এমএনএ ফিচার ডেস্কঃ চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্বের ব্যবসা বানিজ্য ও অর্থনীতির উপর প্রভাব পড়েছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে বলে মনে হচ্ছে। ইউরোপীয় জোট ইউক্রেনকে সমর্থন করার কারণে রাশিয়া হয়তো যুদ্ধের নানান কৌশল খুঁজছে এমন ধারনাই স্পস্ট।
এমন এক সময় ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধ বেঁধেছে যখন কোভিড-১৯ মহামারীর বিধ্বংসী প্রভাব থেকে বিশ্ব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। যুদ্ধ ও করোনা মহামারীর কারণে অর্থনৈতিক মন্দা সম্মুখীন হচ্ছে পুরো বিশ্ব। এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরী। বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস বলেছেন, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে খাদ্য সংকট দেখা দিলে এক মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে পুরো বিশ্ব।খাদ্য সংকট নিয়ে রাজনৈতিক সংকটও প্রকট হয়ে উঠবে।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের আগেও ২০০০ সালের শুরুতেই বিশ্বের অনেকাংশে অত্যধিক খাদ্যমূল্য, খাদ্য ঘাটতি গভীর ক্ষুধার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পথে ছিল। ডাব্লিউএফপি সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি দ্রুত বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। রাশিয়া ইউক্রেন গম ভুট্টা, বার্লি, রাই, সূর্যমুখী বীজ এবং আরো অনেক পণ্যের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ। এই দুই দেশ বিশ্বের ৩০শতাংশ গম সরবরাহ করে থাকে।ইউরোপের মধ্যে ইউক্রেন হচ্ছে সবচেয়ে বেশী আবাদযোগ্য দেশ।ইউক্রেন বিশ্বেব্যাপী ১৬%শতাংশ ভুট্টা রপ্তানী করে থাকে।আর রাশিয়া সার উৎপাদক দেশ। যুদ্ধের কারণে আগামীতে সব ফসলের সারের দাম বাড়িয়ে দেবে রাশিয়া।তখন রাশিয়া থেকে সার আমদানীকারক দেশগুলো উচ্চদামে সার কিনতে হবে। বেড়ে যাবে খাদ্য উৎপাদন ব্যয়।তখন সে দেশের জনগনকে চড়া দামে খাদ্য কিনতে হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অষ্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশিরভাগ দেশে খাদ্যের দাম আরও বৃদ্ধি পাবে।ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হবে।ধনী দেশ হবার কারণে তাদের খাদ্য মজুদ সন্তোষজনক থাকবে।
কিন্তু উন্নয়নশীল দেশের অনেকাংশে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।বিশ্বের পঞ্চাশটি দেশ খাদ্য সরবরাহের জন্য রাশিয়া ও ইউক্রেনের উপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে উত্তর আমেরিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচের দরিদ্রতম দেশ রয়েছে।এই যুদ্ধের কারণে এসব দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। সারা বিশ্বে খাদ্য সঙ্কটের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
চলমান যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনে খাদ্য উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আর রাশিয়ার উৎপাদিত খাদ্য নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে। সুতরাং, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং দেশগুলিকে তাদের খাদ্য নিরাপত্তার কারণে খাদ্যের ঘাটতি নিজেদের পূরণ করতে হবে।
খাদ্য উৎপাদনকারী দেশগুলো উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলির উপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে। এতদিন তেল ও গ্যাস নিয়ে বিশ্ব রাজনীতি দেখেছি, এখন আরেক রাজনীতির খেলায় খাদ্যই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
এই খাদ্য রাজনীতির খেলায় শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়, উন্নত দেশগুলোও হুমকির মধ্যে পড়বে। খাদ্য মানুষের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদা। খাদ্যের অভাবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। যদিও বর্তমানে বাংলাদেশে খাদ্যের কোন ঘাটতি নেই। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আশ্বাস দিয়েছেন, আমাদের পর্যাপ্ত খাবার আছে। তবুও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।কিন্তু অনেক খাদ্যপণ্য আমাদের বিদেশের সরবরাহের উপর নির্ভর করতে হয়।হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির কারণে এমনিতেই সারা বছরই পণ্যের মৌসুমী সংকটের মধ্যে পড়ি। খাদ্য সংকটের মত অবস্থার সৃষ্টি হলে উন্নত দেশগুলো তাদের খাদ্যঘাটতি মোকাবেলায় খাদ্য মজুদ করে রাখতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় যেভাবে নীরব অর্থনৈতিক মন্দা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলা করার লক্ষ্যে এখনই প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ বিষয়ে সতর্ক করে দেশবাসীকে আহবান জানিয়েছেন, খাদ্য ঘাটতি মেটাতে প্রতি ইঞ্চি জায়গা আবাদের আওতায় আনতে। তিনি জনগনকে খাদ্যসামগ্রী উৎপাদনে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত বলেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের খাদ্য ঘাটতির চাহিদা মেটাতে বঙ্গবন্ধু সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। বাড়ির আশেপাশে, স্কুলের মাঠ, রাস্তারধারের ফাঁকা জায়গাসহ প্রতিটি পতিত জমিতে চাষ করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর এই উদ্যোগ ভাল ফলও হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন, জনগনের খাদ্য নিরাপত্তা ছাড়া দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব নয়।তাই তিনি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার দিকে নজর দেন। বর্তমান পরিস্থিতেও এখন বঙ্গবন্ধুর ‘সবুজ বিপ্লব’ এর মতো উদ্যোগ নেয়া জরুরী। যা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন।
বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অত্যন্ত সন্তোষজনক।বৈদেশিক রেমিট্যান্স ও আরএমজি রপ্তানি থেকে আয়ের কারণে এই রিজার্ভ হয়েছে।যদি বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট দেখা দিলে এবং বৈদেশিক উভয় খাত গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তখন আরএমজির চাহিদা কমে যাবে, সেই সাথে বিদেশে কর্মরতদের চাকুরি হারানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায়না।তাই খাদ্যসংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের খাদ্যঘাটতি মোকাবেলায় আগামী পাঁচ বছর বিভিন্ন নীতি ও কৌশল গ্রহন করা জরুরী।এই সময়ে যুদ্ধ ও প্রকৃতিগত কারণে খাদ্য সংকটের মুখিমুখি হবে পুরো বিশ্ব।জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশ মোকাবেলা করছে বন্যা, খরাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ইতিমধ্যে চেরাপুঞ্জিতে অতি বৃষ্টির কারণে দেশের কয়েকটি জেলায় আকস্মিক বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
আমাদের নদীর উৎসস্থল হচ্ছে ভারতে। আর বাংলাদেশের অবস্থান নদীর নিম্নপ্রবাহে।বাঁধ দিয়ে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা দূরহ কাজ। কিন্তু প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বাঁধ নির্মাণ করে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়।নদীর একটি পয়েন্টে বাঁধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলে অন্য পয়েন্টে পানির প্রবাহ বেরিয়ে আসে।বরং নদীকে নিয়ন্ত্রণ না করে হাওড় অঞ্চলগুলিকে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা যেতে পারে। বর্ষাকালে আমাদের এই নিচু জমিগুলোকে পানি সহনশীল উদ্ভিদ উৎপাদনের চেষ্টা করা যায়, যা পানির মধ্যে বেঁচে থাকতে পারে।
আমাদের খাদ্য সংকট মোকাবেলায় আরো কিছু পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। আমাদের জমি খুবই উর্বর। কৃষি উৎপাদন খুবই সহজ।প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে পারলে খাদ্য সংকট মোকাবেলা করা সহজ হবে।
মাঙস, মাছ, ডিম ও দুধ উৎপাদনে আমারদের আরো মনোযোগী হতে হবে।গ্রামীন জনপদ ও শহরতলীতে ছোট ছোট খামার গড়ে তুলতে সরকারীভাবে প্রচার চালাতে হবে। জনগনকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে কৃষি উৎপাদন সম্প্রসারণে। সরকার, এনজিও, প্রশাসন, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর কর্মীরা প্রচার কাজে সম্পৃক্ত হবে যাতে জনগনকে পতিত জায়গা খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহার করতে অনুপ্রাণিত করা যায়।
পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়সম্পূর্ণ হতে তেমন বেগ পেতে হবেনা।দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরী। আমাদের দেশের বিশাল জনগোষ্টী। এই জনগোষ্টীর কথা বিবেচনা করে নিজেদের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অপরিহার্য্।
যে কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বারবার দেশের জনগনকে খাদ্য উৎপাদনে নিজেদের সম্পৃক্ত হবার কথা বলেছেন। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আগামী কয়েক বছর জন্য খাদ্য সংকট মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
আমরা আশা করি, বিশ্ব যে অবস্থা দিয়ে যাচ্ছে, বর্তমান খাদ্য সংকট মোকাবেলায় আমাদের দেশের ষোল কোটি মানুষ খাদ্য উৎপাদনে এগিয়ে আসে, তাহলে এদেশের কেউ ক্ষুধার্ত থাকবেন।
লেখক: মিয়া মনসফ, যুগ্ম সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ)
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
