Don't Miss
Home / আজকের সংবাদ / মারাত্মক হুমকির মুখে চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা

মারাত্মক হুমকির মুখে চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা

এমএনএ অর্থনীতি ডেস্ক : পরিবেশ দূষণের দায় মাথায় নিয়ে দেশের বিশাল সম্ভবনাময় চামড়া শিল্প আজ মারাত্মক হুমকির মুখে পতিত।

কিন্তু আলোর বিপরীতে অন্ধকারের বিষফোড়ার মত এ শিল্পের উপর জেকে বসেছে পরিবেশ দুষনের দায়। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দেখা যায় হাজারীবাগের চামড়া শিল্পগুলো থেকে প্রতিদিন বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে মিশছে ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার পরিবেশ দূষনকারী ঘন তরল বর্জ্য। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষতিকর ক্রোমিয়াম, সালফার, অ্যামোনিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ।

ছোট বড় সব মিলিয়ে হাজারীবাগে ট্যানারীর সংখ্যা মোট ১৫৪টি। প্রায় তিন হাজারের মত ক্ষুদ্র এবং অতি ক্ষুদ্র উদ্দোক্তা। কর্মসংস্থান প্রায় ৮ লাখ মানুষের। অভ্যন্তরীন এবং বৈশ্বিক নানা সংকটের মুখেও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত চামড়া শিল্প দেশের মোট আয়ে অবদান রেখে চলছে। বলা হয় এই শিল্পের মূল্য সংযোজন অনেক বেশি। সঠিক নীতি ও সহায়তা পেলে অন্য সব খাতকে পেছনে ফেলতে পারবে চামড়া শিল্প।

আজকের হাজারীবাগের চামড়া শিল্পের শুরুটা হয়েছিল নারায়ণগঞ্জে ১৯৪০ সালে। বিখ্যাত শিল্প উদোক্তা রনদা প্রসাদ সাহা প্রথম ট্যানারী স্থাপন করেন। ২০ বছর পর অর্থাৎ ১৯৬০ সালে রাজধানী ঢাকার হাজারীবাগে স্থানান্তরিত হয়ে আসে ট্যানারীগুলো। সময়ের বিবর্তনে হাজারীবাগের ট্যানারীগুলোই হয়ে ওঠে দেশের চামড়া শিল্পের মূল কেন্দ্র।

সারা দেশের ২২০ টি ট্যানারীর মধ্যে ১৫৪টির অবস্থান হাজারীবাগে। প্রতিবছর হাজারীবাগের ট্যানারীগুলোয় প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে প্রায় এক কোটি আশি লাখ বর্গ কিলোমিটার চামড়া। প্রক্রিয়াজাত চামড়ার প্রথম ধাপকে বলা হয় ওয়েট ব্লু লেদার। প্রথম দিকে এটিরই যোগান দাতা ছিল বাংলাদেশ। উদোক্তাদের ক্রাসট এবং ফিনিসড লেদারের প্রতি আকর্ষন তৈরি করতে ১৯৭৭ সালে ওয়েট ব্লু লেদারের উপর রপ্তানি কর আরোপ করে সরকার। এতে ফল মেলে হাতে নাতেই। চামড়া প্রক্রিয়াজাতে দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। ১৯৮০ ও ৮১ সালের চামড়া রপ্তানীতে যে আয় তার শতভাগই ওয়েট ব্লু এবং সেমি প্রসেসড লেদার থেকে। এরপর আরও একধাপ এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। এক্ষেত্রেও সদিচ্ছাটা সরকারেরই। কারণ ১৯৯০ সালে সরকার ওয়েট ব্লু লেদার রপ্তানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে। এরপর আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে চামড়া শিল্পে।

চামড়া শিল্পে মনযোগ দেয় বড় বড় শিল্প উদ্দোক্তারা। চামড়া শিল্পের জৌলুস বেড়ে যায় আল্প কিছুকাল পরেই। নতুন নতুন চামড়া প্রক্রিয়াজাত করনের আধুনিক মেশিন যুক্ত হতে থাকে এসব চামড়া কারখানায়। বেসরকারী খাতের উদ্দোক্তারা নতুন স্বপ্নে বিভোর হতে থাকেন। প্রতি বছর পৃথিবীর নানা দেশে রপ্তানীর অর্ডার আসতে শুরু করে। বাড়তে থাকে চামড়া ও চামড়াজাত পন্যের রপ্তানি। এপর্যায়ে একটা প্রশ্ন আসতেই পারে—বিশ্বে চামড়া শিল্পের যে বিশাল বাজার , তার কতটুকু যোগান দিতে পারছি আমরা। আর এ বাজারে টিকে থাকতে সরকারের কতটুকু সদিচ্ছা।

হাজারীবাগ থেকে ট্যানারী সরাতে সরকার বহু বছর ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এজন্য সরকার একটি প্রকল্পও হাতে নেয় ২০০৩ সালে। এ প্রকল্পের আওতায় সাভারের হেমায়েতপুরের হরিনচড়া গ্রামে ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা ব্যায়ে ১৯৯ একর জমিতে আধুনিক চামড়া শিল্প নগরী গড়ে তোলার কাজ হাতে নেয়। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।

