এমএনএ অর্থনীতি ডেস্কঃ করোনার সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি সামাল দিতে দেশে গত ১৪ এপ্রিল থেকে চলছে সম্মিলিত লকডাউন। যা ৫ম দফা বাড়িয়ে আগামী ৩০ মে পর্যন্ত বর্ধিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বর্ধিত লকডাউনের প্রজ্ঞাপন রবিবার জারি হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি সূত্র।
দীর্ঘ এই লকডাউনের ফলে ফের সামনে এসেছে জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন। জীবনকে বাঁচাতে জীবিকার পথ বন্ধ করা হলেও তা মানতে নারাজ সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে বন্ধ থাকা দূরপাল্লার গণপরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বিনোদনকেন্দ্র ও বেসরকারি অফিসগুলো খুলে দেয়ার জোর দাবি জানাচ্ছেন তারা। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে সরকারকেও।
তাই আগামীকাল সোমবার থেকে দূরপাল্লার গণপরিবহন চালু করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শিগগিরই সরকারি-বেসরকারি অফিস, হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়া ও পর্যটনকেন্দ্রগুলো খুলে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হবে বলেও জনিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরাও জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবকিছু স্বাভাবিক করে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা বলছেন, দূরপাল্লার গণপরিবহন আগেই খুলে দেয়া উচিত ছিল। ঈদে দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ থাকায় মানুষ ভিন্ন পন্থায় গাদাগাদি করে বাড়িতে গেছে। এতে মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি করোনা ভাইরাস ছড়ানোর শঙ্কা বেড়ে গেছে। ওই সময় সীমিত পরিসরে দূরপাল্লার বাস ও নৌযান চালু রাখা হলে মানুষকে এত গাদাগাদি করে গ্রামে ফিরতে হতো না।
এ প্রসঙ্গে দেশের জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল মানবকণ্ঠকে বলেন, লকডাউন নিয়ে আমাদের জাতীয় কারিগরি কমিটি যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছিল তা বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল সরকারের। কিন্তু তা হচ্ছে না। আমার দূরপাল্লার বাস বন্ধ রাখলাম ঠিকই কিন্তু আন্তঃজেলা বাস খুলে দিলাম। এতে করে তো কোনো উপকার হলো না। তবে একবারে হয়নি যে তা নয় কিছুটা উপকার হয়েছে। সেই উপকারের সামনে রেখে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে কীভাবে সবকিছু স্বাভাবিক করা যায় সে চিন্তা করতে হবে। খণ্ড খণ্ড করে না দেখে সবকিছু সম্মিলিতভাবে দেখতে হবে।
পল্লীকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জামান মানবকণ্ঠকে বলেন, করোনায় দেশের সার্বিক অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সবকিছু প্রায় থমকে গেছে। তাই করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের খামখেয়ালিপনা না করে একটি স্ট্রং ডিসিশন নিতে হবে। কোনো কোনো দেশ কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে করোনা নিয়ন্ত্রণ করে সবকিছু খুলে দিয়েছে। তাই আমাদেরও কঠোর স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে সবকিছু কিভাবে খুলে দেয়া যায় সেই চিন্তা করতে হবে।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ায় লকডাউনের শুরু থেকেই পুরো সময় ধরে বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এর সাথে সংশ্লিষ্টরা। টাকার অঙ্কে প্রতিদিন ৫০০ কোটি ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গণপরিবহনের সাথে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ জড়িত। এরমধ্যে চালক, হেল্পার, সুপারভাইজারসহ অন্যান্য স্টাফ দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন। অর্থাৎ কাজ করলে টাকা পান, কাজ না করলে টাকা পান না। আর লকডাউনে পরিবহন বন্ধ থাকায় কাজও বন্ধ। ফলে লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। ফলে অনেকের দিন কাটছে খেয়ে না খেয়ে।
মালিকরা বলছেন, গত বছরের লকডাউনে দুই মাসের অধিক সময় পরিবহন বন্ধ থাকায় যে ক্ষতি হয়েছে তা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এ বছরের লকডাউনে সেই ক্ষতি বেড়েছে কয়েকগুণ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, গত ১৪ তারিখ থেকে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বেশ বেগ পেতে হবে। তিনি বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে তো আমরা যেতে পারি না। তাই ক্ষতি হলেও আমরা তা মেনে নিয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা করোনার শুরু থেকেই চেষ্টা করেছি সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সবধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিবহন চালাতে। এখনও সব স্বাস্থ্যবিধি মেনেই চালাতে চাই। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে অবশেষে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে দূরপাল্লার বাস ও নৌযান চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামীকাল সোমবার থেকে একসিট খালি রেখে এবং কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে দূরাপাল্লার গণপরিবহন খুলে দেয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, মানুষের জীবন ও জীবিকা দুটোই সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে কাজ করছে সরকার। এ ক্ষেত্রে ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’-এর ওপর বেশি জোর দেয়া হবে। গণপরিবহন চালু হলে কতটা আসন ফাঁকা রাখা হবে, সে বিষয়টিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
নাম না প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক অতিরিক্ত সচিব বলেন, সোমবার থেকে সারা দেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আন্তঃজেলা বাস চলতে পারবে। তবে এসব বাসে অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়বে। প্রতি যাত্রার (ট্রিপ) শুরু এবং শেষে জীবাণুনাশক দিয়ে গাড়ি জীবাণুমুক্ত এবং পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও যাত্রীদের বাধ্যতামূলক মাস্ক পরিধান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
নৌযান চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক মানবকণ্ঠকে বলেন, এখনো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। সরকার যদি চায়, তবে যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নৌযান চালু করা হবে।
এদিকে রোববার থেকে দেশের সব রেস্টুরেন্ট পুরোপুরি খুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই রেস্টুরেন্ট চালু করতে চান তারা। না হলে থালা-বাটি নিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। শনিবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতটি। রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলা শহর মিলে হোটেল-রেস্তোরাঁর সংখ্যা ৬০ হাজার। হোটেল রেস্তোরাঁর সঙ্গে জড়িত ৩০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী। সব মিলিয়ে রেস্তোরাঁ খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষ প্রায় দুই কোটি। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার বিষয়টি মাথায় রেখে তাই আজ থেকে রেস্টুরেন্ট খুলে দেয়ার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে গত এক থেকে দেড় দশকে দেশের সার্বিক অর্থনীতির উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে পর্যটন খাত। এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা। গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট। গত এক দশকে পর্যটক সমাগমও বেড়েছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

