Don't Miss
Home / জাতীয় / সাংবাদিকদের রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য চেয়ে পুলিশের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ, ক্ষোভ

সাংবাদিকদের রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য চেয়ে পুলিশের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ, ক্ষোভ

বিশেষ প্রতিবেদক

পুলিশের সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চ (সিটিএসবি) থেকে পাঠানো একটি চিঠির ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত সাংবাদিকদের কাছে রাজনৈতিক পরিচয়সহ ব্যক্তিগত নানা তথ্য চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা ফোন করে কিংবা বাসায় গিয়ে এসব তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন একাধিক সাংবাদিক। অনেকের অভিযোগ, তথ্য চাওয়ার ধরন ছিল আক্রমণাত্মক ও হুমকিসূচক।

সম্প্রতি সিটিএসবির পূর্ব বিভাগের পক্ষ থেকে মতিঝিল, তেজগাঁও, শাহবাগ, সূত্রাপুর, পল্টন ও সবুজবাগ জোন ইনচার্জদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সাংবাদিক ও ‘সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের’ বিস্তারিত তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে নাম-ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক পরিচয়, সাংবাদিকতার বাইরে অন্য কোনো পেশা, পারিবারিক তথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লিংকসহ বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হয়েছে। একটি চিঠির কপি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে।

ফোন পাওয়া সাংবাদিকদের ভাষ্য, পুলিশ সদস্য পরিচয়ে যারা যোগাযোগ করছেন তারা অনেক ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদের মতো করে কথা বলছেন। এতে উদ্বেগ, নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে সাংবাদিকদের মধ্যে।

একটি বেসরকারি টেলিভিশনের বিশেষ সংবাদদাতা বলেন, “আমাকে ফোন করে জানতে চাওয়া হয়েছে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত কি না, অতীতে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি কি না। প্রশ্নের ধরন ছিল জিজ্ঞাসাবাদের মতো। এতে আমি আতঙ্কিত বোধ করছি।”

তিনি আরও বলেন, অতীতে ভিভিআইপি অনুষ্ঠান কাভার করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, কিন্তু কখনো রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়া বা এমন আক্রমণাত্মক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়নি।

একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক অভিযোগ করেন, তাকে ফোন করে বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করার কথা বলা হয় এবং আগে থেকেই এনআইডি, ছবি ও বিদ্যুৎ বিলের কপি প্রস্তুত রাখতে বলা হয়। তার ভাষায়,

“প্রশ্ন ও তথ্য চাওয়ার ধরন ছিল চরম অপেশাদার। মনে হয়েছে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, কখনো আবার প্রচ্ছন্ন হুমকিও দেওয়া হয়েছে।”

একটি ইংরেজি দৈনিকের তিন সাংবাদিকও একই ধরনের ফোন পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। ওই পত্রিকার এক জ্যেষ্ঠ নারী সাংবাদিক বলেন, “সাংবাদিকদের কাজই হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম কাভার করা। সেটিকে রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ ধরনের তথ্য সংগ্রহ ভবিষ্যতে নজরদারি বা হয়রানির হাতিয়ার হতে পারে।”

‘ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’

মিরর এশিয়ার হেড অব নিউজ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আসিফ শওকত কল্লোল বলেন, “২৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে পুলিশের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন কখনো শুনিনি। আমার বাবার রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়া হচ্ছে। এটা পুলিশের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। সাংবাদিকতার বাইরে ব্যবসা করি কি না, সেটাও বলতে বাধ্য নই।”

তার দাবি, তিন থেকে সাড়ে তিনশ সাংবাদিককে তালিকাভুক্ত করে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে, যা ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, তাকেও ফোন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “এটা কেন করা হচ্ছে, সরকার জানে কি না, উদ্দেশ্য কী—তা স্পষ্ট নয়। আমরা ডিআরইউর পক্ষ থেকে বিষয়টি জানার চেষ্টা করছি।”

তিনি আরও বলেন, যদি সরকারের উদ্দেশ্য সৎও হয়, তাহলেও সাংবাদিকদের রাজনৈতিক পরিচয়, এনআইডি বা বিদ্যুৎ বিলের কপি চাওয়ার যৌক্তিকতা নেই। “সাংবাদিক কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হতেই পারেন, কিন্তু তিনি রাজনীতিবিদ নন। এটাকে এক করে দেখা ঠিক নয়,” বলেন তিনি।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া বলেন, “সরকার যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পরিপত্র জারি করবে, অফিসে ফরম দেবে। কিন্তু বিশেষ সংস্থা থেকে সাংবাদিকদের ফোন করা, বাসায় গিয়ে ইন্টারভিউ নেওয়া কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়ার সুযোগ নেই।”

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি সাজ্জাদ আলম খান তপু বলেন, “সাংবাদিকরা নীতি-নৈতিকতা মেনেই কাজ করেন। কিন্তু পুলিশের এমন কর্মকাণ্ডে অনেক সহকর্মী ভীতসন্ত্রস্ত। স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকিস্বরূপ কোনো কিছুই শুভকর নয়।”

টিআইবির কঠোর প্রতিক্রিয়া

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এই উদ্যোগকে “স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত” বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, “গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের এ পদক্ষেপ কুখ্যাত স্বৈরতান্ত্রিক চর্চাকেও ম্লান করে দিয়েছে। স্বাধীন সাংবাদিকতা, ভিন্নমত, মুক্ত সাংস্কৃতিক চর্চা এবং চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা পদদলিত করা হচ্ছে।”

তার ভাষ্য, যদি সরকারের নির্দেশে বা সম্মতিতে এমন কার্যক্রম হয়ে থাকে, তাহলে তা গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার ইঙ্গিত বহন করে।

পুলিশের বক্তব্য নেই, ভেতরে অসন্তোষ

বিষয়টি নিয়ে স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটিএসবির এক কর্মকর্তা বলেন, মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের সরাসরি সাংবাদিকদের ফোন করে তথ্য চাওয়ার কথা নয়।

তিনি বলেন, “এ ধরনের তথ্য সাধারণত গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমেই সংগ্রহ করা হয়। যদি কেউ সাংবাদিকদের ফোন করে বা বাসায় গিয়ে তথ্য চাইতে থাকে, তাহলে সেটি দুঃখজনক এবং নির্দেশনা ভুলভাবে বোঝার ফল হতে পারে।”

আরেক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া হবে।

x

Check Also

১০ মাসে এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি লাখ কোটি টাকা ছাড়াল, লক্ষ্য পূরণ নিয়ে শঙ্কা

বিশেষ প্রতিবেদক চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়েছে ...