বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকা ধানমন্ডির বহুল আলোচিত ‘৩২ নম্বর বাড়ি’—যা প্রকৃতপক্ষে সড়কের নম্বর হলেও বাড়িটির মূল নম্বর ছিল ৬৭৭—আজও জাতীয় স্মৃতি ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান-এর এই বাসভবন দীর্ঘদিন ধরে বাঙালির আবেগ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
২৫ মার্চের কালরাত্রি ও অভিযান
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নৃশংস অভিযান শুরু করে, যার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ধানমন্ডির এই বাড়ি। সে সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রেস লিয়াজোঁ অফিসার সিদ্দিক সালিক তার গ্রন্থ উইটনেস অব সারেন্ডার (Witness to Surrender)-এ এই অভিযানের বিস্তারিত বর্ণনা দেন।
তার ভাষ্যমতে, পরিকল্পনা অনুযায়ী রাত একটায় অভিযান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে এর আগেই আক্রমণ শুরু হয়। এ সময় বেতারে ভেসে আসে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার বার্তা। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী ধানমন্ডির বাড়িটিতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে। অভিযানের পর একটি বার্তা পাঠানো হয়— বিগ বার্ড ইন দ্য কেইজ (Big Bird in the cage…)”
নেতৃত্ব ও সামরিক পরিকল্পনা
অভিযানে ঢাকায় নেতৃত্ব দেন রাও ফরমান আলী এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে দায়িত্বে ছিলেন খাদিম হুসেইন রাজা। পুরো অভিযানের তদারকি করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক টিক্কা খান।
ধানমন্ডির বাড়িতে অভিযানে নেতৃত্ব দেন লে. কর্নেল জেড. এ. খান ও মেজর বেলাল। সংক্ষিপ্ত প্রতিরোধের পর সেনারা বাড়িতে প্রবেশ করে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক করে প্রথমে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে এবং পরে গোপনে পাকিস্তানে স্থানান্তর করা হয়।
নিষিদ্ধ এলাকা থেকে স্মৃতিচিহ্ন
১৯৭১ সালের মার্চের পর দীর্ঘ সময় ধানমন্ডির এই এলাকা ছিল কঠোর নিরাপত্তার আওতায়। বাড়িটি ফাঁকা পড়ে থাকলেও সবসময় পাকিস্তানি সেনাদের পাহারায় ছিল।
বর্তমান বাস্তবতা: ধ্বংসস্তূপ ও প্রশ্ন
সাম্প্রতিক সময়ে বাড়িটির অবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু উচ্ছৃংখল ব্যক্তির আক্রমনের শিকার হয় এই ঐতিহাসিক বাড়ি। এটিকে আগুণে পুড়িয়ে এবং বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় প্রশাসনের মুখের সামনেই। কিন্তু কোন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়নি। বরং প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেককেই হামলা ও মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়িটি আগুনে পোড়া ও আংশিক বিধ্বস্ত অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়ভাবে নিরাপত্তা জোরদার থাকায় সেখানে ছবি তোলার ক্ষেত্রেও সতর্কতা লক্ষ্য করা গেছে।
এই পরিস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি স্থাপনা কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, এবং এর প্রতি জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে বিবর্তিত হচ্ছে।
ইতিহাস, রাজনীতি ও জনমানস
বিশ্লেষকদের মতে, ধানমন্ডি ৩২ শুধু একটি বাড়ি নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের প্রতীক। বিভিন্ন রাজনৈতিক সময়পর্বে এই বাড়িকে ঘিরে বয়ান, আবেগ ও বিতর্কের পরিবর্তন ঘটেছে।
তবে ইতিহাসবিদদের অভিমত, এমন স্থাপনাগুলোকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে রেখে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। কারণ, ২৫ মার্চের কালরাত্রি থেকে শুরু করে পরবর্তী ঘটনাবলীর নীরব সাক্ষী এই বাড়িটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় স্থান হতে পারে।
উপসংহার
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি আজ একদিকে যেমন বেদনার প্রতীক, অন্যদিকে তা ইতিহাসের ধারক। সময়ের পরিক্রমায় এর অর্থ ও গুরুত্ব পরিবর্তিত হলেও, এটি যে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অনন্য দলিল—সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

