বিশেষ প্রতিবেদন
দেশে জ্বালানি তেলের সংকট ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে সারাদেশে প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং দিতে হচ্ছে, যা জনজীবনে মারাত্মক ভোগান্তি সৃষ্টি করছে।
দেশে জ্বালানি সংকট এখন শুধু বিদ্যুৎ নয়—পরিবহন, মৎস্য, কৃষি এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও গভীর সংকটে রূপ নিতে পারে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, চাহিদা অনুযায়ী ফার্নেস অয়েল সরবরাহ না পাওয়ায় উৎপাদন কমে গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সীমিত আকারে তেল সরবরাহ করছে, যাতে মজুত দীর্ঘদিন ধরে রাখা যায়।
চট্টগ্রামে লোডশেডিং পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়েছে বলে জানা গেছে। অবসরপ্রাপ্ত সচিব জাফর আলম সামাজিক মাধ্যমে বর্তমান অবস্থাকে “লাইফ সাপোর্টে থাকা” বিদ্যুতের সঙ্গে তুলনা করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ: দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্ল্যাটবাসীদের চরম ভোগান্তি; জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত তেল নেই; ও শিশু ও বয়স্কদের কষ্ট সবচেয়ে বেশি।
শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামই নয়, সারাদেশেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সিলেট, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। কোথাও কোথাও দিনে ৮–১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী: ১৫ এপ্রিল পিক আওয়ারে চাহিদা ছিল ১৫,৩৯৮ মেগাওয়াট; উৎপাদন হয়েছে ১৩,৮৪৯ মেগাওয়াট; ও ঘাটতি ছিল প্রায় ১,৪৮২ মেগাওয়াট।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে সংকটের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে- আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে (হরমুজ সংকট) মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে দেশীয় উৎপাদন বন্ধ থাকায় পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিপিসির রেশনিং নীতির কারণে মজুত ধরে রাখতে সীমিত তেল সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়াও আইপিপি (বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র) সমস্যা, প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা বকেয়া থাকায় নিজেরা তেল আমদানিতে অনাগ্রহী ও বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন কমে গেছে।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী: ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৩০টি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না; কিছু কেন্দ্র পিক আওয়ারেও বন্ধ রাখতে হচ্ছে; ও জ্বালানি সংকটে নৌযান ও জেলেদের দুর্ভোগ।
সিরাজগঞ্জসহ নদী তীরবর্তী অঞ্চলে ডিজেল সংকটের কারণে: ইঞ্জিনচালিত নৌকা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; জেলেরা মাছ ধরতে পারছে না ও নৌভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
একজন জেলে জানান, “ডিজেল না থাকায় ১৫ দিন ধরে বসে আছি। এভাবে চললে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে যাবে।”
এতে সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব পড়বে, কারণ নৌযান চলাচল কমে গেছে এবং কৃষি ও পরিবহন খাতেও চাপ পড়ছে। এতে বাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা। তীব্র গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। েএরমধ্যে রয়েছে, ‘ফুয়েল কার্ড’ চালু; অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে অভিযান; বাজার মনিটরিং জোরদার; ও কৃষি ও নৌচলাচলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত নির্ধারিত লোডশেডিং চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা না আসা পর্যন্ত এই সংকট পুরোপুরি কাটার সম্ভাবনা কম। তবে দ্রুত জ্বালানি আমদানি ও বকেয়া পরিশোধ করা গেলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

