্ধান্ত দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনা কিছুটা প্রশমনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, বৈঠকে তিনি চীনের ক্রেডিট কার্ড বাজারে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার প্রসঙ্গও তুলেছেন। বিশেষ করে মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোর জন্য আরও বড় ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরেই চীনের আর্থিক বাজারে বিদেশি কোম্পানির প্রবেশে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা বাজার হওয়া সত্ত্বেও চীনে মার্কিন আর্থিক সেবাখাত পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছে না। ট্রাম্পের বক্তব্যে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন এখন এই খাতেও নিজেদের প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী।
তবে অর্থনৈতিক আলোচনা ছাড়াও বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয় ছিল তাইওয়ান। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান ইস্যু সঠিকভাবে মোকাবিলা না করা হলে দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব এমনকি সংঘাতও সৃষ্টি হতে পারে।
চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, শি ট্রাম্পকে বলেন, “তাইওয়ান প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ইস্যু। এটি সঠিকভাবে সামলানো না হলে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছাতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, তাইওয়ানের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তাইওয়ান প্রণালির স্থিতিশীলতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাইওয়ান প্রণালিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চীন বরাবরই তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীপটিকে একীভূত করার হুমকিও দিয়ে থাকে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে “এক চীন নীতি” মেনে চললেও তাইওয়ানকে সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।
এ কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ান প্রণালিতে উত্তেজনা বেড়েছে। চীন প্রায়ই সামরিক মহড়া চালায় এবং দ্বীপটির চারপাশে যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে চাপ সৃষ্টি করে। বেইজিংয়ের আশঙ্কা, তাইওয়ান আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারে, যা তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের জটিল বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। একদিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের আলোচনা চলছে, অন্যদিকে তাইওয়ান প্রশ্নে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই শক্তির এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন দিকে যায়, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