কিন্তু বিসিকের অদক্ষতার কারনে অবকাঠামো নির্মাণ, কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার সহ প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই তৈরী করতে পারে নি। আর এজন্য ট্যানারী মালিকেরাও এক দশকেরও বেশী সময় ধরে সাভারে স্থানান্তর করতে পারেনি কারখানাগুলো।

বিসিকের দেয়া তথ্যমতে সিইটিপি চালু করে বর্জ্য পরিশোধন শুরু করতে পারবে। কিন্তু ১৫৪টি ট্যানারীর মধ্যে ৪৩টি সাভারে ওয়েট ব্লু চামড়া উৎপাদন শুরু করেছে। তারা সেখানে কোন ধরনের জুতা, ব্যাগ বা অন্যান্য পন্য উৎপাদন উপযোগী প্রস্তুত বা ফিনিসড চামড়া উৎপাদন শুরু করতে পারেনি।

হাজারীবাগ থেকে ট্যানারীগুলো বন্ধের হাইকোর্টের নির্দেশ আসে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইন বিদ সমিতির (বেলা) এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে, বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মোঃ সেলিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ হাজারীবাগে থাকা ট্যানারীগুলোকে অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেন। এ নির্দেশের স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে যান বিএফএলএল এফ ই এর চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ। তার আবেদনটিও খারিজ করে আপিল বিভাগ।

সাভারে স্থানান্তর হওয়া ৪৩টি কারখানার সবগুলোই গ্যাস সংযোগ পায়নি। এদিকে হাইকোর্টের নির্দেশে বাস্তবায়নের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে বলা হয়েছে। সর্বশেষ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন সুপ্রীমকোর্টের তিন সদস্যের আপিল বিভাগও ট্যানারী মালিকদের আবেদনটি খারিজ করেছেন।

আবেদনে ট্যানারী মালিকরা জুন পর্যন্ত সময় চেয়েছিলেন। আপিল বিভাগের আদেশ শোনার পর পরিবেশ অধিদপ্তর হাজারীবাগের ট্যানারীগুলোর গ্যাস বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবে। সুপ্রীম কোর্টের রায়ের পর আর কোন আইনি সুযোগ না থাকায় ট্যানারী মালিকরাও বাধ্য হয়েই সর্বোচ্চ আদালতের রায় মেনে নিয়েছেন।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানীর সমতা লেদারের শেয়ার ডিপার্টমেন্টের প্রধান কর্মকর্তা ট্যানারী বন্ধের প্রভাব পরবে কিনা জানতে চাইলে বলেন, “আশা করছি তেমন প্রভাব পরবে না। যেহেতু বিষয়টা অনেকদিন থেকেই প্রক্রিয়াধীন, তাই আমরাও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি। আমাদের প্রডাক্টের উপর যাতে এর বিরুপ প্রভাব না পরে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি আমরা”।

এদিকে শেয়ার বাজারের চামড়া শিল্পের আরেক কোম্পানী ফরচুন সুজ এর প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোঃ মহিউদ্দিন মোল্লা বলেন, “যেহেতু আমাদের কোম্পানী গাজীপুরে তাই তেমন কোন প্রভাব আমাদের পরবে না। তাছাড়াও এই বিষয়টা নিয়ে অনেক আগে থেকেই আমরা সচেতন। সাম্প্রতিককালে চামড়া শিল্পের উপর যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তার সবটুকু কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছি আমরা”।

বাংলাদেশ ট্যানারস এসোসিয়েশন (বিটিএ) এবং বিএফএলএলএফই এর তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর দেশে ২৩ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদিত হয়। এসব চামড়ার পঞ্চাশ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানী করা হয়। বাংলাদেশের চামড়া ইতালী, দক্ষিন কোরিয়া, জাপান, চীন, হংকং এবং তাইওয়ানে বেশী রপ্তানি করা হয়। চামড়া শিল্পের উদোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী এ শিল্পের বিশ্ব বাজারের আয়তন ২২০ বিলিয়ন ডলার। আর এর মাত্র দশমিক পাঁচ শতাংশের যোগান দেয় বাংলাদেশ। তাই একথা বলাই যায় চামড়া শিল্পের বিশাল বাজারের বিশাল সম্ভাবনা আবারও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ল।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিপি) তথ্য অনুযায়ী গেল ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ক্র্যাসট ও ফিনিসড চামড়া রপ্তানি হয়েছে ৩ কোটি ৯২ লাখ ৯০ হাজার ২৩৩ টাকা। চামড়াজাতপন্য (পাদুকা ব্যাতীত) ১ কোটি ৮৬ লাখ ৬০ হাজার ১১০ টাকা, পাদুকা ৪ কোটি ২৭ লাখ ৫৪ হাজার ৬২৬ টাকা আয় করেছে বাংলাদেশ।

সরকার বলছে সাভারের সিইটিপির মাধ্যমে নিশ্চিত হবে চামড়া শিল্পের পরিবেশ দূষণ। সব সংকট কাটিয়ে সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগিয়ে আবারও মাথা উচু করে দাঁড়াবে চামড়া শিল্প এ প্রত্যাশা সবার।

x

Check Also

টানা ৫ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো যাবে না, সতর্ক করল বিআরটিএ

এমএনএ প্রতিবেদক একটানা দীর্ঘ সময় গণপরিবহণ চালানোর ফলে চালকদের ক্লান্তি, ঝিমুনি ও ঘুমের প্রবণতা বাড়ছে, ...