Don't Miss
Home / অর্থনীতি / যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চায় উদ্যোক্তারা
মুক্ত বাণিজ্

যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চায় উদ্যোক্তারা

এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্টঃ বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চায় বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা। বুধবার যুক্তরাজ্যেও সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা শীর্ষক এক ওয়েবিনারে উদ্যোক্তারা এ দাবি জানান। এ সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত বৃটিশ হাইকমিশনার বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষনে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস ও প্রয়োজনীয় নীতিমালার সংষ্কারের পরামর্শ দেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘যুক্তরাজ্যের সাথে বাণিজ্য এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক এই ওয়েবিনারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রাবার্ট চ্যাটার্টন ডিকসন এবং যুক্তারাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বৃটেনে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা নিয়ে পণ্য রফতানি করতে পারবে, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি বিষয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দুদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়নে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ক ডায়ালগ আয়োজন, দুদেশের বাণিজ্য সংগঠনসমূহের মধ্যে যোগাযোগ আরো সুদৃঢ়করন, কোভিড উত্তর বাণিজ্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় ‘মার্কেট স্ট্রাটেজি’ প্রণয়ন এবং বৃটিশ-বাংলাদেশীদের আরো বেশি হারে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহী করার প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ তরুণ জনগোষ্ঠী তথ্য-প্রযুক্তি খাতে বেশ সম্ভাবনাময় এবং এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বৃটিশ তথ্য-প্রযুক্তি ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারে, যা তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, পাশাপাশি আমাদের তরুণদের দক্ষতাও বাড়াবে।

যুক্তারাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম বলেন, বৃটিশ বাণিজ্য সংগঠনসমূহ বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য খাত বিষয়ে খুব বেশি অবগত নয় এবং এ অবস্থা উত্তরণে বাংলাদেশের চেম্বার ও এসোসিয়েশনগুলোকে যোগাযোগ আরো বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ই-কমার্স বাজার রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশি তথ্য-প্রযুক্তি ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারে। হাইকমিশনার বলেন, বৃটেনে হালাল পণ্য এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে বিশাল বাজার রয়েছে এবং বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা সহজেই এ সুযোগ গ্রহণ করে আরো বেশি হারে পণ্য যুক্তরাজ্যে রফতানি করতে পারে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রাবার্ট চ্যাটার্টন ডিকসন বলেন, বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ একান্ত আবশ্যক। তিনি জানান, বাংলাদেশের ঔষধ, তথ্য-প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সেবা এবং আর্থিক খাতসমূহে বৃটিশ বিনিয়োগ আকর্ষনে যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও তিনি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষনে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস, প্রয়োজনীয় নীতিমালার সংষ্কার খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। হাইকমিশনার বলেন, সম্প্রতি বৃটেনে ‘বাংলা বন্ড’ চালু হয়েছে, যা দুদেশের উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তিনি দুদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশস্থ বৃটিশ হাইকমিশন হতে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন।

স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাজ্যের বন্ধুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে এবং বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগকারী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের অবস্থান দ্বিতীয়। ২০২০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত প্রায় ২০০টি বৃটিশ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ২.৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩.৪৫ বিলিয়ন মূল্যের পণ্য যুক্তরাজ্যে রফতানি করে, যেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের এর পরিমাণ ছিল ৪.৮৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বৃটিশ বিনিয়োগ আকর্ষনে তিনি নতুন পণ্যের উদ্ভাবন এবং পণ্যের বহুমুখীকরণে উপর জোরারোপ করেন।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি বাংলাদেশের অবকাঠমোখাতে বৃহৎ প্রকল্পসমূহে যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগ আকর্ষনে ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড’ চালুর প্রস্তাব করেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিকে চলমান রাখা, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং কোডিভ পরবর্তী অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানিতে শুল্ক ও কোটা মুক্ত সুবিধা আরো দীর্ঘ সময়ের জন্য বলবদ রাখা একান্ত প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার বাণিজ্য সম্প্রসারণে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের জন্য দুদেশের সরকারের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

আয়োজিত ওয়েবিনার ডায়ালগে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেম’র নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। মূল প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বিনিয়োগের ১০ শতাংশ। যদিও ২০১৮ সালে এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোতে যুক্তরাজ্যের সর্বমোট বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল ১৮৬.৪৬ বিলিয়ন বৃটিশ পাউন্ড, কিন্তু বাংলাদেশ এসেছে মাত্র ০.৩৭ শতাংশ। বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগ আরো বৃদ্ধিতে তিনি বাংলাদেশী রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, যথাযথ নীতিমালা ও কৌশল প্রণয়ন, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস, দ্রুততম সময়ে অবকাঠামো এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর (এসইজেড) কার্যক্রম বাস্তবায়ন, খুবই জরুরী বলে মত প্রকাশ করেন।

