দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন কোচিংনির্ভর হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় শিক্ষাকে জাতির মেরুদন্ড হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সর্বাগ্রে কোচিংনির্ভরতা বন্ধে শিক্ষায় সংস্কার আনাটা জরুরি। এজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সরকারকে দ্রুততার সঙ্গে নিতে হবে।
প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এই বাণিজ্যিক প্রবণতা। বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য দিন দিন কোচিংনির্ভরতা বেড়েই চলেছে। ভর্তির পরও কোচিং থেকে মুক্তি নেই। বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেই শিক্ষার্থীদের ছুটতে হয় কোচিং সেন্টারে। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি মফস্বলের শিক্ষার্থীরাও এখন কোচিংনির্ভর হয়ে পড়ছে। দেশের বেশির ভাগ শিক্ষকই কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের প্রতি মনোযোগী হওয়ার চেয়ে কোচিং সেন্টারে মনোনিবেশ এখন অনেক শিক্ষকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর ফল ভোগ করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অভিভাবকদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। অথচ শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী হলে অনেক শিক্ষার্থীকেই কোচিংনির্ভর হতে হতো না। অভিভাবকদেরও অতিরিক্ত অর্থ জোগান দিতে হতো না।
শিক্ষকতা সাধারণ কোনো পেশা নয়, ব্রত। এ পেশায় যাঁরা আসবেন, তাঁদের মধ্যে অন্য অনুপ্রেরণা থাকতে হবে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যাবে সমাজের সব ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের অবহেলা করা হয়। শিক্ষকদের জন্য আলাদা কোনো বেতন কাঠামো নেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসা মেধাবী শিক্ষার্থীরা এই পেশার প্রতি আকৃষ্ট হন না। অন্যদিকে বাধ্য হয়ে যাঁরা এই পেশাটি গ্রহণ করেন, সামাজিক সম্মান বজায় রাখার মতো আর্থিক সঙ্গতি অর্জন করতে গিয়ে অনেকেই কোচিং বাণিজ্যের মতো অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শতভাগ মনোনিবেশ করলে কোনো শিক্ষার্থীকেই কোচিং সেন্টারে গিয়ে আলাদা পাঠ নিতে হবে না। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষকরা আলাদা করে পাঠদানের ব্যবস্থাও করতে পারেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শিক্ষকরা শুধু নিয়ম রক্ষার জন্যই শ্রেণিকক্ষে আসেন। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর তাঁদের আর কোনো দায়িত্ব থাকে বলে মনে হয় না। রাজধানীর নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যেন এটা অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে ওঠা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো শিক্ষকদের নামমাত্র বেতন দেওয়া হয়। কোনো নিয়মনীতি মানা হয় না। এই শিক্ষকদের বাধ্য হয়েই কোচিং সেন্টারনির্ভর হতে হয়। যেখানে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য কোনো প্রণোদনা নেই, সেখানে কোনো শিক্ষকই এ পেশাকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করবেন না—এটাই স্বাভাবিক। অনেক শিক্ষকের কাছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী সংগ্রহের বড় ও লাভজনক মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।
কোচিং বন্ধে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১২ সালে একটি নীতিমালা করেছিল। কিন্তু সে নীতিমালা কোচিং বন্ধে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। যত দিন শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক বেতন কাঠামো করা না হচ্ছে, তত দিন কেবল নীতিমালা করে কোচিং বন্ধ করা যাবে না। আবার অনৈতিক কোচিং বাণিজ্য থেকে সরে আসতে শিক্ষকদের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। আর এ জন্য সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থাকেই ঢেলে সাজাতে হবে। সংস্কার না করলে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে এ ক্ষত দূর করা যাবে না।
-সম্পাদক
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক


