এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : ব্যাংক খাতে অনিয়মের কথা স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘এখানে অনেক দোষ-ত্রুটি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে যে মাত্রায় লুটপাট হয়েছে তাকে পুকুর চুরি নয়, সাগর চুরি বলা যায়।’
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে সম্পূরক বাজেটের ওপর স্বতন্ত্র সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজীর দেওয়া ছাঁটাই প্রস্তাবের জবাবে এ কথা বলেন মুহিত।
ডেসটিনি ও হলমার্ক কেলেঙ্কারির পাশাপাশি সাম্প্রতিক রিজার্ভ চুরির প্রসঙ্গে টেনে স্বতন্ত্র এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘ব্যাংক খাত থেকে টাকা চুরি হয়ে গেছে। সব ব্যাংকের একই অবস্থা। রিজার্ভের ৮০০ কোটি টাকা কর্মকর্তাদের যোগসাজশে চুরি হয়েছে। জড়িতদের এখনো কিছুই হয়নি। দেশ থেকে পৌনে তিন লাখ কোটি পাচার হয়েছে। এগুলোকে পুকুর চুরি না বলে সাগর চুরি বলা যায়।’
এ বক্তব্যের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ‘ফরাজী সাহেবের সাথে আমিও একমত। তবে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে এমন কিছু ঘটেনি যাতে করে পুরো প্রতিষ্ঠানকেই ধুয়ে-মুছে ফেলে দিতে হবে। এটা সত্যি কিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। বলতে চাই, পুকুর চুরি নয়, সাগর চুরি হয়েছে। আমরা বসে নেই।’
সুদের হার সুনির্দিষ্ট করার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে অর্থনীতির স্বাস্থ্যকে চাঙ্গা করা, সুদের হার নির্ধারণ করা নয়। সুদের হার নির্ধারণ করে ব্যবসায়ী, ঋণ প্রদানকারী ও বিনিয়োগকারীরা।’
এর আগে আলোচনায় চলতি অর্থবছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়েও কথা বলেন মুহিত।
জাতীয় পার্টির বাজেট দিয়েছেন বলে তার সম্পর্কে যে কথা উঠেছে, সেটির জবাবও দেন তিনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভূক্তি নিয়ে বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী।
মেডিটেশনে সেবার ওপর করারোপ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মেডিটেশনের নামে যেসব কর্মকাণ্ড চলছে সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে ঠকানো হচ্ছে। এখানে ভালো শিক্ষা -দিক্ষা হয় বলে আমার মনে হয় না।’
জিডিপি‘র প্রবৃদ্ধির প্রসঙ্গে মুহিত বলেন, ‘দাতাদের পূর্বাভাস সঠিক নয়। এবছর আমরা জিডিপির যে প্রাক্কলন করেছি তা অর্জিত হবে। আমাদের নিজস্ব গবেষণা আছে। আমাদের পরিসংখ্যান ব্যুরো অনেক দক্ষ। আমাদের তথ্য নিয়েই আন্তজার্তিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।’
গতকাল মঙ্গলবার অধিবেশনে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম ওমর, সেলিম উদ্দিন ও ফখরুল ইমাম মোট ১০ বার সংসদে বাজেট উপস্থাপন করায় অর্থমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান।
এ সময় জাতীয় পার্টির দুটি বাজেট দেওয়ায় অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তারা।
অবশ্য অর্থমন্ত্রী এর বিরোধিতা করে বলেন, ‘এখানে বলা হয়েছে, আমি দুইবার জাতীয় পার্টির বাজেট দিয়েছি। এটা সর্বৈব মিথ্যা। আমি যখন বাজেট দিয়েছি তখন জাতীয় পার্টির জন্ম হয়নি। আমি দিয়েছি এরশাদ সাহেবের বাজেট, যখন নির্দলীয় সরকার ছিল।
এমপিওর্ভূক্ত প্রসঙ্গে সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি নিয়ে কথা বলেছেন। তার দাবি, শিক্ষকরা অনশন করেন এমপিওভুক্তির জন্য, এমপিওভুক্তি কেন হয় না? আমি তাদের জিজ্ঞেস করতে চাই। এমপিওভূক্তির বিষয়ে আপনারা সব সময় সোচ্চার। চারজন শিক্ষক একজন ছাত্র নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান। এরকম প্রতিষ্ঠান নিয়ে কখন উচ্চ-বাচ্য করতে দেখি না।’
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তথ্য উপস্থাপন করে অর্থমন্ত্রী জানান, ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল মাত্র ৯ হাজার, এখন ২৮ হাজার হয়েছে।
পাঠ্যপুস্তক সম্পর্কে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে মুহিত বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তক সম্পর্কে আমার দুঃখ আছে। পাঠ্যবিষয় নিয়ে অনেকে অনেক
বক্তব্য রেখেছেন, আমি খুশি হতাম যদি তারা শিক্ষামন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে পেশ করতেন। আমি নিজেই এ বিষয়ে অনেক মন্তব্য রাখি এবং লিখিত মন্তব্য প্রদান করি। আমার মনে হয়, আমরা আমাদের ভবিষত প্রজন্মের শিক্ষার দিকে নজর কম দেই।’
স্পিকারকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘শিশুদের যে পাঠ্য বই আছে, তার বোঝা যে কত ভারি সেটা যদি আপনি সবগুলো এক সঙ্গে করেন এবং ঘাড়ে তোলার চেষ্টা করেন তাহলে বুঝবেন। এটা আমাদের ঠিক করা প্রয়োজন। এরমধ্যে কি সব জিনিস আছে সেগুলো একবার দেখা প্রয়োজন।’
বিভিন্ন জরাজীর্ণ বিদ্যালয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কতগুলো বিদ্যালয় আছে, কতগুলো জরাজীর্ণ, সেদিকে খেয়াল করি না। এগুলোর দিকে খেয়াল করা উচিত।’
অর্থমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে একজন সাংসদের প্রশ্নের জবাবে মুহিত বলেন, ‘একজন বিশিষ্ট নেতা আমার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন, তার প্রশ্ন করাটা স্বাভাবিক। কারণ, তার জন্মের আগে আমি একজন প্রসিদ্ধ রাজনীতিবিদ ছিলাম। আমার সময় আমি অন্যতম ছাত্রনেতা ছিলাম। এটা তার অবশ্য জানার সুযোগ হয় নাই, কেননা পড়াশুনা তাদের মধ্যে তেমন একটা আসে না।’
আমলাতন্ত্রের কারণে বাজেট বাস্তবায়ন হচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দোষ দেওয়া যায়, কিন্তু আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই এজন্য যে, আমরা যে বাজেট দিয়েছি তারা তাদের জীবনে এত বড় বাজেট দেখেন নাই। যা গত ৭ বছরে ৯১ হাজার কোটি থেকে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটিতে এসে দাঁড়িয়েছে। চ্যালেঞ্জটা অনেক বড়, সেটার সাথে যে তারা চলতে পারছেন এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই।’
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

