এমএনএ রিপোর্ট : প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘এ ঝড় উঠার পরেও সুপ্রিম কোর্ট যথেষ্ট ধৈর্য ধরেছে। বিচার বিভাগ যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে। ঝড় তো আপনারাই উঠাচ্ছেন। আমরা কি ঝড় উঠার মতো কিছু বলেছি?\
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ও রায়ের পর্যালোচনা নিয়ে অব্যাহত সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আজ রবিবার মাসদার হোসেন মামলার শুনানিকালে প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন।
মাসদার হোসেন মামলার রায়ে নিম্ন আদালতে বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধিমালার গেজেট জারি বিষয়ে আজ শুনানি ছিল। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল আবারো সময় চেয়ে আদালতে আবেদন জানান।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ বিষয়টির ওপর পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ৮ অক্টোবর তারিখ রেখেছেন।
সবশেষ গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি চূড়ান্ত করতে আপিল বিভাগ ২০ আগস্ট পর্যন্ত সময় দিয়েছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় আজ রবিবার বিষয়টি আপিল বিভাগে ওঠে।
শুরুতেই অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সময়ের আবেদন দাখিল করেন। এ সময় প্রধান বিচারপতি মাহবুবে আলমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘গত ধার্য তারিখে আমরা গেজেট জারির বিষয়ে আলোচনায় বসার কথা বলেছিলাম। এ বিষয়ে কী করেছেন? কার সঙ্গে কে কে থাকবে?’
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘ল’ মিনিস্টার’। এ সময় বিচারপতি ওয়াহাব মিঞা বলেন, ‘অল দ্য জাজেস অব অ্যাপিলেট ডিভিশন। এতই আমরা ইয়ে হয়ে গেলাম, আলোচনা পর্যন্ত করলেন না।’
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে আমার কী করার আছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সবকিছু মিলিয়ে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। একটি ঝড় উঠেছে।
এসময় প্রধান বিচারপতি অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেন, ‘মিডিয়াতে অনেক কথা বলেন। কোর্টে এসে অন্য কথা বলেন। আপনাকে নয়। আপনাদের বলছি। আপনিই বলেন। কবে কী হবে। আপনারা ঝড় তুলছেন। আমরা কোনো মন্তব্য করছি?’
এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘না আপনারা করেননি।’
অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি বলেন, কবে রাখব (পরবর্তী তারিখ)। সবাই বসবেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বন্ধের এক সপ্তাহ পর।
প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনার মতই আমরা রাখলাম। ৮ অক্টোবর তারিখ রাখলাম।
এ পর্যায়ে অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়ার বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য দাঁড়ান মাসদার হোসেন মামলার অন্যতম কৌঁসুলি ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমার আবেদনটি শুনানি করেন।’
তার জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা বিচার বিভাগ ধৈর্য ধরছি। যথেষ্ট ধৈর্য ধরছি। আজকে একজন কলামিস্টের লেখা পড়েছি। সেখানে ধৈর্যের কথা বলা আছে। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট প্রধানমন্ত্রী কে ইয়ে (অযোগ্য) করেছেন। সেখানে কিছুই হয়নি। আমাদের আরও পরিপক্কতা দরকার।’
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ছয় সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে আজ রবিবার এ মামলার শুনানি হয়। পরে আদালত বিষয়টির ওপর পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ৮ অক্টোবর দিন ধার্য করেন।
গত দেড় বছরে বিধিমালার গেজেট প্রকাশ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এই নিয়ে ২৫ বার সময় নিল রাষ্ট্রপক্ষ। এর আগে গত ২৭ জুলাই অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধিমালা-সংক্রান্ত একটি খসড়া সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে হস্তান্তর করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
ওই খসড়া নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে গত ১৬ ও ২০ জুলাই দুটি বৈঠকও করেন তিনি। কিন্তু খসড়া পর্যালোচনার পর ৩০ জুলাই তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ।
খসড়ার কিছু শব্দ ও বিধি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আদালত যেসব সুপারিশ করেছিলেন, খসড়ায় এসেছে তার উল্টো।’ পরে খসড়া নিয়ে মতপার্থক্য নিরসনে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ থেকে বৈঠকে বসারও প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপর আইনমন্ত্রী প্রধান বিচারপতির সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলাপ করে ৩ আগস্ট বিকেলে বৈঠকের দিন চূড়ান্ত করেন। কিন্তু আইনমন্ত্রী অসুস্থ থাকায় বৈঠকটি আর হয়নি।
উল্লেখ্য, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান ও ছুটি মঞ্জুর) ও শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্র্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকিবে এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্র্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে।’
তবে এরই মধ্যে গত ১ আগস্ট প্রকাশিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের বেঞ্চের তিন বিচারপতি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বিষয়ে ভিন্নমত দিয়েছেন। রায়ে পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতিসহ বেঞ্চের তিনজন বিচারপতি বলেন, অধস্তন আদালতে নিযুক্ত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধানে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র্রপতির ক্ষমতা সংবিধান পরিপন্থী।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
