Don't Miss
Home / হোম স্লাইডার / ঈদের পরেই করোনা সংক্রমণের পিকটাইম?

ঈদের পরেই করোনা সংক্রমণের পিকটাইম?

এমএনএ রিপোর্ট : নভেল করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯) এর আশঙ্কাজনক সংক্রমণ বিস্তারে বাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা করছে ভয়াবহ দুঃসময়। তাহলে এই দুর্যোগের পরিসমাপ্তি হবে কবে? আর কতদিনই বা চলবে লকডাউন? এদিকে কয়েকদিন পরেই শুরু হবে রোজা। তারপর ঈদ। কিভাবে কি হবে তা নিয়েই পুরো দেশবাসী আজ উদ্বিগ্ন। দেশবাসীর এসব প্রশ্নোত্তর খুঁজতে গিয়ে যেসব তথ‌্য-উপাত্ত, বিশ্লেষণ পাওয়া গেছে তা নিয়েই তৈরি হয়েছে মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ)-এর এই বিশেষ প্রতিবেদন।

দেশে প্রথম তিনজন করোনা রোগী শনাক্ত ৮ মার্চ। সে হিসেবে রোগটির প্রাদুর্ভাবের আজ ৪৩তম দিন চলছে। এর মধ্যে দেশের সব বিভাগে এবং ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৫ জেলায় রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই আক্রান্তের সর্বোচ্চ রেকর্ড হচ্ছে।

মারাও যাচ্ছেন আশঙ্কাজনক হারে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার সারা দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে। কার্যত লকডাউনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। দমবন্ধ অবস্থা মানুষের। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্নও। সবার মনে এখন একটিই প্রশ্ন কবে নাগাদ এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি মিলবে। কিংবা আর কত রোগী ও মৃত্যু বাড়বে এবং ঠিক কবে নাগাদ সংক্রমণের সংখ্যা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছাতে পারে।

দেশে বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সেই সংক্রমনের পিকটাইম হতে পারে আগামী ঈদের পর অর্থাৎ মে মাসের শেষে অথবা জুনের শুরুতে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিটি দেশেই দু-একজনের মাধ্যমে এ ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়েছিল। পরে ধাপে ধাপে বিস্তার ঘটিয়ে মহামারি আকার ধারণ করে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছার পর আবার ধাপে ধাপে সংক্রমণ হ্রাস হয়েছে। অনেক দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। আবার কোনো কোনো দেশে কমতে শুরু করেছে।

দেশে প্রথম করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। এরপর গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটতে দেখা গেছে। তবে এপ্রিলের শুরু থেকে প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। এক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে আরও ৩১২ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে সাতজনের। এ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দুই হাজার ৪৫৬ জনে পৌঁছল। মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯১ জনে দাঁড়িয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে দেশে করোনার বিস্তার, সংক্রমণ ও মৃত্যুর সার্বিক ঘটনা এবং ভবিষ্যতে কী পরিস্থিতি হতে পারে, সে সম্পর্কে রোগতত্ত্ববিদ, ভাইরোলজিস্ট, জনস্বাস্থ্যবিদসহ সংশ্নিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা তাদের নিজ নিজ মতামত দিয়েছেন। তারা বলেছেন, আগামী মে মাসের শেষে অথবা জুনের শুরুতে দেশে এ ভাইরাসটি বিস্তারের পিকটাইম হতে পারে। অর্থাৎ ভাইরাসটি যে হারে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছতে মে মাসের শেষ থেকে জুন মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

বাংলাদেশে করোনার পিকটাইম সম্পর্কে জানতে চাইলে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘প্রথম কথা হলো, বিষয়টি নিয়ে এখনই কিছু বলা অত্যন্ত কঠিন। কারণ বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং এ ভাইরাসটি সম্পর্কে আমরা এত সীমিত জানি যে, সরাসরি উত্তর দেওয়া কঠিন। আমরা যে পূর্বাভাস দিয়েছি সেটি পরিবর্তন হতে পারে। প্রতিদিনই কিন্তু পূর্বাভাস পরিবর্তন হয়। ভাইরাসের অগ্রগতি ধীরগতি করার জন্য আমরা কাজ করছি। তবে এটি অগ্রসর হবে। এটি ধীরগতিতে যাতে বাড়ে, সে চেষ্টাই করছি। তাহলে এটির ব্যবস্থাপনা করতে কিছুটা সময় পাওয়া যাবে।’

