ইন্দোনেশিয়ায় সুনামিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৫৯
Posted by: News Desk
December 25, 2018
এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ সুনামিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫৯ জন। আহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪৬৭ এবং নিখোঁজ রয়েছে ১১৯ জন। দেশটির সুন্দা প্রণালীর পার্শ্ববর্তী সৈকতে গত শনিবার রাতে ভয়াবহ এই সুনামি আঘাত হানে।
কোনো প্রকার সতর্কবার্তা ছাড়াই সুনামি উপকূলে আঘাত হানে। এতে শত শত ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা অতিসত্ত্বরই ওই এলাকায় আরেকটি সুনামির আশঙ্কা করছে। খবর বিবিসির।
দেশটির সরকারি সূত্রগুলো ধারণা করছে, ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্লুৎপাতের কারণে সমুদ্রের তলদেশে ভূমিধ্বস থেকে এই সুনামির সৃষ্টি হতে পারে। সুন্দা প্রণালী জাভা ও সুমাত্রা আলাদা করেছে। এই প্রণালীর দ্বারা ভারত মহাসাগরের সঙ্গে জাভা সাগর যুক্ত হয়েছে।
জাভা দ্বীপের ওই অঞ্চলে বিদেশি অনেক পর্যটক ভ্রমণ করেন। জাভার পেরডেগল্যান্ড জেলা পর্যটনের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয়। ওই জেলায়ই ন্যাশনাল পার্ক ও সমুদ্র সৈকতে প্রচুর সংখ্যক পর্যটক ভ্রমণ করেন। এই জেলায়ই সর্বোচ্চ ১৬৪ জন মারা গেছেন বলে বিবিসি জানিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে ইন্দোনেশিয়ার জনপ্রিয় রকব্যান্ড ‘সেভেন্টিন’ একটি রিসোর্টে পারফর্ম করছিল। ওই ব্যান্ডের সদস্যরা দূর থেকে পানি ধেয়ে আসার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে। পরে জলোচ্ছাসে ওই স্টেজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইনস্টাগ্রামে কান্নাজড়িত এক ভিডিওতে গায়ক রিয়েফিয়ান রাজার্সিয়া বলেছেন, ব্যান্ডের ব্যাসিস্ট ও রোড ম্যানেজার মারা গেছেন। দলের অন্য তিন সদস্য ও তার স্ত্রী নিখোঁজ রয়েছেন।
সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, ভয়াবহ এই সুনামিতে ৫৫৮টি বাড়ি ও ৯টি হোটেল, ৬০টি রেস্তারা, ৩৫০টি বোট ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
আনাক ক্রাকাতাউ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ফের সুনামি সৃষ্টি করতে পারে আশঙ্কায় এর নিকটবর্তী উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করে সৈকত থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে।
স্থানীয় সময় গত শনিবার সন্ধ্যায় সুনামির দুটি বিশাল ঢেউ সুমাত্রা ও জাভা দ্বীপের উপকূলীয় শহরগুলো গুঁড়িয়ে দেয়। এতে ধ্বংস হয়েছে ৭শ’র বেশি বাড়ি, ছোট ছোট দোকান, ভিলা এবং অনেক হোটেলও।
ইন্দোনেশিয়ান জিওফিজিক্যাল এজেন্সির (বিএমকেজি) ধারণা, এই সুনামির সৃষ্টি হয়েছে ক্রাকাতাউ আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সাগরতলে ভূমিধসের কারণে। এর সঙ্গে পূর্ণিমার প্রভাব যুক্ত হওয়ায় বিপুল শক্তি নিয়ে সৈকতে আছড়ে পড়েছে সুনামির ঢেউ।
গত রবিবার আনাক ক্রাকাতাউয়ে ফের অগ্ন্যুৎপাত হয়ে ছাই ও ধোঁয়া উদগীরিত হয়েছে।
একটি ভাড়া করা বিমান থেকে নেওয়া ভিডিওতে সুমাত্রা ও জাভার মধ্যবর্তী সুন্দা প্রণালীর এই আগ্নেয়গিরিটির অগ্ন্যুৎপাতের তীব্রতা ধরা পড়েছে।
ধ্বংসস্তুপে রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে থাকায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে, তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে হাতহতদের খোঁজে তল্লাশি অভিযানে সহায়তা করতে ভারী ক্রেন পাঠানো হচ্ছে।
সুনামির ঢেউয়ে পশ্চিম জাভার তানজুং লেসুং বিচ রিজোর্টসহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রের কয়েকশ ভবন ধ্বংস হয়েছে, রাস্তায় ও প্রাঙ্গণে থাকা গাড়িগুলো ভেসে গেছে, গাছ উপড়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসা ফুটেজে দেখা গেছে, একটি রিজোর্টে প্যান্ডেল ঘেরা মঞ্চে ইন্দোনেশিয়ার জনপ্রিয় রক ব্যান্ড সেভেনটিন কনসার্ট চলার সময় বিশাল একটি ঢেউ এসে সবকিছু ভাসিয়ে নিচ্ছে।
ঢেউয়ের ধাক্কায় মঞ্চ ভেঙে ব্যান্ডের সদস্যদের ভেসে যেতেও দেখা গেছে।
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার মুখপাত্র সুতোপো পুরও নুগরোহো এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, আনাক ক্রাকাতাউ থেকে অগ্ন্যুৎপাত অব্যাহত থাকায় আরেকটি সুনামি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
১৯২৭ সালে ক্রাকাতোয়ার অগ্ন্যুৎপাতের ফলে আনাক ক্রাকাতাউ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই আগ্নেয়গিরিটির সক্রিয়তা বাড়তে থাকায় আগ্নেয়গিরিটির জ্বালামুখের আশপাশের এলাকাগুলো এড়িয়ে চলার জন্য লোকজনকে বলা হয়েছিল।
গত সোমবার সুতোপো ধারাবাহিক কয়েকটি টুইটে এই সুনামির জন্য আগাম কোনো সতর্কতা কেন দেওয়া হয়নি তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইন্দোনেশিয়ার আগাম সতর্কতা জারির পদ্ধতিটি ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণের জন্য স্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু সাগরতলের ভূমিধস ও অগ্ন্যুৎপাতের বিষয়টি এর পর্যবেক্ষণের আওতার বাইরে যদিও এ দুটির কারণেও প্রাণঘাতী সুনামি সৃষ্টি হতে পারে।
বিশ্বের মোট আগ্নেয়গিরির ১৩ শতাংশ ইন্দোনেশিয়াতে হওয়ায় এ ধরনের পদ্ধতি গড়ে তোলা দেশটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
দুর্যোগের রাতে সুনামির আগাম কোনো সতর্কতা পদ্ধতি ছিল না বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি। তহবিলের অভাব, বয়াগুলো ভেঙে ফেলা ও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ২০১২ সাল থেকে কার্যকরী কোনো সুনামি সতর্কতা জারির ব্যবস্থা নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ জেস ফিনিক্সকে উদ্ধৃত করে বিবিসি লিখেছে, আগ্নেয়গিরি থেকে যখন অগ্ন্যুৎপাত হয়, ফুটন্ত লাভার কারণে ভূগর্ভের তুলনামূলকভাবে শীতল শীলাস্তর ভেঙে ভূমিধসের সৃষ্টি হতে পারে। আর ক্রাকাতাউয়ের একটি অংশ যেহেতু সাগরে নিমজ্জিত, সেখানে ভূমিধসের ফলে সুনামি সৃষ্টি হতে পারে।
আগ্নেয়দ্বীপ ক্রাকাতোয়ায় ১৮৮৩ সালে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ওই সময়ও ১৩৫ ফুট উঁচু ঢেউ নিয়ে সৈকতে আঘাত হানে সুনামি, প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সে সময় সাগরে ভেসে যায়।
দীর্ঘদিন সুপ্ত থাকার পর সাম্প্রতিক সময়ে ক্রাকাতোয়া (ইন্দোনেশিয়ায় ক্রাকাতাউ) আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। গত শুক্রবার ওই আগ্নেয়গিরি থেকে প্রায় সোয়া দুই মিনিট উদগীরণ হয়। এর ফলে পর্বতের ১৩০০ ফুট উঁচু পর্যন্ত ছাইয়ের মেঘ ছড়িয়ে পড়ে।
ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে ইন্দোনেশিয়ায় প্রায়ই ভূমিকম্প হয়। বিশ্বের সক্রিয় আগ্নেয়গিরিগুলোর অর্ধেকের বেশি রয়েছে যে এলাকায়, প্রশান্ত মহাসাগরের সেই ‘আগ্নেয় মেখলার’ মধ্যেই ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান।
এর আগে সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে ভূমিকম্প ও সুনামিতে ইন্দোনেশিয়ার পালু শহরের বালারোয়া ও পেতোবো এলাকায় অন্তত দুই হাজার মানুষের মৃত্য হয়।
আর ২০০৪ সালে সুমাত্রা দ্বীপে শক্তিশালী ভূমিকম্প ও সুনামিতে ভারত মহাসাগরের উপকূলজুড়ে ১৪টি দেশের দুই লাখ ২৬ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
এর আগেও দেশটিতে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট সুনামিতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় সুলাওয়েসি দ্বীপ। এতে নিহত হয়েছিলেন প্রায় ২ হাজার মানুষ।
ইন্দোনেশিয়ায় সংখ্যা মৃতের বেড়ে সুনামিতে ৪৫৯ 2018-12-25