সড়ক দুর্ঘটনা অপ্রতিরোধযোগ্য কোনো বিষয় নয়। এজন্য দরকার ইতিবাচক চিন্তা ও সমন্বিত পদক্ষেপ। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কঠোর হবে। আইনের প্রয়োগে কোনো বাধা আসবে না। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল আর আমরা দেখতে চাই না।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে সোচ্চার নাগরিক সমাজ। জাতিসংঘের যেসব সদস্য দেশ ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছিল, সে তালিকায় বাংলাদেশও আছে। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা না কমে বরং প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী গত বছর ছয় হাজার ৫৮১টি সড়ক দুর্ঘটনায় আট হাজার ৬৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে প্রতিদিন ২৪ জনের মৃত্যুর হিসাব দিয়েছে সংগঠনটি। প্রতিবেদন অনুসারে, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে ৫৬ ভাগ, শহর এলাকায় ২৩ ভাগ, গ্রাম ও ফিডার রোড বা সংযোগ সড়কে ২১ ভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
অবশ্য পুলিশের হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান গড়ে ছয়জন। সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় বাংলাদেশ সই করলেও সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই বাংলাদেশের। কিছু সড়কের বাঁক সোজা করা ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বাইরে কোনো উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। চালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও যানবাহনের ফিটনেসের দিকে কোনো দৃষ্টি আছে বলে মনে হয় না। গত শনিবার সকালে বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঘন কুয়াশায় একটি গাড়ির ওপর আরেকটি গাড়ি আছড়ে পড়েছে। অন্তত ২০টি গাড়ি দুর্ঘটনাকবলিত হয় সেখানে। নিহত হন ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের ছেলেসহ অন্তত সাতজন। একই দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় আরো ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বস্তুত প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু কিংবা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার চিত্র এক কথায় ভয়াবহ। এ থেকে মুক্তি পেতে দেশের মানুষ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা প্রত্যাশা করে। তবে শুধু কঠোর শাস্তির বিধান করে সড়ক দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। শাস্তির পাশাপাশি আরও অনেকগুলো বিষয়ের প্রতি নজর দিতে হবে।
দেশের যোগাযোগব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। দৃষ্টিনন্দন আধুনিক যানবাহন যেমন বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছে, তেমনি ফিটনেসবিহীন যানবাহনও যে অবাধে সড়কজুড়ে চলাচল করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এসব গাড়ির চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ আছে, এ কথাও নিশ্চিত করে বলা যাবে না। একদিকে রাজনৈতিক বিবেচনা, অন্যদিকে লাইসেন্স প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ আছে। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে প্রশিক্ষণহীন চালকদের হাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স ধরিয়ে দেওয়া হয়। আবার ক্ষেত্রবিশেষে রাজনৈতিক কিংবা সাংগঠনিক চাপের মুখে যে অনেক লাইসেন্স দিতে হয় না, তা নয়। ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরির কারখানাও তো আছে সারা দেশে। একটি পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ৬১ শতাংশ চালক পরীক্ষা না দিয়ে লাইসেন্স নিচ্ছেন, অন্যদিকে দেশের ১৬ লাখ চালক বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছেন। এমন ঘটতে থাকলে সড়ক দুর্ঘটনা নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে—এটাই তো স্বাভাবিক!
প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। একেকটি মৃত্যু একেকটি পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদে অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অপমৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমরা চাই প্রশিক্ষিত চালকরা সত্যিকারের ফিটনেস সনদ পাওয়া যানবাহন চালাবেন।
অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, রাস্তার ওপর ও ফুটপাতে দোকানপাট, অপরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থা ও ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি, খেয়ালখুশি মতো যত্রতত্র পার্কিং, মহাসড়কের ওপর ম্যাক্সি-টেম্পোস্ট্যান্ডসহ রাস্তার মাঝখানে ডাস্টবিন ও হাটবাজার স্থাপন ও পথচারীদের অসচেতনতা ইত্যাদি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি সড়ক দুর্ঘটনার ১৪টি কারণ শনাক্ত করেছে এবং সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ১০টি সুপারিশ করেছে, যা আমলে নেয়া উচিত। সড়কপথের সংস্কার ও উন্নয়নের কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন না হওয়াও দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ। এর ফলে সড়কের সিলকোট ও সুরকি উঠে গিয়ে বিভিন্ন অংশে খানা-খন্দকের সৃষ্টি হয়ে দুর্ঘটনা ত্বরান্বিত করে। এদিকেও কর্তৃপক্ষের নজর দিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকার সমন্বিত উদ্যোগ নেবে- এটাই প্রত্যাশা।
-সম্পাদক
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক



