এমএনএ প্রতিবেদক
দেশজুড়ে মাজারকেন্দ্রিক হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়লেও আইনি ব্যবস্থায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। গত প্রায় ২০ মাসে এমন ৬৭টি হামলার ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মামলা হয়নি; অনেক ঘটনাই সীমাবদ্ধ থেকেছে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পর্যায়ে। দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বড় অংশ এখনও তদন্তাধীন, আর অল্প কয়েকটিতে জমা হয়েছে অভিযোগপত্র। ফলে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কুষ্টিয়ার একটি হত্যাকাণ্ড আবারও মাজারের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা সামনে এনেছে। জানা গেছে, গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় একটি দরবার শরিফে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে দরবারের প্রধান আব্দুর রহমান নিহত হন। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই ফজলুর রহমান সান্টু বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতাসহ অজ্ঞাত আরও প্রায় ১৮০ জনকে আসামি করা হলেও প্রধান অভিযুক্ত এখনও গ্রেপ্তার না হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। গত ২০ মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাজারকেন্দ্রিক সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। সিলেটে একটি মাজারে হামলা ও গান-বাজনা নিষিদ্ধের দাবি, নারায়ণগঞ্জে দুইটি মাজারে অগ্নিসংযোগ, গাজীপুরে তাণ্ডব, সিরাজগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে ভাঙচুর—এসব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ৬৭টি মাজারকেন্দ্রিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মামলা হয়েছে মাত্র ২৬টি, আর ৪০টি ক্ষেত্রে করা হয়েছে জিডি। অর্থাৎ, বড় অংশের ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ আইনি প্রক্রিয়া শুরুই হয়নি।
অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা রেঞ্জে সর্বোচ্চ ২৫টি ঘটনা ঘটেছে এবং গ্রেপ্তার হয়েছে ৩৩ জন। চট্টগ্রাম রেঞ্জে ঘটেছে ১৫টি ঘটনা। অন্যদিকে ময়মনসিংহ রেঞ্জে তুলনামূলক কম ঘটনা হলেও গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেশি—৮টি ঘটনায় ২৫ জন। তবে রাজশাহী, খুলনা, বরিশালসহ কয়েকটি রেঞ্জে ঘটনার পরও গ্রেপ্তার বা মামলার সংখ্যা খুবই কম।
তদন্তের অগ্রগতিও সন্তোষজনক নয়। দায়ের করা ২৬টি মামলার মধ্যে মাত্র ৯টিতে অভিযোগপত্র জমা হয়েছে। ১১টি মামলা এখনও তদন্তাধীন, আর ৬টিতে দেওয়া হয়েছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন। অর্থাৎ, প্রায় ৪২ শতাংশ মামলা দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে রয়েছে।
তবে মেট্রোপলিটন এলাকায় তুলনামূলকভাবে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত। বড় শহরগুলোর ৮টি মেট্রোপলিটন এলাকায় মোট ঘটনা ঘটেছে মাত্র ৬টি, এবং এসব মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা নিজেরাই মামলা না করে জিডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চান। তবে যেখানে অপরাধের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, সেখানে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যদিও তদন্তে সময় লাগছে, তবুও প্রক্রিয়া চালু রয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব হামলার পেছনে অনেক সময় রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করে, আবার ধর্মীয় ব্যাখ্যার আড়ালে কিছু গোষ্ঠী সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কার্যকর বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহ পাচ্ছে এবং ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব ঘটনার যথাযথ প্রতিকার না থাকায় সমাজে অস্থিরতা বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। তাদের সতর্কবার্তা—এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুতরভাবে পড়তে পারে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

