Don't Miss
Home / জাতীয় / চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে সরকারের নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন, প্রশাসনে নতুন করে বিতর্ক

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে সরকারের নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন, প্রশাসনে নতুন করে বিতর্ক

বিশেষ প্রতিবেদন

প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাংলাদেশের সরকারি ব্যবস্থায় নতুন কোনো বিষয় নয়। বিশেষ করে উচ্চপদে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পুনরায় দায়িত্ব দেওয়ার এই প্রক্রিয়া বহু বছর ধরেই চলে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একের পর এক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে এ ধরনের নিয়োগ যৌক্তিক হলেও অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রশাসনের স্বাভাবিক পদোন্নতি কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

শনিবার (১৮ এপ্রিল) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে সচিব পদমর্যাদায় আরও তিনজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন— ড. মোহাম্মদ জকরিয়া — এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক; সাফিজ উদ্দিন আহমেদ — বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসনের ওয়াকফ প্রশাসক; ও মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী — ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী জনস্বার্থে তাদের এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যোগদানের আগে তাদের অন্য যেকোনো পেশা, ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ত্যাগ করতে হবে। নিয়োগের অন্যান্য শর্ত পৃথক চুক্তিপত্রে নির্ধারিত হবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর প্রশাসন পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।

নতুন সরকারের সময় এখন পর্যন্ত যেসব উল্লেখযোগ্য নিয়োগ হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—  প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব; ধর্ম সচিব; স্থানীয় সরকার, কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব; অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক সমন্বয়ক।

সরকার বলছে, শুধুমাত্র প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও বিশেষজ্ঞতার প্রয়োজনেই এসব নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, “সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই সীমিত আকারে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। আমরা ঢালাওভাবে কাউকে নিয়োগ দিচ্ছি না।”

তিনি আরও বলেন, “নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে একটি প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়। সরকারের নিজস্ব নীতি, অঙ্গীকার ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য কখনও কখনও কিছু অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব দিতে হয়।”

প্রতিমন্ত্রীর দাবি, কাউকেই এক বছরের বেশি সময়ের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না এবং প্রয়োজন ছাড়া এমন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।

তবে প্রশাসনের ভেতরে এই নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষও রয়েছে। কর্মরত কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনা হলে যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হন।

জনপ্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, সাধারণত সরকারের আস্থাভাজনদেরই মেয়াদ শেষে চুক্তিতে ফিরিয়ে আনা হয়। এতে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় এবং পেশাগত নিরপেক্ষতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় এটি অনেক সময় অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। এতে নিয়মিত কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে বঞ্চিত হন।”

সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, নতুন সরকারকে শুরুতে কিছুটা ছাড় দেওয়া যেতে পারে।

তার ভাষায়, “একটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাকে চুক্তিতে আনা বাস্তবসম্মত হতে পারে। তবে এটি যেন দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায় পরিণত না হয়।”

তিনি আরও বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মাত্রায় হয়েছিল। নতুন সরকারকে সেদিক থেকে সতর্ক থাকতে হবে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সীমিত নিয়োগ হলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।”

তার মতে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পাশাপাশি ভেতর থেকে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতিও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রশাসনের ভারসাম্য বজায় থাকে।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমালোচনা হচ্ছে—এখনও পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই। যদিও ২০১৪ সালে তখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরির পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো সরকারই তা বাস্তবায়ন করেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিমালা না থাকায় সরকারগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী আইন ব্যবহার করে এবং এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পাশাপাশি সম্প্রতি আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পরিবর্তন আনা হয়েছে—  শায়লা শারমিন জামান — মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক; আবু সাঈদ মো. কামরুজ্জামান — বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক; জিনাত আরা — প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব; ও মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী — মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বদলি।

বিশ্লেষকদের মতে, সীমিত পরিসরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে যদি এটি নিয়মিত প্রথায় পরিণত হয়, তাহলে প্রশাসনের ভেতরে পদোন্নতি কাঠামো দুর্বল হবে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তাই অনেকেই মনে করছেন, সরকারের উচিত দ্রুত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য একটি স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করা, যাতে প্রয়োজন ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ হয় এবং প্রশাসনের ভারসাম্য অক্ষুণ্ন থাকে।

x

Check Also

বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম, সরকার বলছে বাধ্য হয়েই মূল্য বৃদ্ধি

এমএনএ প্রতিবেদক আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি ...