এমএনএ অর্থনীতি ডেস্ক : মহামারি করোনার কারণে চলতি অর্থবছরের বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয় স্বাস্থ্য খাতকে। সেই আলোকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্বাস্থ্য খাতে ১৭ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু অর্থবছরের অর্ধেক সময় চলে গেলেও স্বাস্থ্য খাত লক্ষ্যমাত্রা অর্থ ব্যয় করতে পারেনি। এ অবস্থায় সংশোধিত এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ১৮.৭৯ শতাংশ বা ৩ হাজার ২৫২ কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের এডিপির ১৫ খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ কমছে স্বাস্থ্য খাতে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের মাধ্যমে এ খাতের বরাদ্দের অর্থ ব্যয় হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এডিপি বরাদ্দের মাত্র ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। অন্যদিকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ব্যয় করেছে বরাদ্দের ২২ শতাংশ।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, কৃষি, পরিবহন এবং যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, শিক্ষাসহ সব খাতেই বরাদ্দ কমছে সংশোধিত এডিপিতে। তবে উল্লেখযোগ্য হারে বরাদ্দ কমছে স্বাস্থ্য খাতে ১৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ বা ৩ হাজার ২৫২ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ১৪ শতাংশ বা ৬ হাজার ৪২১ কোটি টাকা, শিক্ষা খাতে ১০ শতাংশ বা ২ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা আর পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ কমছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ বা ৫ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কৃষি, শিল্প ও সমন্বয় উইং) মো. ছায়েদুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, বরাদ্দ দেওয়া হলেও আশানুরূপ কাজ করতে না পারায় স্বাস্থ্যসহ বেশ কিছু খাত থেকে টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। এসব বরাদ্দের অর্থ অসম্পন্ন অন্য খাতে স্থানান্তর করা হয়।
মূলত সংশোধিত এডিপি প্রণয়নে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর কাছে চাহিদা চাওয়া হয়। পরিকল্পনা কমিশন, মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দের চাহিদা প্রস্তাব, বাস্তবায়ন হার এবং অর্থায়নের জোগান পর্যালোচনা করে খাতভিত্তিক এ বরাদ্দ প্রস্তাব চূড়ান্ত হবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় (এনইসি)। আগামী মার্চে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এনইসি সভাটি অনুষ্ঠিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলেছেন, শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বাস্থ্য খাতের নাজুক অবস্থার পরিবর্তন হবে না। ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থহীন ব্যয়ের অভিযোগগুলোরও সমাধান করতে হবে। এ খাতকে ঢেলে সাজাতে দীর্ঘমেয়াদে একটি রোডম্যাপ বা পথনকশা করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
স্বাস্থ্য খাতে এডিপি বাস্তবায়ন কম হওয়ার বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান এইচ মনসুর বলেন, স্বাস্থ্য খাত সব সময়ই একটা দুর্বল খাত ছিল। এই দুর্বল খাতের ওপর গত বছর করোনার কারণে অনেক প্রকল্প পড়ে যায়। ফলে তাদের ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হয়ে যায়।
তিনি বলেন, অন্যদিকে এটা দুর্নীতিযুক্ত একটি খাত। এখানে বিভিন্ন লবিং আছে। তারা এখানে সুযোগ নেয়। ওষুধের সাপ্লাই, মেশিনারি এসব জায়গায় কোটা থাকে তারা একসেস করে। এসব কারণে বেশ প্রকিউরমেন্টও হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকিউরমেন্ট বন্ধ হয়ে যায় বা দেরি হয়। এসব কারণে প্রকল্পগুলো দেরি হয়।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি ৯ লাখ টাকার ব্যয় সংবলিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অনুমোদন দেওয়া হয়। এডিপিতে সরকার জোগান দিচ্ছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আর উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে আসবে বাকি ৮৮ হাজার ২৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ ছিল ৮৮ হাজার ২৪ কোটি টাকা। এখন সংশোধিত এডিপির জন্য এই বরাদ্দ কমিয়ে ধরা হয়েছে ৭০ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বৈদেশিক অর্থায়ন কমছে ১৭ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। তবে সরকারি অংশের বরাদ্দ কমছে না।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের নানা ধরনের শর্তের কারণে বৈদেশিক সহায়তা পুষ্ট প্রকল্পে আগ্রহ কম থাকে বাস্তবায়নকারী সংস্থারগুলোর। অন্যদিকে বাস্তবায়নে জটিলতা কম থাকে বলে সরকারি তহবিলের অর্থ থেকে বেশি বরাদ্দ চায় মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। এর প্রভাব পড়েছে সংশোধিত এডিপিতে।
চলতি অর্থবছরের এডিপিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৬১ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। এরপরেই বিদ্যুৎ খাতে গুরুত্ব দিয়ে ৪৫ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২৩ হাজার ৪২১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে গৃহায়ন খাতে। বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে চতুর্থ স্থানে শিক্ষা খাতে ২৩ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগে ১৪ হাজার ২৭৪, পরিবেশ ও পানি উন্নয়নে ৮ হাজার ৪৭০, কৃষিতে ৭ হাজার ৬৪৬, শিল্প খাতে ৪ হাজার ৬৪৩, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে ৩ হাজার ২০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পাবলিক অর্ডার অ্যান্ড সেফটি খাতে ৩ হাজার ২০৪, সাধারণ সেবা খাতে ২ হাজার ৯২৩, সাংস্কৃতিক খাতে ২ হাজার ১৯০, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ হাজার ৬৪৮ কোটি এবং ডিফেন্স খাতে ৮৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

