Don't Miss
Home / হোম স্লাইডার / ঢাকার অসহনীয় যানজট ও সমাধানের উপায়
রাজধানী

ঢাকার অসহনীয় যানজট ও সমাধানের উপায়

এমএনএ ফিচার ডেস্কঃ মাত্র কয়েকদিন আগে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে রাজধানীতে ফিরেছেন মানুষ। এর আগে অনেক ঝক্কি ঝামেলা সহ্য করে নাড়ির টানে গেছেন স্ব স্ব এলাকায় প্রিয়জনদের সাথে ঈদ করতে। এখন সবাই রাজধানীতে ফিরে আবার নিজ নিজ কর্মস্থলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।সন্তানরা যাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। বিগত দুই বছর কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অনেক অফিস বন্ধ ছিল। তবে এখন পুরোপুরি সবকিছু উন্মুক্ত হয়ে গেছে।সেই সাথে চিরচেনা যানজটে নাকাল অবস্থা রাজধানীবাসীর।

রাজধানী ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৯ মিলিয়ন। বিশ্বের ১৭৪ দেশের বড় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার যানজট অনেক বেশী। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩,২৩৪জন মানুষের বসবাস। ঢাকার মেট্রো এলাকায় ধীরগতির ট্রাফিক চলাচলের কারণে প্রতিবছর ৩৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমান অর্থ জ্বালানি খরচ হারাচ্ছি।বর্তমান ঢাকার যান চলাচলের গড় প্রতি ঘন্টায় ৬.৪ কিলোমিটার। যদি বর্তমান গাড়ি বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০৩৫ সালের মধ্যে গড় গতি ৪.৭ কি.মি প্রতি ঘন্টায় নেমে যেতে পারে।

ঢাকা শহরে সড়ক রয়েছে মাত্র ৭.৫ শতাংশ। অথচ সারা বিশ্বের শহরগুলোর মতো ২৫ শতাংশ হওয়ার কথা। তবে শহরের অভ্যন্তরে রাস্তা তৈরির কোন সুযোগ নাই। ‍যদি রাস্তার জায়গা করতে হয় তাহলে অনেক বড় বড় ভবন ভেঙ্গে ফেলতে হবে।

আর ঢাকার ট্রাফিক সিস্টেম ও ট্রাফিক পুলিশ অন্যান্য দেশের মত উন্নত ও দক্ষ নয়। ট্রাফিক পুলিশের ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে দেখা যায়না। তাদের মধ্যে ঘুষ নেওয়া ও গাড়ির মালিকদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে মনোনিবেশ হবার অভিযোগ রয়েছে। যানবাহনের চালকরা স্বল্প প্রশিক্ষিত। পাবলিক ট্রান্সপোর্টের চালকরা ন্যূনতম প্রশিক্ষিতও নয়। এইসব চালকদের দ্বারা পরিচালিত যানবাহন রাস্তায় বিভিন্ন  সমস্যার সৃষ্টি করে। যখন তখন ওভারটেক করে দূর্ঘটনা ঘটায়। আর অযোগ্য যানবাহন বায়ুদুষণ করে চলেছে।

আন্তঃজেলা যানবাহনগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যার কারণ। কেননা আন্তঃজেলা যানবাহনের কোন বাইপাস সড়ক তৈরি করা হয়নি। ফলে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যেতে যানবাহনগুলো ঢাকা শহরে প্রবেশ করতে হয়। এতে শহরের মধ্যে তীব্র যানজট তৈরি হয়।ঢাকা শহরের মধ্যে ৭০টিরও বেশী ট্রেন চলাচল করে। এই কারণেও যানজন সৃষ্টির আরেকটি অন্যতম কারণ ।

ঢাকা শহরে মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের পড়াতে মানুষকে ঢাকামুখী হতে বাধ্য করেছে। ঢাকার শহরতলী বা গ্রামে উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকার কারণে  সন্তানদের ঢাকায় উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করান এবং ঢাকায় বসবাস করেন।

ঢাকা মহানগরীতে বাস সার্ভিস কোন শৃংখলার মধ্যে নেই। ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানীর নামে বাসগুলো পরিচালিত হয়। যাত্রী সংগ্রহ করতে বাসগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে যায়। প্রতিযোগিতার কারণে ওভারটেক করে দুর্ঘটনা ঘটায়। তাদের এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সময় জীবন দিতে হচ্ছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে আন্দোলনে নামছে তারা।কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছেনা। কিছু দিন স্তিমিত হয়ে আসলে আবার সেই আগের রূপে আভির্ভূত হয়।

যান চলাচলের তীব্র প্রতিযোগিতা থেকে বাঁচতে ঢাকা শহরের পরিবহন পরিচালনা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে বিশেষজ্ঞরা দাবী জানিয়ে আসছেন। এক কোম্পানীভিত্তিক নগর পরিবহন চালু করতে। কিন্তু আজো সেই দাবী বাস্তবায়ন করা যাচ্ছেনা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ঘাটার চর থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত ঢাকা নগরপরিবহন চালু করেছে। ইতিমধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে এই পরিবহন। এই পরিবহন পরিচালনা করতে কোন নতুন বাস কিনতে হয়নি। বিআরটিসি ও একটি বেসরকারী কোম্পানীর কিছু বাস নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এই রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম । এই রুটে ২৫টি কাউন্টার থেকে টিকেট কেটে যাত্রীরা গন্তব্যে যাচ্ছে। লাইন ধরে শৃংখলার সাথে বাসে উঠছে। সরকারী ও বেসরকারী মাত্র ৫০টি বাস দিয়ে যদি একটি রুট চালু করা যায়, অন্য রুটে চালু করতে এতো সময় লাগছে কেনো? ঢাকা শহরের অন্যান্য রুটে সব পরিবহনগুলোকে এক কোম্পানীর আওতায় আনা হলে যানজট ও দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে।

