এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয়লাভ করে ফ্রান্সের রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন মধ্যপন্থী ইমানুয়েল ম্যাখঁ। যাকে ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্প’ বলে অনেকেই অভিহিত করছেন। ম্যাখেঁর এ জয় সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
ম্যাখঁ ইউরোপপন্থী ও উদার নীতির সমর্থক। তিনি আগে কখনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেননি। অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ২০১৬ সালে এন মার্শে (এগিয়ে চল) দল প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তবে এক বছর আগেও পরিস্থিতিটা ছিল ভিন্ন। এক বছর আগে তিনি বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ সরকারের সদস্য ছিলেন।
ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ওলাঁদ অন্যতম।
ওলাঁদ সরকারে যোগ দেওয়ার আগে ম্যাখঁ ফরাসিদের মাঝে খুব একটা পরিচিত ছিলেন না। অথচ ৩৯ বছর বয়সী এই ম্যাখঁই ফ্রান্সের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।
দুই দফার নির্বাচনে দেশটির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের পেছনে ফেলে শেষ হাসি হাসছেন ম্যাখঁ। তিনি প্রথমে মধ্য বাম ও মধ্য ডানপন্থী প্রার্থীদের পরাজিত করেন। আর গতকাল রবিবার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফায় ভোটে পরাজিত করেন কট্টর ডানপন্থী প্রার্থীকে।
দ্বিতীয় দফায় মধ্য ডানপন্থী ম্যাখঁ পেয়েছেন ৬৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কট্টর ডানপন্থী মারিন লি পেন পেয়েছেন ৩৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট।
বিশ্লেষকরা অবশ্য এই জয়ের পেছনে ইমানুয়েল ম্যাখেঁর নিজস্ব ক্যারিশমার পাশাপাশি বেশ কিছু কারণ খুজেঁ বের করেছেন।
ভাগ্য
নিঃসন্দেহে ম্যাখঁ ভাগ্যবান। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে ভাগ্য তাঁর সহায় হয়েছিল।
কেলেঙ্কারির কারণে শুরুতেই নির্বাচনী লড়াই থেকে বাদ যান মধ্য ডানপন্থী প্রার্থী ফ্রাঁসোয়া ফিওঁ। সমাজতান্ত্রিক প্রার্থী বেনোট হ্যামনও বাদ পড়েন।
ফরাসি বিশ্লেষক মার্ক অলিভার বলেন, ম্যাখঁ খুবই ভাগ্যবান। কারণ, পুরোপুরি একটি অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন তিনি।
নির্বাচনে ম্যাখেঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠায় ভোটাররা নতুন কাউকে চেয়েছিল নিজেদের নেতা নির্বাচনে। আর নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সেই জায়গাটিই দখল করতে পেরেছেন বলে মনে করেন প্যারিস বেইজড থিংক ট্যাংক ‘টেরা নোভা’র প্রতিনিধি মার্ক ওলিভার পেডিস।
বিচক্ষনতা
ফ্রান্সের নতুন প্রেসিডেন্টের ভাগ্যের কেবল সুপ্রসন্ন ছিল না। বরং বিচক্ষণতাও তাঁর জয়ে অবদান রেখেছে। কারণ তিনি খুব চতুরতার সঙ্গে নির্বাচনের গতিপথ তৈরি করে নিয়েছিলেন।
নির্বাচনে ম্যাখঁ সমাজতান্ত্রিক দলের হয়ে অংশ নিতে পারতেন। তবে সে পথে হাঁটেননি তিনি। তবে সরকারের থাকাকালীন সময়ে তিনি অনুধাবন করেন সমাজতান্ত্রিক দলের অবস্থা জনগণের কাছে খুব বেশি গ্রহণযোগ্য নয়।
ইউরোপের পরিস্থিতি দেখে শিক্ষা নেন ম্যাখঁ। রাজনীতিকদের ব্যর্থতায় নিজ দেশে সৃষ্টি হওয়া সুযোগ কাজে লাগান তিনি।
২০১৬ সালের এপ্রিলে ম্যাখঁ নিজের দল গঠন করেন। পরে ওঁলাদের সরকার ছাড়েন।
পেডিস বলেন, দূরদর্শী সম্পন্ন ম্যাখঁ দলের অবস্থার বিষয়টি আগেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি সেই পথ মাড়াননি।
নতুনত্ব
ফ্রান্সে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছেন ম্যাখঁ। তিনি তাঁর দেশের মানুষের মন বুঝতে পেরেছিলেন। জানতে পেরেছিলেন তাঁদের হতাশার কথা।
ম্যাখোঁ তৃণমূলকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই ভোটারদের কাছে যায় তাঁর দল। তাদের সঙ্গে কথা বলে। জনগণের প্রত্যাশার প্রতি মনোযোগ দেয়।
প্যারিসভিত্তিক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এমিলি স্কুলথিস বলেন, ২০০৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে বারাক ওবামার নেওয়া কৌশল কাজে লাগায় ম্যাখোঁর দল। এক্ষেত্রে প্রায় ৩ লাখের মতো বাড়িতে স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করেন।

