Don't Miss
Home / হোম স্লাইডার / বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় জরুরী পদক্ষেপ নিতে হবে
বন্যা

বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় জরুরী পদক্ষেপ নিতে হবে

এমএনএ ফিচার ডেস্কঃ নদীমাতৃক বাংলাদেশ। একারণে বাংলাদেশ সবসময়ই বন্যাপ্রবণ। ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ বন্যার করালগ্রাসে পড়তে হয়। শক্তিশালী বন্যা মোকাবেলার প্রস্তুতিমূলক উন্নয়নের কারণে বন্যার বড় ধরনের ক্ষতি মোকাবেলা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু কিছু কিছু এলাকা আছে বন্যায় মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করে থাকে। প্রাকৃতিক ঘটনা এবং মানবসৃষ্ট উভয় পরিস্থিতিই বাংলাদেশে বন্যার হুমকি ত্বরান্বিত করছে। অতএব, এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি অতীব জরুরি।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট বিভাগে এক মাসের মধ্যে দুই দফা বন্যায় প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। মেঘালায় ও আসামে ভারী বর্ষনের কারণে সিলেট বিভাগে বন্যার একমাত্র কারণ। সিলেটের উপর দিয়ে দুটি নদী সুরমা ও কুশিয়ারা ভারতীয় রাজ্য থেকে প্রবহমান।

মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে অত্যধিক বৃষ্টি হয়ে থাকে। ১৭ জুন ৯৭২ মি.মি বৃষ্টিপাত হয়েছে। যা ভারতের আওহাওয়া বিভাগের তথ্যমতে ১২২ বছরের রেকর্ড। সিলেটে প্রবাহিত সুরমা নদীর উপত্যকা আসামেও তিন দিন ভারী বৃষ্টি হয়েছে। আসামের উত্তর কাছাড় পাহাড়ের হাফলং, সিলেটের উজানেও ভয়াবহ বন্যা রেকর্ড করা হয়েছে।

সুরমার দুই পয়েন্ট ও কুশিয়ারা নদীর এক পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। সারি নদীর পানিও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বন্যা কবলিত বেশিরভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বেশ কয়েকদিন ধরে দুর্গত এলাকায় সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বিমানবন্দর রেল স্টেশন বন্ধ করে দেয়া হয়। বিভিন্ন এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী মোতায়েন করা হয়। বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে সরকার ১৯ জুন নির্ধারিত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষাও স্থগিত করে।

ইতিমধ্যে বন্যা কবলিত তিনটি জেলায় সিলেট, সনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার ছাড়াও বন্যাকবলিত হয়েছে দেশের আরো বেশ কয়েকটি জেলা। জেলাগুলো হচ্ছে- জামালপুর, নেত্রকোনা, বগুড়া, শেরপুর, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, মুন্সিগঞ্জ ও চাঁদপুর। এবছর হয়তো ঢাকা বন্যা কবলিত নাও হতে পারে। তবে আগামী বছরগুলোতে পানির চাপ বৃদ্ধি পেলে ঢাকাও বন্যাকবলিত হবার সম্ভাবনা আছে। এর ফলে অর্থনীতিতে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।

১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা। এর পর দেশে আর কোন বড় বন্যা না হলেও স্থানীয় পর্যায়ে বন্যা হয়েছে। বন্যায় শুধু জীবন ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে তা নয়। রাস্তাঘাট, কালভার্ট ও অন্যান্য অবকাঠামোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। গত বন্যায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দুটি বড় বন্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ধরনের বন্যা মোকাবেলায় পূর্ব প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা গ্রহন খুবই জরুরী।
বাংলাদেশের অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠে ও নিম্নভূমি। পুরোদেশ নদী প্রবাহিত। এখানে মৌসুমি বৃষ্টি আমাদের জলবায়ুর একটি বড় অংশ। আমাদের যত নদীর উৎসস্থল প্রতিবেশী দেশ থেকে। ফলে উজানে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে নিম্নমুখী প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং নদীতে পানির চাপ বাড়তে থাকে। উজানের পানির সাথে প্রচুর পলি ও কাদা নিয়ে আসে, তাই বর্ষায় আমাদের নদীতে প্রচুর পলি পড়ে। তাছাড়া হিমালয়ের বরফ গলে যাওয়ায় আমাদের নদীও সাগরের পানির উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন।

প্রাকৃতিক কারণ ছাড়াও কিছু মানবসৃষ্ট কারণ ও আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুনামগঞ্জে বন্যা রক্ষা বাঁধের অনুপস্থিতি, হাওর ও অন্যান্য জলাশয়ে মাটি ভরাট, পাহাড়ে বন উজাড় ও ভারতের উজানে খননসহ বেশ কয়েকটি কারণ মিলে পরিস্থিতি আরোও খারাপ হয়েছে। জলাশয় দখল করে বিভিন্ন স্থাপনার নির্মাণ করা, যা জলাধার হিসেবে কাজ করতো। ফলে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্থ করছে।

তাছাড়া পানির উৎসের স্থানে বিভিন্ন ভারী ইমারত নির্মাণের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। নদী, খাল, পুকুর ও জলাশয় অবৈধ দখলের কারণেও পানি ধারণ ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কিশোরগঞ্জের হাওড়ের উপর অষ্টগ্রাম-ইটনা-মিঠামইন সড়কটি প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে বন্যার সৃষ্টি করছে বলে অনুমেয়।

গ্রামীন জনপদে বেশিরভাগ রাস্তা, কালভার্ট অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে, ফলে শুধু পানি প্রবাহের পথই বন্ধ হয়নি, কৃষি জমিও অনেকাংশে কমে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, জলপ্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্থ না হয় সেজন্য ভবিষ্যতে হাওর বা জলাবদ্ধ এলাকায় এলিভেটেড রোড নির্মাণ করা হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রীও বলেছেন পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে প্রয়োজনে রাস্তা কেটে ফেলা হবে। তবে, প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষের কথা ভেবে হাওর ও জলাবদ্ধ এলাকায় এলিভেটেড রোড নির্মাণের কথা বলেছেন। এই সিদ্ধান্ত খুব ইতিবাচক হবে। ভবিষ্যতে বন্যা সংকট মোকাবেলার পাশাপাশি আরো কিছু অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

সরকার অগ্রাধিকার হিসেবে অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে খাল, জলাশয় উদ্ধার করতে হবে। জলাধারের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এগুলিকে শীঘ্রই পরিষ্কার করতে হবে। সারাদেশে নদীর পাশাপাশি আমাদের জলাশয়ও বাড়াতে হবে। শুধু জলাধার বাড়ালে হবেনা। নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে জলাধার ও হাওর এলাকায় এলিভেটেড রোড বা বেইলি ব্রিজ তৈরির পরিকল্পনা করতে হবে। পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে নদী খননের পাশাপাশি মাটির ক্ষয় রোধ করতে নদীর ধারে প্রচুর গাছ রোপন করার কর্মসূচিও নিতে হবে।

ভবিষ্যত বংশধরদের সুরক্ষার কথা বিবেচনায় রেখে ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশের সাথে পানি বন্টন চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে।

ভবিষ্যতে বন্যার ঝুঁকি কমাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা এড়াতে পারবনা। এই বিষয়ে আমাদের যে কোন অবহেলা বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে। বন্যার কারণে আমাদের ক্ষয়ক্ষতির সঠিক চিত্র অজানা। কিন্ত বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় তা অনুমেয়। গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বে অনেক উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ হয়েছে। যা আজ দৃশ্যমান। এই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি আমাদের কমাতে হবে।

উজানের পানি আমাদের দেশের খাল নদী দিয়ে প্রবাহিত হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি হচ্ছে। উজানের পানি সমুদ্রে ধীর গতিতে নামে। সেই সাথে মৌসুমী বৃষ্টির পানি যোগ হয়ে বন্যার সৃষ্টি হয়। এই সব কিছু মাথায় রেখে পানি ব্যবস্থাপনা জরুরী। সমুদ্রের পানি আমাদের কৃষি কাজে ব্যবহার যোগ্য নয়। তাই বৃষ্টির পানি ও উজানের পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে পানির প্রয়োজন মেঠানো সম্ভব। এজন্য জলাধারে ড্যাম্প তৈরি করা যেতে পারে।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী দিনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও ভয়াবহ হবে সন্দেহ নেই। বিগত দুই বছরের বেশি সময় ধরে মারাত্মক কোভিড়-১৯ মহামারীর সাথে লড়াই করে যাচ্ছি। উপরন্তু ইউক্রেণ-রাশিয়া যুদ্ধ পৃথিবীব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। এই সব বিবেচনায় আগামীতে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সংকটজনক হয়ে উঠবে। তাই আমাদের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সময়োপযোগী ব্যবস্থা নিতে হিবে। আমাদের অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের এ বিষয়ে কাজ করতে হবে।

আমরা আশা করি, বাংলাদেশ সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সফল হবে, সেই সাথে আগামী দিনে দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখবে।

লেখক : মিয়া মনসফ, যুগ্ম সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী(এমএনএ)

x

Check Also

জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত, দেশজুড়ে বাড়ছে লোডশেডিং

বিশেষ প্রতিবেদন দেশে জ্বালানি তেলের সংকট ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন কমাতে ...