বিশেষ প্রতিনিধি
বিদেশ থেকে চাল আমদানির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুম শেষে আমন ধানের দামে ব্যাপক পতন ঘটেছে। গত বছরের তুলনায় অনেক কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। এরই মধ্যে সামনে বোরো মৌসুম—সপ্তাহখানেকের মধ্যে হাওরাঞ্চলে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে, আর মাসখানেকের মধ্যে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও বোরো ধান ওঠা শুরু হবে। তবে আমনের দরপতনের প্রভাব বোরোতেও পড়বে—এমন আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন কৃষকরা।
কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিদেশ থেকে চাল আমদানি অব্যাহত থাকায় দেশীয় ধানের দাম কমে গেছে। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান থেকে আমদানি করা চালের প্রতি কেজির খরচ পড়ছে ৪৪–৪৬ টাকার মধ্যে। ফলে ব্যবসায়ীরা আমদানির দিকে ঝুঁকছেন, আর বাজারে বিদেশি চালের সরবরাহ বাড়ায় দেশীয় ধানের চাহিদা কমে যাচ্ছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ৭ লাখ ২৪ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে, যা আগের পুরো অর্থবছরের (৬ লাখ ১ হাজার টন) চেয়েও বেশি। একই সময়ে সরকারি পর্যায়ে আমদানি হয়েছে আরও ৩ লাখ ৯৯ হাজার টন। সব মিলিয়ে মোট আমদানি দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ২৪ হাজার টন।
উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধানের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মৌসুমের শুরুতে কিছুটা ভালো দাম মিললেও বর্তমানে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না কৃষকরা।
নওগাঁ জেলায় বর্তমানে প্রতি মণ স্বর্ণা-৫ ধান বিক্রি হচ্ছে ১,১০০–১,১৫০ টাকায়, জিরাশাইল ১,৪০০–১,৪৫০ টাকা এবং সম্পা কাটারি ১,৮০০–১,৯৫০ টাকায়। অথচ গত বছর স্বর্ণা ধানই বিক্রি হয়েছিল প্রায় ১,৫০০ টাকায়, আর জিরাশাইল ও কাটারি ১,৮০০–২,০০০ টাকার বেশি দামে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে ক্রেতা কমে গেছে। হাটে পাইকারের উপস্থিতিও আশঙ্কাজনকভাবে কম।“ধান বেচবো কার কাছে?”
নওগাঁর বদলগাছীর কৃষক হেলাল উদ্দিন বলেন, “এখন ধান কেনার লোক নেই। এই দামে উৎপাদন খরচও উঠছে না।”
মান্দা উপজেলার এক কৃষক বুলু মিয়া জানান, “হাটে পাইকারই নাই, ধান বেচবো কার কাছে? লোকসান দিয়ে বিক্রি করছি।”
আরেক কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, “সার, বীজ, কীটনাশক—সব কিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু ধানের দাম বাড়েনি।”
বিশ্লেষকদের মতে, আগের এলসি (এলসি) অনুযায়ী আমদানি করা চাল এখনও দেশে প্রবেশ করছে, যা বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি করেছে। বেনাপোল, হিলি ও সোনামসজিদ বন্দর দিয়ে নিয়মিত চাল আসছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, কম দামে আমদানি করা চাল বাজারে থাকায় দেশীয় ধানের দাম পড়ে গেছে। এতে শুধু কৃষক নয়, ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ধানের দাম কমে যাওয়ায় পাইকারি ক্রেতার সংখ্যা কমে গেছে। চালকলগুলোতেও ধান কেনা কমেছে। ফলে বাজারে বেচাকেনা স্থবির হয়ে পড়েছে।
একজন ব্যবসায়ী জানান, আগে যেখানে প্রতিদিন ১০০–১২০ ট্রাক ধান বিভিন্ন অঞ্চলে যেত, এখন তা নেমে এসেছে ২০–৩০ ট্রাকে।
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, অতিরিক্ত আমদানি কৃষকদের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে বর্তমানে নতুন করে চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। আগের এলসির চালান শেষ হলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে, বোরো মৌসুমে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকার প্রায় ১৮ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়েছে। মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত এই সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টন আমন ধান উৎপাদিত হয়েছে। অন্যদিকে, বোরো মৌসুমে ৫০ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ টন।
হাওরাঞ্চলে আগামী সপ্তাহ থেকেই ধান কাটা শুরু হবে। সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে এ বছর প্রায় ১৪ লাখ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

