Don't Miss
Home / হোম স্লাইডার / আঞ্চলিক সমৃদ্ধির স্বার্থে পাকিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ
পাকিস্তান

আঞ্চলিক সমৃদ্ধির স্বার্থে পাকিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ

এমএনএ ফিচার ডেস্কঃ দক্ষিণ এশিয়ার দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে পাকিস্তান অন্যতম। দেশটি এই মুহূর্তে একটি গুরুতর রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আস্থা ভোটে হেরেছেন, পাকিস্তানের ইতিহাসে অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে অপসারিত ইমরান খানই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তানের তার প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে বৈরী সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের এবং নিজেদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সবসময় অস্থির ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে সর্বাগ্রে পাকিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সব চেয়ে জরুরী।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছরে কখনো রাজনৈতিক শান্তির সময় পার করেনি। এইসময়ে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে, কোন প্রধানমন্ত্রী পূর্ণ পাঁচ বছর ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। পাকিস্তানের সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বিরোধীদের দ্বারা অনাস্থা প্রস্তাবের মুখোমুখি হয়ে দেশ আবার রাজনৈতিক সংকটে পতিত হয়।

২০১৮ সালে  ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)পার্টি সেনা বাহিনীর সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। তখন তিনি দেশের জনগনকে একটি নতুন পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি তার সমর্থকদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে পাকিস্তানের পঙ্গু অর্থনীতিকে সুদৃঢ় করার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। প্রায় ৪বছর রাষ্ট্র পরিচালনার পর তার সমালোচকরা বলছেন, ইমরান খান তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।

এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জাতীয় পরিষদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নেওয়াজের নেতৃত্বে বিরোধীরা একত্রিত হয়ে একটি মামলা করে। ৮ মার্চ জাতীয় পরিষদে ইমরান খানের বিরুদ্ধে আস্থা প্রস্তাব আনে। সংবিধান লঙ্ঘন ও বিদেশী ষড়যন্ত্রের অজুহাতে ৩রা এপ্রিল ডেপুটি স্পীকার কাসিম সুরি প্রস্তাবটি বাতিল করে দেন। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পরামর্শে রাষ্ট্রপতি জাতীয় পরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে নতুন নির্বাচনের আহবান জানান।তার আগে মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল। আর ইমরান খানকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের নির্দেশনাও দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি।

কিন্তু বিরোধীরা এই অসাংবিধানিক রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিয় কোর্টে আবেদন জানালে ৭দিন উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ৭ এপ্রিল শীর্ষ আদালত ডেপুটি স্পীকারের রুল বাতিল করে জাতীয় পরিষদ পুনরুদ্ধার করে এবং ৯ এপ্রিল  সকালের মধ্যে অনাস্থা ভোট গ্রহনের আহবান জানায়। পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ৯ এপ্রিল গভীর রাতে ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের ভোট দিয়েছে। ১৭৪ জন পার্লামেন্ট সদস্য অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলে ইমরান খান প্রধানমন্ত্রীত্ব হারান।

ইমরান খান পাকিস্তানের বর্তমান এই রাজনৈতিক সংকটের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রকে সরাসরি দায়ী করেন। পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে প্রায় এক দশক ধরে দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।পাকিস্তান চীনের দিকে ঝুঁকে সম্পর্কের আরো অবনতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাছে মিত্রদের তালিকা পর্যালোচনা করলে পাকিস্তানের নাম থাকতো সবার উপরে। কিন্তু সেই সম্পর্ক কয়েক বছর ধরে আর নেই।

তবে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকট ২০১৮ সালের নির্বাচনেই দেখা গিয়েছিল। সেই নির্বাচনে ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। সেই নির্বাচনে ইমরান খানকে ক্ষমতায় আনতে ঐতিহ্যগতভাবে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ছিল। অতি সম্প্রতি, সামরিক বাহিনী এবং ইমরান খানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে এবং বিরোধী দল তার সরকারের বিরুদ্ধে জাতীয় পরিষদে অনাস্থা প্রস্তাব করার সুযোগ পেয়েছে। যদিও সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সামরিক বাহিনী কী ভূমিকা পালন করেছিল তা স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, আদালতের আদেশের কঠোরতা সেনাবাহিনীর প্রভাবের ইঙ্গিত বহন করে।

ক্ষমতায় আসার পর একটি নুতন পাকিস্তান উপহার দেবার কথা বলেছিলেন ইমরান খান, তা তিনি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি তার শাসনামলে পাকিস্তানের জীবনযাত্রার ব্যয় ছিল উর্ধ্বমুখি। ডলারের বিপরীতে পাকিস্তানী রুপির পতন ঘটছে। প্যান্ডোরা পেপারস নামে পরিচিত গত বছরের অফশোর অর্থের একটি আন্তর্জাতিক তদন্তে পাকিস্তানের যে ৭০০ জনের নাম এসেছে তাদের মধ্যে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রীদের ও ঘনিষ্ঠদের নাম রয়েছে। সত্যি কথা বলতে কি, ইমরান খানের চার বছরের শাসনামলের ব্যর্থতা, রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্বে পাকিস্তানের অবস্থান, আফগানিস্তানে তালেবান সরকার প্রতিষ্ঠায় জোরালো সমর্থন এবং চীনের সাথে দৃঢ় সম্পর্কই ইমরান খানের জন্য কাল হয়েছে।

ইমরান গ্ল্যামারকে কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল গঠনে ব্যর্থ হওয়ায় রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে পারেননি। ফলে বিভিন্ন ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত তাকে দিতে হয়েছে। পাকিস্তানের এই রাজনৈতিক বাঁক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব।

নতুন সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করাই হবে প্রাথমিক লক্ষ্য। ইতিমধ্যে ক্ষমতাচ্যুত ইমরান খান জাতীয় পরিষদ থেকে পদত্যাগ করার হুমকিও দিয়ে রেখেছেন। ফলে আবার রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাবে পাকিস্তান। আগামী সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত পাকিস্তানের রাজনৈতি স্থিতিশীলতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক অবস্থাকে সুদৃঢ় করা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বজায় রাখতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দ্বিতীয় সম্ভাবনার দেশ ছিল পাকিস্তান। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে দেশটি তার সুফল পায়নি। বাংলাদেশ একসময় অখন্ড পাকিস্তানের অংশ ছিল। স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যেই বেশিরভাগ অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে এগিয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে সমৃদ্ধির সূচকে পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে বাংলাদেশ। গত এক দশকে বাংলাদেশ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়ে আছে পাকিস্তান থেকে। পাকিস্তানকে তাদের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে এবং তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।

পাকিস্তানে প্রতিনিয়ত গণতন্ত্রকে আঘাত করা হচ্ছে। সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সেনাবাহিনী বা বিচার বিভাগ এমনকি বিদেশী শক্তির বারবার হস্তক্ষেপ গণতন্ত্রের ধারণার পক্ষে সমর্থনযোগ্য নয়। এ ধরনের অনুশীলন পাকিস্তানের অগ্রগতি রোধ করবে এবং তাদের নেতৃত্বকে তা বুঝতে হবে। উপরন্তু, পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তি এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে কারণ দেশটির জন্য সন্ত্রাসবাদের বৃদ্ধির ঝুঁকি বেশি থাকে।

ইমরান খান সরকারের বিদায়ের পর যে সরকার গঠিত হয়েছে তাও ঝুঁকির মধ্যে থাকবে সন্দেহ নেই! তবুও শাহবাজ শরীফের নেতৃত্বে গঠিত সরকার তাদের রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে শীঘ্রই গণতান্ত্রিক সমাধান খুঁজে বের করবে, সেই আশাই করবে পাকিস্তানের জনগণ। পাকিস্তান শীঘ্রই গণতান্ত্রিক অনুশীলনকে যদি ফিরিয়ে আনতে পারে, তা হলে শুধু পাকিস্তানই নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চলই লাভবান হবে।

লেখক : মিয়া মনসফ, যুগ্ম সম্পাদক, মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ)

x

Check Also

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ফাইল অনুমোদন নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, অনিয়ম প্রমাণে চ্যালেঞ্জ আসিফ মাহমুদের

এমএনএ প্রতিবেদক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কোনো ফাইলে অনিয়ম হয়ে থাকলে তা সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ ও প্রমাণ ...