নির্ধারিত আলোচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) শরীফা খান, ডিসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি ও আনোয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসেন খালেদ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে’র চেয়ারম্যান ও ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন সভাপতি আসিফ ইব্রাহীম, বেসিস’র সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির, ইনস্পেটা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড-এর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মোক্তাদির, প্রাণ আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং সিইও আহসান খান চৌধুরী এবং রহিমআফরোজ স্টোরেজ পাওয়ার বিজনেস-এর নির্বাহী পরিচালক ফারাজ এ রহিম অংশগ্রহণ করেন।

প্রাণ আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং সিইও আহসান খান চৌধুরী বৃটেনে বাংলাদেশী পণ্য ও সেবা রফতানি বাজার সম্প্রসারণে দুদেশের মধ্যকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর, রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং বাংলাদেশী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো বেশি হারে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে প্রবর্তিত ‘বাংলা বন্ড’-এ বিনিয়োগ করার প্রস্তাব করেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) শরীফা খান জানান, বৃটিশ সরকার ২০২৭ পর্যন্ত বাংলাদেশী পণ্যের শুল্ক ও কোটা মুক্ত সুবিধা প্রদান করছে এবং বাংলাদেশী পণ্য রফতানিতে বিদ্যমান শুল্ক কাঠামোর বিষয়টি আলোচনাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানি বৃদ্ধির জন্য পণ্যের বহুমুখীকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ-জ্বালানী, পর্যটন, স্বাস্থ্য ও নার্সিং প্রভৃতি খাতে বৃটিশ বিনিয়োগের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

রহিমআফরোজ স্টোরেজ পাওয়ার বিজনেস-এর নির্বাহী পরিচালক ফারাজ এ রহিম বৃটেনে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের পণ্য রপ্তানির উপর জোরারোপ করেন এবং বাংলাদেশে বৃটিশ বিনিয়োগ আকর্ষনে আমাদের স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সাথে যুক্তরাজ্যের কোম্পানীগুলোকে যৌথ বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

ইনস্পেটা ফার্মাসিউটিক্যালের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মোক্তাদির বৃটেনে বাংলাদেশী ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের নিবন্ধন পেতে সেদেশের এমএইচআরএ-এর সাথে বাংলাদেশী ওষুধ নিয়ন্ত্রন সংস্থার যোগাযোগ স্থাপনে বাংলাদেশস্থ বৃটেনের দূতাবাসকে সহযোগিতার আহ্বান জানান। তিনি জানান, যুক্তরাজ্যে প্রায় ৪-৫ বিলিয়ন বৃটিশ পাউন্ডের জেনেরিক বাজার রয়েছে, যা আমাদের ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।

বেসিস সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, সফটওয়্যার এবং তথ্য-প্রযুক্তি সেবাখাতে গত বছর বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ ছিল ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এখাতে পণ্য রফতানিতে যুক্তরাজ্যর অবস্থান দ্বিতীয়। তিনি ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট তৈরিতে নিয়োজিত যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমাদের হাইটেক পার্কে বিনিয়োগের আহ্বান জানান, যার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা বিনিময় বৃদ্ধি পাবে।

ডিসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি ও আনোয়ার গ্রæপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসেন খালেদ বলেন, তৈরি পোষাকের বাইরে বৃটেনে বাংলাদেশী পণ্য রফতানির পরিমাণ মাত্র ৭ শতাংশ এবং এ অবস্থা উত্তরণে আমাদের পণ্যের বহুমুখীকরণের কোন বিকল্প নেই। তিনি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সম্প্রসারণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস এবং ভ্যালু চেইন স্থাপনের প্রস্তাব করেন।

আসিফ ইব্রাহীম বলেন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বৃটেনে বাংলাদেশী তৈরি পোষাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেটি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেড়ে ৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে এসে দাড়িঁয়েছে।

মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি ও বিল্ড’র চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান বলেন, সম্প্রতি চায়না বাংলাদেশী প্রায় ৩০০০ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করেছে, তিনি এ সুযোগ গ্রহণ করে বৃটিশ কোম্পানীসমূহকে আরো বেশি হারে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

x

Check Also

বাজেটে ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ আসছে না: বাণিজ্যমন্ত্রী

এমএনএ প্রতিবেদক আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে দেশের ব্যবসায়ীদের ওপর কোনো অতিরিক্ত চাপ বা নেতিবাচক ...