এমএনএ অর্থনীতি ডেস্ক : দেশব্যাপী চাহিদা বাড়ায় দেদারছে বিক্রি হচ্ছে মার্কিন ডলার। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম ১০ দিনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ১২১ মিলিয়ন বা ১২ কোটি ১০ লাখ ডলার ক্রয় করেছে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৪০ কোটি ৬০ লাখ টাকা (ডলারপ্রতি ৮৬ টাকা ধরে)।
করোনার প্রকোপ কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমদানির চাহিদা বাড়ে। মূলত আমদানি চাপ সামাল দিতেই এত বিশাল অঙ্কের ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ক্রমবর্ধমান ডলারের চাহিদায় টাকার মান কমে গেলেও বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করতে এক প্রকার বাধ্য হয়েছে। এদিকে গেল ৬ মাসে আমেরিকান গ্রিন ব্যাংকের বিপরীতে টাকার মান ছিল ১ টাকা ২০ পয়সা।বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, রোববার পর্যন্ত আন্তঃব্যাংক মার্কিন ডলার প্রতি বিনিময় হার ছিল ৮৬ টাকায়। গেল ২০২১ সালের জুলাই মাসে এ হার ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। অর্থাৎ ৭ মাসের ব্যবধানে ব্যবধান বেড়েছে ১ টাকা ২০ পয়সা।
অপরদিকে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম ৬ মাসে ৩১৫ কোটি মার্কিন ডলার বিক্রি করেছে ব্যাংকগুলোর কাছে। যা এ যাবৎকালের মধ্যে রেকর্ড। গেল ২০২০-২১ অর্থবছর জুড়ে ২৯১ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিক্রি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যা চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসের চেয়ে ২৩৫ মিলিয়ন বা ২৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার বেশি।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে দেশের আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৮৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার বা ৩৩ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। করোনার প্রভাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে আমদানি কম হয়। তাই সে সময়ে এত ডলার বিক্রির প্রয়োজন পড়েনি। তখন বাজার থেকে আরও ডলার কিনতে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। কিন্তু চলতি বছরে ডলারের চাহিদা বাড়ায় টাকার মান কমা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা সময়ের আলোকে বলেন, ‘কোভিড-১৯-এর প্রভাবে প্রায় দেড় বছর দেশের অর্থনীতি স্থবির ছিল। সে প্রভাব কমে যাওয়ায় ব্যবসা আবার চাঙা হচ্ছে। ফলে আসছে দিনগুলোয় আমদানির চাহিদা পূরণে ডলারের চাহিদা আরও বাড়বে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিমাসেই আমদানি ব্যয় বাড়ছে। ফলে ডলারের চাহিদাও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বাজারে ডলার সরবরাহ না করলে আমদানি বড় ধরনের হোঁচট খাবে। তা ছাড়া বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভেও পর্যাপ্ত ডলার মজুদ রয়েছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিরবচ্ছিন্নভাবে ডলার সরবরাহ করছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ৬ মাসের সময়ে ৩ হাজার ৮৯৭ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে দেশ, যা এর আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৪ শতাংশেরও বেশি। এই সময়ে ৩১৫ কোটি ডলার ব্যাংকগুলোকে সরবরাহ করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভও কমেছে। গত আগস্টে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৪ হাজার ৮০০ কোটি (৪৮ বিলিয়ন) ডলার ছাড়ায়। তবে আমদানি দায় মেটাতে গিয়ে সম্প্রতি রিজার্ভ কমে ৪ হাজার ৫০০ কোটি (৪৫ বিলিয়ন) ডলারে নেমে এসেছে।
এদিকে দেশে ডলারের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি কমতে শুরু করেছে প্রবাসী আয়। করোনার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার পরে বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্য বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ছে। এসব কারণে আমদানিতে বাড়তি ডলার ব্যয় হচ্ছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও ডলার বিক্রি বাড়াতে হয়েছে।
ডলার বিক্রি প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, ‘অর্থনীতি এবং ব্যবসার সূচকগুলো ইতোমধ্যেই কোভিড-১৯-এর ধাক্কা কাটিয়ে উঠেছে, যার ফলে আমদানি পেমেন্ট বেড়েছে। আমদানি বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই ডলারের চাহিদা বাড়বে। সামনে হয়তো আরও ডলারের প্রয়োজন পড়বে।’
এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘গত কয়েক মাসে আমদানির টাকা পরিশোধের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে, যা অর্থনীতির জন্য ভালো। কিন্তু আমদানি অর্থ প্রদানের জন্য তহবিল ব্যবস্থাপনা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ক্রমবর্ধমান আমদানির চাহিদায় অর্থ পরিশোধে চলতি অর্থবছরের শেষে দেশের রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নামিয়ে আনতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, চলতি মাসের ৯ তারিখে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। গেল বছরের ডিসেম্বরেও রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৬ বিলিয়ন ডলার। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারের উচিত আমদানি ব্যয় কমানো। তাহলেই কেবল রিজার্ভের পরিমাণ এ অবস্থায় থাকবে বলে জানান আহসান এইচ মনসুর।
তবে তার এ নীতির সঙ্গে একমত নন বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমদানি কমানো তো কোনো সমাধান হতে পারে না। দেশীয় উৎপাদনের স্বার্থেই আমদানি জরুরি। কারণ আমাদের দেশের বেশিরভাগ পণ্য উৎপাদনে কাঁচামাল আনতে হয় বিদেশ থেকে। আমদানি কমে গেলে আমাদের রফতানি এবং উৎপাদনও কমে যাবে।’ তাই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য ভিন্ন ভিন্ন উপায় তৈরি করার কথা বলেন তিনি।
এই ব্যাংকার আরও জানান, ‘রেমিট্যান্স কমে যাচ্ছে। অথচ বিশ্বে এখন শ্রমের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। রেমিট্যান্স কেন কমে গেল সে বিষয়টি ফাইন্ড আউট করতে হবে। করোনায় সব চালু হওয়ার পাশাপাশি হুন্ডি কার্যক্রমও চালু হয়েছে। সরকারকে এদিকে তদারকি বাড়াতে হবে।’বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বিশ্ববাজারে দ্রব্যমূল্যের ক্রমবর্ধমান দাম বাড়ার প্রবণতা আমদানির দাবি পরিশোধ ডলার বিক্রির জন্য অন্যতম একটি কারণ।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