ডা. ফ্লোরা বলেন, ‘সংক্রমণের হার দেখলে একটি বিষয় পরিস্কার হয় যে, অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ছে না। ধীরে ধীরে বাড়ছে। এতে আমাদের ধারণা হয়, আগামী মে মাসের শেষ অথবা জুন মাসে এটি পিক হতে পারে। তবে এটি শতভাগ নিশ্চিত নয়। এখনকার যে তথ্য-উপাত্ত আমাদের হাতে আছে, তার আলোকে এটি বলছি। পরিস্থিতি পাল্টে গেলে এটার পরিবর্তন হতে পারে। এ ভাইরাসটির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো দেশের পূর্বাভাসই কিন্তু সঠিক হয়নি। সে বিষয়টি মাথায় রেখেই আমাদের পূর্বাভাস দিতে হয়।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক গণমাধকে বলেন, করোনার সংক্রমণ ও বিস্তারের বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সংক্রমণ শুরুর ৪৫ দিন পর ইতালিতে, ৫০ দিন পর স্পেনে এবং ৫৫ দিন পর যুক্তরাষ্ট্রে এটি মহামারি আকার ধারণ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ৪৩ দিনের মাথায়ও সে রকম পরিস্থিতি হয়নি। কোন দেশে কীভাবে বিস্তার ঘটবে সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। আর আমাদের সমস্যাটি তো অন্য জায়গায়। দেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু লকডাউন করা হয়নি। এ লকডাউনের উদ্দেশ্য হলো- সময় গণনা করা। অর্থাৎ লকডাউন করে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা। সারাদেশের মানুষ ঘরে আটকে থাকলে পরিস্থিতি কী ঘটে এবং তার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া। আমাদের তো লকডাউনই হয়নি। সারাদেশের মানুষ নিজের ইচ্ছে মতো ঘোরাঘুরি করছে। হাজার হাজার মানুষ দেখলাম জানাজায় অংশ নিল। তাহলে লকডাউনটা হলো কোথায়? এ অবস্থা চলতে থাকলে কবে ভাইরাসটির পিকটাইম হবে সেটি অনুধাবন করা কঠিন হবে।

ডা. মোজাহেরুল হক আরও বলেন, শুরু থেকেই স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পারেনি। এ জন্য তারা ভুল ও সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করেছে। আইইডিসিআরের কাজ তো নমুনা পরীক্ষা ও সংবাদ সম্মেলন করা নয়। আইইডিসিআরের কাজ সার্ভিলেন্স করে রোগতাত্ত্বিক বিশ্নেষণ করা এবং স্বাস্থ্য বিভাগ সে অনুযায়ী পরিকল্পনা নির্ধারণ করবে। অথচ আইইডিসিআর থাকল নমুনা পরীক্ষা নিয়ে। এককভাবে নমুনা পরীক্ষা করার কারণে কম পরীক্ষা হয়েছে। এতে সংক্রমণের সঠিক সংখ্যা জানা যাচ্ছে না। ওই নমুনা পরীক্ষা সারাদেশে বিস্তৃত করে সেখান থেকে পাওয়া পজিটিভ কেসগুলো আইসোলেশন এবং কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং- করে অন্যদের কোয়ারেন্টাইন করা। এ কাজটি যত দ্রুত করা যাবে, ততই এই ভাইরাসটি প্রতিরোধ করা যাবে।

চলতি এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে জাতিসংঘ তথ্য কেন্দ্র ‘বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি : প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, সারাবিশ্বের মতোই বাংলাদেশে এ ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়া রোধ করার জন্য দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এটি দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়বে। জনগণের প্রতি প্রতিরোধমূলক সব ব্যবস্থা মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার, জাতিসংঘের সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশব্যাপী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও জোরদার করার জন্য কিছুটা সময় পাবে। আর এর ফলে বাংলাদেশ এ মহামারি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারবে বলে আশা করা যায়।

