গতকাল ভূমিকম্প-আতঙ্ক গ্রাস করেছিল ঢাকাসহ সারা দেশ। ভূমিকম্পে পুরান ঢাকার একটি ভবন সামান্য হেলে পড়া ছাড়া বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বেশ কিছু। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো ভূমিকম্প প্রবণ হওয়ায় মারাত্মক ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। তাই ভবিস্যতে বড় ধরণের ভূমিকম্পে জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি যথাসম্ভব এড়াতে সর্বাগ্রে জরুরি জন সচেতনতা ও সক্ষমতা তৈরি।
ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী ও লালমনিরহাটে আতঙ্কে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২৯ জনকে এবং সিলেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৩২ জনকে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে। গুরুতর তিনজনকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা সবাই ভবনের বিভিন্ন তলা থেকে লাফিয়ে পড়েছিল। আবার অনেকে ঘুম থেকে উঠে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়েও আহত হয়েছে। অন্যদিকে ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলে পাঁচজন নিহত ও ৫০ জন আহত হয়েছে। ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের কারণে সেখানে অনেক ঘরবাড়িও ভেঙেছে।
বাংলাদেশে এত বেশি হতাহতের কারণ মূলত আতঙ্ক ও সচেতনতার অভাব। অতীতেও এ ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সাধারণত ভূমিকম্পের স্থায়িত্ব হয় কয়েক সেকেন্ড। এই সময়ে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামা সম্ভব নয়। তাই ঝাঁকুনির সময় না দৌড়ে শক্ত কিছুর পাশে শুয়ে পড়তে বলা হয়। আফটারশক বা পরবর্তী ভূকম্পন সাধারণত কয়েক মিনিট কিংবা তারও পরে হয়। এই সময়ে নেমে খোলা জায়গায় চলে যেতে বলা হয়। তা না করে আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করার ফল কী হয়, তা তো আমরা দেখতে পেলাম। এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প হয়েছিল ১৮৯৭ সালে ভারতের আসামে এবং তাতে দেড় হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ওপরে থাকা সেই ভূমিকম্পে ঢাকায়ও অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, তেমন বড় ভূমিকম্পের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। নেপালের ভূমিকম্পের পর থেকে সেই আশঙ্কা আরো জোরদার হয়েছে। তেমন কোনো ভূমিকম্প হলে ঢাকার অবস্থা কী হবে, তা অনেকে কল্পনাও করতে চান না। এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। অধিকাংশ ভবন ভূমিকম্প-প্রতিরোধী নয়। নরম, অনুপযুক্ত মাটিতে প্রয়োজনীয় ভিত ছাড়াই নির্মিত হচ্ছে বহুতল ভবন। উদ্ধার তত্পরতা চালানোর মতো যন্ত্রপাতি নেই বললেই চলে। অধিকাংশ এলাকার সরু গলিতে উদ্ধারকারী যন্ত্রপাতি পৌঁছানোও যাবে না। যেভাবে সারা শহরে নড়বড়ে বিদ্যুত ও গ্যাসের সংযোগ রয়েছে, তাতে ভবনধসের পাশাপাশি দেখা দেবে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড। হতাহতদের উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এসব কারণে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের এক জরিপ অনুযায়ী ঢাকাকে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এখানকার ৬০ শতাংশের বেশি ঘরবাড়ি ধসে পড়বে। ৮ মাত্রার হলে তো কথাই নেই। দুর্যোগ কখনো কাউকে বলে-কয়ে আসে না। তাই যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সম্ভাব্য সব উপায়ে প্রস্তুত থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। সর্বোপরি জনসচেতনতা সৃষ্টি এ ক্ষেত্রে খুবই জরুরি। তা না হলে ছোটখাটো প্রতিটি ভূমিকম্পেই এ ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটতে থাকবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
-সম্পাদক
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক


