Don't Miss
Home / আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ / শাহজালালের মাজারে স্বচ্ছতার উদ্যোগের পরই প্রত্যাহার: আলোচনার কেন্দ্রে সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলম

শাহজালালের মাজারে স্বচ্ছতার উদ্যোগের পরই প্রত্যাহার: আলোচনার কেন্দ্রে সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলম

নিজস্ব প্রতিবেদক

সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলমকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে। রোববার (২১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব জেতী প্রু স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ জারি করা হয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে বদলির বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে প্রশাসনিক মহল, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সিলেটের সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।

এই প্রত্যাহারের সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকেই। কারণ, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান—হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন ডিসি সারওয়ার আলম। সেই উদ্যোগকে ঘিরেই তার বিরুদ্ধে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করছে।

মাজারের আয়-ব্যয় নিয়ে প্রশাসনের নজরদারি

সিলেটকে দেশের ‘আধ্যাত্মিক রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত করার পেছনে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) মাজারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী ও ভক্ত এই দুই মাজারে জিয়ারত করতে আসেন। তারা নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, গবাদিপশুসহ বিভিন্ন ধরনের দান-খয়রাত প্রদান করেন।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মাজারের দান ও আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন ছিল। অভিযোগ রয়েছে, বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হলেও তার কোনো সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। মাজার পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রভাবশালী পরিবার ও গোষ্ঠী এ অর্থের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন সামনে আসে। পরে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় মাজার কর্তৃপক্ষের কাছে আয়-ব্যয়ের হিসাব চাওয়া হলে তারা সন্তোষজনক কোনো হিসাব উপস্থাপন করতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

সারওয়ার আলমের উদ্যোগ কী ছিল?

এই প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম মাজার পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

তার উদ্যোগের মধ্যে ছিল—  মাজারে ব্যবহৃত তিনটি বড় ডেগ (দান ও অর্থ সংরক্ষণে ব্যবহৃত পাত্র) সিলগালা করা; জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নতুন দানবাক্স স্থাপন; দান সংগ্রহ ও গণনার প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক নজরদারি নিশ্চিত করা; মাজার এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন; এবং আয়-ব্যয়ের লিখিত হিসাব সংরক্ষণ ও নিয়মিত অডিটের ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ।

শনিবার (২০ জুন) মাজারের ডেগের ওপর সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পরদিনই তাকে প্রত্যাহারের আদেশ জারি হওয়ায় বিষয়টি আরও বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারের পেছনে সরকারি কোনো ব্যাখ্যা না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপই কি তার বদলির কারণ?

অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিনের একটি অস্বচ্ছ ব্যবস্থায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের ফলে স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশাসনে বদলি ও পদায়ন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া এবং অনেক ক্ষেত্রেই এর পেছনে প্রকাশ্য কোনো কারণ উল্লেখ করা হয় না।

সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়াতে হলে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের মতে, প্রশাসনের এই উদ্যোগ দীর্ঘদিনের একটি জনদাবির প্রতিফলন ছিল।

তবে মাজার পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি অংশ জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপকে ‘অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ’ হিসেবে দেখেছে বলেও জানা গেছে।

আলোচিত কর্মকর্তা সারওয়ার আলম

মো. সারওয়ার আলম প্রশাসন ক্যাডারের একজন পরিচিত কর্মকর্তা। তিনি এর আগে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পরে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ভেজালবিরোধী অভিযানে সক্রিয় ভূমিকার জন্য জাতীয়ভাবে আলোচিত হন।

বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ে পরিচালিত ভেজালবিরোধী অভিযানে তার কঠোর অবস্থান জনমনে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল। প্রশাসনে সৎ, কঠোর এবং ঝুঁকি নিতে সক্ষম কর্মকর্তা হিসেবে তার একটি আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়।

২০২০ সালের ৯ নভেম্বর তাকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে প্রশাসনে পদোন্নতি পেয়ে তিনি উপসচিব হন।

প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য

বিশ্লেষকদের মতে, সিলেটের দুই ঐতিহাসিক মাজার শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে যেকোনো পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।

তারা বলছেন, সারওয়ার আলমের প্রত্যাহার প্রশাসনিক রুটিন বদলি নাকি তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো কোনো সরকারি তথ্য এখনো প্রকাশ হয়নি। তবে ঘটনাপ্রবাহের সময়কাল এবং মাজারকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক উদ্যোগের কারণে বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে সিলেটের প্রশাসনিক মহলে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন হলো—মাজারের আর্থিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারের পর সেই প্রক্রিয়া আগের গতিতে চলবে কি না। একই সঙ্গে তার স্থলাভিষিক্ত কর্মকর্তা এ বিষয়ে কী অবস্থান নেন, সেটিও এখন সিলেটবাসীর আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে।

x

Check Also

মালয়েশিয়ায় তারেক রহমানকে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা, প্রবাসীদের প্রত্যাশা শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ ও সিন্ডিকেটমুক্ত ব্যবস্থা

জাহিদ বিপ্লব, মালয়েশিয়া থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন। ...