অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
দেশে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষি খাতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা ব্যয় বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে, অন্যদিকে বাজারে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
সরকার শনিবার প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন, ব্যবহার হয় কৃষি খাতে। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রম এখনো ডিজেলনির্ভর। এছাড়া জমি প্রস্তুত, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনেও ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
হিসাব অনুযায়ী, আগের দামে কৃষকের বছরে ডিজেল খাতে ব্যয় ছিল প্রায় ১০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। নতুন দামে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ১২ হাজার ৬ কোটি টাকা, অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কৃষি অর্থনীতিতে দ্বিমুখী চাপ তৈরি করবে। উৎপাদন খরচ বাড়ায় কৃষকের লাভ কমে যাবে, আর বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে।
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, “স্বাভাবিকভাবে তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব সব খাতে পড়ে। এতে কৃষকের খরচ বড় আকারে বেড়ে গেল। মাঠে থাকা বোরো ধান ঘরে তোলা, মাড়াই ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে চালের বাজারে।”
বর্তমানে মাঠে থাকা বোরো ধানের মৌসুম শেষ পর্যায়ে থাকলেও অনেক এলাকায় এখনো সেচের প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি ধান কাটার যন্ত্র, রিপার, কম্বাইন হারভেস্টার ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
নওগাঁর সাপাহার উপজেলার কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, “ডিজেল সংকটের কারণে আগে থেকেই সেচে বেশি খরচ হচ্ছিল। এখন সরকার দাম বাড়ানোর পর প্রতি বিঘায় আরও বেশি খরচ হবে। গত বছর যেখানে এক বিঘায় ১৬ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছিল, এবার তা ২০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।”
বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার কৃষক হালিম মিয়া বলেন, “আগে ঘণ্টাপ্রতি সেচ খরচ ছিল ১২০ টাকা, এখন ২০০ টাকা। ডিজেলের দাম বাড়ায় ধান কাটা-মাড়াইয়ের খরচও বাড়বে। এতে লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে যাবে।”
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প রয়েছে। এছাড়া প্রায় ১৯ লাখ কৃষিযন্ত্রের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই ডিজেলচালিত।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, “আমাদের কৃষি এখনো ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকের বাড়তি খরচ সমন্বয়ে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়া জরুরি।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষক যদি ফসলের ন্যায্যমূল্য না পান, তাহলে আগামী মৌসুমে চাষাবাদে অনীহা তৈরি হতে পারে। এতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

