এমএনএ ডেস্ক রিপোর্ট : আজ ২৩ অক্টোবর কবি শামসুর রাহমানের ৮৮তম শুভ জন্মদিন। আজ রবিবার সকালে কবির সমাধিতে বাংলা একাডেমী, জাতীয় কবিতা পরিষদ, শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পুষ্পমাল্য অর্পণ করবে।

বাঙালীর প্রিয় এ কবির সৃষ্টি কর্মে শুধু স্বাধীনতাই নয়, সেই সাথে মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, প্রেম, দ্রোহ ও বিশ্বজনীনতাসহ সব কিছুই উঠে এসেছে, যা আজও আমাদের উজ্জীবিত করে। আর এ কারণেই তিনি বাঙালীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন এবং আমাদের চলার পথের পাথেয়।
কবির জন্মবার্ষিকী স্মরণে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচীর আয়োজন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বনানী কবরস্থানে কবির সমাধিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, আলোচনা সভা, গান ও কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান।
তার স্মরণে বিকেল ৪টায় বাংলা একাডেমী, জাতীয় কবিতা পরিষদ ও শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদ যৌথভাবে একাডেমীর রবীন্দ্র চত্বরে আলোচনা, নিবেদিত কবিতাপাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এতে সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমী ও শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদের সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আলোচনায় অংশ নেবেন সংস্কৃতিজন রামেন্দু মজুমদার, কবি রবিউল হুসাইন, কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা এবং অধ্যাপক রফিকউল্লাহ খান।
কবির জন্মদিনে চ্যানেল আই’তে রাজু আলীমের পরিচালনা ও রোকেয়া প্রাচীরের উপস্থাপনায় শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক
অনুষ্ঠান ‘শিল্প বিনোদন’ এর বিশেষ পর্ব প্রচারিত হবে বিকেল সাড়ে ৫টায়। এ অনুষ্ঠানে কবির সাহিত্য নিয়ে কথা বলছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এবং ভারতের কবি ও অনুবাদক শংকর সেন। প্রিয় কবির জন্মদিনে অভিব্যক্তি ব্যক্ত করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এবং কবি কামাল চৌধুরী। শামসুর রাহমান এর কবিতা থেকে আবৃত্তি করবেন আসাদুজ্জামান নূর, আল মনসুর ও ডালিয়া আহমেদ।
চ্যানেল আই’র আর্কাইভ থেকে অনুষ্ঠানে কবির স্বকণ্ঠের আবৃত্তি থাকবে শমী কায়সার এর সাথে। স্টুডিও’তে কবি শামসুর রাহমান’কে নিয়ে স্মৃতিচারণ করবেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সভাপতি গোলাম কুদ্দুস এবং জাতীয় কবিতা পরিষদ এর সভাপতি কবি মোহাম্মদ সামাদ।
স্বাধীনতার এ কবি দেশের ও দেশের মানুষের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা যে কোন অপশক্তি বা কোন অনাচারের বিরুদ্ধে নিজেকে একাত্ম করে নিতেন এবং তার জবাব দিতেন কবিতার ভাষায়। আশা, বেদনা, ভালোবাসা, দ্রোহ কোনো কিছুই তাই বাদ যায়নি তার কবিতা থেকে।
স্বাধীনতা নিয়ে তার জনপ্রিয় দুটি কবিতা প্রকাশ করা হলো।
তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?
তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,
সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর।
তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মত চিত্কার করতে করতে
তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস বস্তি উজাড় হলো। রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।
তুমি আসবে ব’লে, ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।
তুমি আসবে ব’লে, বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভূর বাস্তুভিটার
ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করলো একটা কুকুর।
তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিলো পিতামাতার লাশের উপর।
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে এক থুত্থুরে বুড়ো
উদাস দাওয়ায় ব’সে আছেন – তাঁর চোখের নিচে অপরাহ্ণের
দুর্বল আলোর ঝিলিক, বাতাসে নড়ছে চুল।
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
মোল্লাবাড়ির এক বিধবা দাঁড়িয়ে আছে
নড়বড়ে খুঁটি ধ’রে দগ্ধ ঘরের।
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে
বসে আছে পথের ধারে।
তোমার জন্যে,
সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,
কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,
মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,
গাজী গাজী ব’লে নৌকা চালায় উদ্দান ঝড়ে
রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস
এখন পোকার দখলে
আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুড়ে বেড়ানো
সেই তেজী তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হ’তে চলেছে —
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জলন্ত
ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে,
মতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক
এই বাংলায়
তোমাকেই আসতে হবে, হে স্বাধীনতা।

স্বাধীনতা তুমি
স্বাধীনতা তুমি
রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।
স্বাধীনতা তুমি
কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো
মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা-
স্বাধীনতা তুমি
শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা
স্বাধীনতা তুমি
পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।
স্বাধীনতা তুমি
ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।
স্বাধীনতা তুমি
রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার।
স্বাধীনতা তুমি
মজুর যুবার রোদে ঝলসিত দক্ষ বাহুর গ্রন্থিল পেশী।
স্বাধীনতা তুমি
অন্ধকারের খাঁ খাঁ সীমান্তে মুক্তিসেনার চোখের ঝিলিক।
স্বাধীনতা তুমি
বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর
শানিত কথার ঝলসানি-লাগা সতেজ ভাষণ।
স্বাধীনতা তুমি
চা-খানায় আর মাঠে-ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ।
স্বাধীনতা তুমি
কালবোশেখীর দিগন্তজোড়া মত্ত ঝাপটা।
স্বাধীনতা তুমি
শ্রাবণে অকূল মেঘনার বুক
স্বাধীনতা তুমি পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন।
স্বাধীনতা তুমি
উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন।
স্বাধীনতা তুমি
বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ।
স্বাধীনতা তুমি বন্ধুর হাতে তারার মতন জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার।
স্বাধীনতা তুমি
গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,
হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।
স্বাধীনতা তুমি
খোকার গায়ের রঙিন কোর্তা,
খুকীর অমন তুলতুলে গালে
রৌদ্রের খেলা।
স্বাধীনতা তুমি
বাগানের ঘর, কোকিলের গান,
বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,
যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

