এমএনএ রিপোর্ট : সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাষ্ট্রদূত ফারুক চৌধুরী (৮৪) আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আজ বুধবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ফারুক চৌধুরী ইন্তেকাল করেন।
সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাষ্ট্রদূত সমশের মবিন চৌধুরী গণমাধ্যমকে এই তথ্য জানান।
ফারুক চৌধুরী হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা ছাড়াও বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী জীনাত চৌধুরী, ছেলে আদনান, মেয়ে ফাইয়াজসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
ফারুক চৌধুরী ও তার স্ত্রী জিনাত চৌধুরীর দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে ছেলে আদনান চৌধুরী ব্যবসা করেন। মেয়ে ফারজানা আহমেদ থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়।
তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজ বাদ আসর ধানমন্ডি ৭ নম্বর রোডের বাইতুল আমান জামে মসজিদে ফারুক চৌধুরীর জানাজা হবে। এর আগে তাঁর মরদেহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নেওয়া হবে। সেখানেও তাঁর জানাজা হওয়ার কথা।পরে আজিমপুর কবরস্থানে বাংলাদেশের সাবেক এই কূটনীতিককে দাফন করা হবে বলে শমসের মবিন জানান।
অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী কূটনীতিক ফারুক আহমদ চৌধুরী। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভাষা ও আচরণ কেমন হওয়া উচিত তা নির্ধারণে তার রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। তিনি দেখেছেন ভারতবর্ষ থেকে পাকিস্তানের জন্ম, এর বিলয় এবং নতুন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্থান।
ফারুক চৌধুরী নামেই বেশি পরিচিত সাবেক এই পররাষ্ট্রসচিবের পুরো নাম ফারুক আহমেদ চৌধুরী। ১৯৩৪ সালের ৪ জানুয়ারি সিলেট জেলার করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। করিমগঞ্জ তখন সিলেটের অন্তর্ভুক্ত হলেও এখন তা আসামভুক্ত।
তার বাবা গিয়াসুদ্দিন আহমদ চৌধুরী ছিলেন সরকারি চাকুরে, মা রফিকুন্নেছা খাতুন চৌধুরী। ম্যাজিস্ট্রেট বাবার প্রথম সন্তান ফারুক চৌধুরী। তার আরও তিন ভাই ও দুই বোন রয়েছেন, যাঁদের প্রায় সবাই পরবর্তী সময়ে খ্যাতিমান-সফল। ইনাম আহমেদ চৌধুরী (সাবেক সচিব ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত), প্রয়াত মাসুম আহমেদ চৌধুরী (রাষ্ট্রদূত), ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী (রাষ্ট্রদূত, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও অধ্যাপক), বোন নাসিম হাই (স্বামী শহীদ কর্নেল সৈয়দ আবদুল হাই), ছোট বোন নীনা আহমেদ (স্বামী ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা)।
বাবা সরকারি চাকুরে, ফলে বদলি অবধারিত একটি ব্যাপার। এর সঙ্গে আরেকটি অবধারিত ব্যাপার ছিল, তা হলো স্কুল বদল। ১৯৪১ সালে ভর্তি হন সুনামগঞ্জ জুবেলি স্কুলে, এরপর ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত, এই আট বছরে বদলাতে হয়েছে ৮টি স্কুল। তবে স্কুল বদল ঘটলেও পড়াশোনায় ব্যত্যয় ঘটেনি। মাধ্যমিক শেষ করে চলে এলেন ঢাকায়। ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ১৯৫২ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইংরেজি সাহিত্যে।
তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরিজীবন শুরু করেন ১৯৫৬ সালে, যখন পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশ (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান) থেকে মাত্র দুইজনকে মেধার ভিত্তিতে এই ক্যাডারে সুযোগ দিত। ১৯৯২ সালে চাকরিজীবন শেষ করেন পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ইটালি, নেদারল্যান্ডস ও আলজেরিয়ায় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক। স্বাধীনতার পর তিনি যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বেলজিয়ামে মিশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন ফারুক চৌধুরী। পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ফারুক চৌধুরী ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে সার্কের জন্মলগ্নে প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ফারুক চৌধুরী ভারত এবং পাকিস্তানে বাংলাদেশ প্রতিনিধি ছিলেন। ওআইসি এবং সার্ক প্রথম সম্মেলনের সমন্বয় ছাড়াও তিনি জাতিসংঘ এবং অন্যান্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
চাকরিসূত্রে ঘুরেছেন যেমন নানা দেশ, তেমন দেখা হয়েছে নানা রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে, সান্নিধ্য পেয়েছেন খ্যাতিমান মানুষের। এর মধ্যে রযেছেন—ফিলিস্তিন রাষ্ট্রনায়ক ইয়াসির আরাফাত, ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী (১৯৮৭), চীনের প্রেসিডেন্ট ওয়েন জিয়াবাওয়ে (২০০৩), ভুটানের রাজা জিমে খেসার ওয়াংচুক, চীনের সর্বশেষ সম্রাট পু ই, বক্সার মোহাম্মদ আলী, আণবিক বিজ্ঞানী কাদির খান—এমন আরো অনেক নাম। তবে তাঁর কাছে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিশেষভাবে স্মরণীয়। একজন রাষ্ট্রনায়ক এবং দূরদর্শী কূটনীতিক বোধ ছিল তাঁর, যা নতুন একটি দেশকে বিশ্ব দরবারে গ্রহণীয় হতে সহায়তা করেছিল।
১৯৯২ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ফারুক চৌধুরী ব্র্যাকের উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ব্র্যাক পরিচালনা পর্ষদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ছিলেন তিনি। এ ছাড়া বেসরকারি গৃহায়ণ প্রতিষ্ঠান ডিবিএইচের (ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং ফাইনান্স কর্পোরেশন) চেয়ারম্যান ছিলেন।
ফারুক চৌধুরীর লেখা বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘জীবনের বালুকাবেলায়’, ‘দেশ দেশান্তর’, ‘প্রিয় ফারজানা’, নানাক্ষণ নানাকথা’, ‘স্বদেশ স্বকাল স্বজন’ ‘সময়ের আবর্তে’ ইত্যাদি। এ ছাড়া পত্রিকায় নানা বিষয় নিয়ে কলাম লিখতেন এবং আন্তর্জাতিক বিষয় বিশ্লেষণ করতেন।
ঝানু এই কূটনীতিকের প্রকাশিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবনের বালুকাবেলায়’ ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এই বইয়ের জন্য তিনি ২০১৫ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার।
এছাড়াও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ফারুক চৌধুরী আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পান।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