যানজটের আরো একটি বড় কারণ অবৈধভাবে ফুটপাথ দখল। ‍যদিও এখানে হকারদের কারণে ফুটপাথগুলো অবৈধ দখলমুক্ত করা যাচ্ছেনা। উন্নত দেশের মতো অফিস শেষে হকারদের নির্দিষ্ট স্থানে বসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।স্থানগুলো  বিভিন্ন অফিস, আবাসিক হোটেল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে উন্মুক্ত স্থানে হতে পারে। পরে সিটি কর্পোরশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এইসব স্থান পরিস্কার করে নেবে।

ঢাকার যানজট নিরসনে সরকার বেশ কয়েকটি বৃহৎ অবকাঠামোগত মেগাপ্রকল্প গ্রহন করেছে।যেমন; মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।এসব প্রকল্প চলমান আছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব প্রকল্পের সুফল পাওয়া যাবে কিনা! এসব প্রকল্পের বিভিন্ন স্টেশন থেকে যাত্রীরা অন্যান্য পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে নির্দ্দিষ্ট গন্তব্য যাবে। ফলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হবে। তাহলে এসব প্রকল্প কি যানজট নিরসনে সুফল আনবেনা!সেক্ষেত্রে মেট্রোরেল বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে যাত্রীরা নির্বিঘ্নে গন্তব্যে যেতে অন্যান্য পরিবহনের সু-ব্যবস্থা করলে নিশ্চয়ই সুফল পাওয়া যাবে। এই দুই প্রকল্প চালু হবার পর সরকার পাতালরেলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। পাতাল রেল ঢাকা শহরের জন্য টেকসেই প্রকল্প কিনা, নাকি ঝুঁকি বাড়াবে তাও চিন্তা করতে হবে।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন থানায় আমাদের মানসম্পন্ন স্কুল ও কলেজ থাকতে হবে। স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে শাখা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।তাতে যার যার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র ভর্তি হবার প্রবণতা কমবে। সরকারের উচিত নিজ নিজ এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি হতে আইন করা। ফুটপাত ব্যবহারের পথচারীদের বাধ্যকরা।রাস্তা পারাপারে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার বা নির্দিষ্ট স্থান দিয়ে পার হওয়া এবং ট্রাফিক পুলিশকে সেই পয়েন্টগুলি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।

ঢাকা মহানগরীতে সমবায় সমিতির মাধ্যমে ৩/৪টি রুটে বাস পরিচালিত হবে। বাস ও হেলপারদের প্রশিক্ষিত করে ট্রাফিক নিয়ম ও জনসেবা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান দিতে নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে বাসের চালক ও হেলপারদের ডিউটির সময় ৮ঘন্টা নির্ধারণসহ যথাযথ বেতন দিতে হবে।

ঢাকা শহরের চতুর্দিকে চারটি নদীর পাশাপাশি আছে বেড়িবাঁধ। এই বেড়িবাঁধে ৮লাইনের রাস্তা নির্মাণ, মনোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং চার নদীতে ওয়াটারবাস চালু করা হলে ঢাকা শহরের মধ্যে যানজট অনেকাংশে কমে যাবে। এছাড়া ঢাকার সড়ক এলাকা বাড়াতে রিংরোড যানজট সমাধানে কার্য্কর ভূমিকা রাখবে। নদীর অবৈধ দখল, ফুটপাতে হকার নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণসামগ্রী রেখে পথচারী পারাপারে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।

ঢাকার উপর চাপ কমাতে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে মানুষকে ঢাকা অভিমুখী সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে হবে। এজন্য জেলাগুলোতে উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুবিধা ঢাকার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সুনিশ্চিত করতে হবে। সরকারী অফিস, বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জেলা পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদী বিকেন্দ্রীকরণ করা নাহলে পদ্মাসেতুর মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেও ঢাকার উপর মানুষের চাপ কমানো যাবেনা।

গত একদশকে অনেক উন্নয়ন হয়েছে । কিন্তু একজন বিদেশী বিমান বন্দর থেকে বের হয়ে যখন তীব্র যানজটে পড়েন, তখন তাঁর দৃষ্টিতে বাংলাদেশের উন্নয়ন দৃশ্যমান হবেনা। পৃথিবীর যেক’টি বসবাসের অযোগ্য শহর আছে তারমধ্যে ঢাকা শহর একটি। বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে রাজধানী ঢাকাকে বাসযোগ্য ও দৃষ্টিনন্দন করতে হবে।

সত্যিকারের উন্নত ও আধুনিক শহর গড়তে মেগাসিটি ঢাকার যানজট কমাতে বিশেষভাবে প্রয়োজন হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন দূরদর্শী নেত্রী। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি আমাদের সমস্যাগুলো জানেন। তিনি যদি ঢাকার যানজট কমাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন, তাহলে এসবের সমাধান হবে নিশ্চিত। ঢাকাবাসীও একটি শান্তির শহরে বসবাসের সুযোগ পাবে। এবং ঢাকা বিশ্বের অন্যতম বসবাসযোগ্য শহরে পরিণত হবে।

লেখক: মিয়া মনসফ, যুগ্ম সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সি (এমএনএ)

x

Check Also

আমদানির কারণে আমনের দরপতনে বোরো নিয়েও শঙ্কা, ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায় কৃষক

বিশেষ প্রতিনিধি বিদেশ থেকে চাল আমদানির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুম শেষে আমন ধানের দামে ...