সেই সব বাড়ির বাসিন্দাদের থেকে তুলের আনেন তাদের চাওয়া পাওয়ার কথা। সে মতেই নিজের নির্বাচনী প্রচারণার কাজ করেন ম্যাখঁ। এটাও তার সাফল্যের একটি কারণ।
ইতিবাচক বার্তা
ওলাঁদের অর্থমন্ত্রী ছিলেন ম্যাখঁ। এ সময় ফ্রান্সে সরকারি ব্যয় কমানোর বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। ম্যাখঁ নিজেকে ওলাদে পরিণত করেননি। তাইতো নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী লি পেনের চেয়ে ইতিবাচক বার্তা প্রদানের মাধ্যমে অনেক এগিয়ে ছিলেন ম্যাখঁ।
লি পেন যখন নিজেকে এলিটদের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন, তখন নবিশ ম্যাখঁ তৃণমূলের কথা তুলে ধরেন। স্বপ্ন দেখান সবাইকে নিয়ে নিরাপদ ও সমৃদ্ধশালী ফ্রান্স গড়ার।
বিশ্লেষক মার্ক অলিভার বলেন, ফ্রান্সজুড়ে একটা হতাশা ছিল। এর মধ্যে আশার বাণী নিয়ে আসেন ম্যাখঁ। তিনি জনগণকে ইতিবাচক বার্তা দেন। কী করবেন, তা বলেননি তিনি। মানুষ কীভাবে সুযোগ পেতে পারে, সেই কথা বলেছেন। এই ধরনের বার্তা তিনিই শুধু দিয়েছেন।
লি পেনের বিপরীত ছিলেন ম্যাখঁ
নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে মেরিন লি পেন বেশ কিছু নেতিবাচক ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসেন। এর মধ্যে ছিল অভিবাসন বিরোধী ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তা।
সে ক্ষেত্রে ম্যাখঁ তার আধুনিক চিন্তার সমন্বয়ে অভিবাসীদের জন্য সীমান্ত খুলে রাখার পক্ষে মত দেয়ার পাশপাশি ইউরোপিয় ইউনিয়নে থেকে দেশকে সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ স্থান করার কথা বলেন।
ম্যাখেঁর নির্বাচনী সভায় বৈচিত্র্য ছিল। ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। আর লি পেনের সভায় হাঙ্গামা, বিশৃঙ্খলা লেগে থাকত। থাকত পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি।
লি পেন ভীতির সঞ্চার করেছিলেন। অন্যদিকে, ভয়কে জয় করে আশার কথা শুনিয়েছিলেন ম্যাখঁ।
নির্বাচনে জয়ের পরও ম্যাখঁ বলেছেন, তাঁর দায়িত্ব হবে ভীতি দূর করা। আশাবাদ জাগানো।
নির্বাচনের আগে সর্বশেষ টিভি বিতর্কেও দুই প্রার্থীর মধ্যে এ নিয়ে বেশ চড়া সুরে তর্ক হয়। এ সময় লি পেনকে তার বাবার মতোই কট্টরপন্থী মানসিকতার ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন ম্যাখঁ।
অন্যদিকে ভালো প্রচারণা চালিয়েও নিজের কট্টরপন্থী মনোভাবের কারণে শেষ পর্যন্ত ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে পরাজয় বরণ করে নেন লি পেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম পর্বের ভোটে এগিয়ে ছিলেন এমানুয়েল ম্যাখঁ ও মারিন লি পেন। গতকাল রবিবারের রানঅফ ভোটে তারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
এতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফরাসি ভোটাররা ৩৯ বছর বয়সী সাবেক ব্যাংকার ম্যাখঁকেই বেছে নেন।
নির্বাচনের আগে ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই প্রার্থী সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ নিয়ে দেশটি কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়ে।
ম্যাখঁ ইউরোপপন্থী ও উদার নীতির সমর্থক। তিনি এর আগে কখনই নির্বাচিত হননি। অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ২০১৬ সালে এন মার্শে (এগিয়ে চল) দল প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
অন্যদিকে ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেতা ৪৮ বছর বয়সী লি পেন বিশ্বায়ন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী উগ্র-ডানপন্থী। তিনি প্রচণ্ড মুসলিমবিরোধী। ফ্রান্সে ‘উগ্রপন্থী’ মসজিদ বন্ধ করে দেয়ার কথা বলেছেন তিনি।
এছাড়া এবারের নির্বাচনে গত কয়েক দশক ক্ষমতায় থাকা সমাজতান্ত্রিক এবং মধ্য ডানপন্থী রিপাবলিকান দলকে নির্বাচনের প্রথম ধাপেই প্রত্যাখ্যান করেন ভোটাররা।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