বাংলাদেশের দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এখানে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা দুর্বল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাই নেই। কভিড-১৯ সংক্রমিত হলে অন্যান্য রোগীর চিকিৎসাও বাধাগ্রস্ত হবে। রোগীর ঘনত্বের তুলনায় দক্ষ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর অভাব বাংলাদেশে প্রবল। এ ছাড়া সংক্রমণ প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত অনুশীলন ও দক্ষতার অভাব, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) অপ্রাচুর্যতা, রোগীর বহুল ঘনত্ব মিলিয়ে করোনা মোকাবিলা করা বাংলাদেশের জন্য বেশ কঠিন হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

জাতিসংঘ তথ্য কেন্দ্র জানায়, সরকারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা ইতিবাচক হলেও দ্রুতই তা নেতিবাচক হতে দেরি হবে না। যদি সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ কঠোরভাবে প্রয়োগ করা না হয়, সামান্য ভুলে মহামারি তীব্র হারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব গণমাধ্যমকে বলেন, জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে সঠিক চিত্র ফুটে উঠেছে। করোনা প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগ এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে? সর্বত্রই তো অবস্থাপনা। সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করে পরিস্থিতিকে প্রতিদিনই জটিল করে তোলা হচ্ছে। কোনো কিছুই তো সঠিক পন্থায় হচ্ছে বলে মনে হয় না। এখনও প্রতিদিন মাত্র দুই-আড়াই হাজার টেস্ট করা হচ্ছে। এটি হওয়া উচিত ছিল ২৫ থেকে ৩০ হাজার। আবার সরকার ছুটি ঘোষণা করে বসে থাকল। জাতীয়ভাবে লকডাউন করল না। স্থানীয় প্রশাসন লকডাউন করছে। সেটিও তো মানা হচ্ছে না। মানুষ সংক্রমিত এলাকা থেকে দল বেঁধে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ছে। এতে ভাইরাসটি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

করোনা ভাইরাসে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন করোনাক্রান্ত রোগীর প্রায় ৮৯ শতাংশই মারা যাচ্ছে। দেশে এখন পর্যন্ত ৯ জন রোগীর আইসিইউ সাপোর্ট দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮ জনই মারা গেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল রবিবারের এ সংক্রান্ত নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে ৩১২ জনের দেহে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এখনও একের পর এক আক্রান্ত হচ্ছে নতুন নতুন জেলার মানুষ। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৫টিতে ভাইরাসটি বিস্তার লাভ করেছে। সারা দেশে এ পর্যন্ত ২৪৫৬ জন শনাক্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ৯১ জন।

বিশিষ্ট চিকিৎসকদের বরাদ দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, করোনায় আক্রান্ত রোগীর ৮০ শতাংশ ঘরে কোয়ারেন্টিনে থেকে চিকিৎসা নিলে ভালো হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ১৫ শতাংশের হাসপাতালে পরিচর্যা দরকার। বাকি ৫ শতাংশের অবস্থা গুরুতর হতে পারে, যাদের মধ্যে অল্পসংখ্যকের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হতে পারে। তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ এবং ভেন্টিলেটর প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কিন্তু গত কয়েকদিনে আইসিইউর ফলাফল ভালো পাওয়া যায়নি। করোনায় আক্রান্ত যে ৯ জনকে ভেন্টিলেটরে নেয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে আটজনই মারা গেছেন।

দেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ের প্রদত্ত তথ্য এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত পর্যালোচনায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, আসছে দিনগুলোতে আমাদের জন্য ভালো কোনো সংবাদ নয় বরং কঠিন দুঃসময়ের আভাস মিলছে।

x

Check Also

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত চালুতে সরকারের জোর তৎপরতা: উপদেষ্টা মাহদী

এমএনএ প্রতিবেদক মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় চালু করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে ...