এমএনএ রিপোর্ট : নয় ঘন্টার সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলাদেশে এসেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি প্রভাবশালী দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কোন দেশে ঝটিকা সফর হলে তা অবশ্যই গুরুত্ব বহন করে বৈকি! সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশে তার এই প্রথম সফরে কূটনৈতিক মহলে বেশ আগ্রহ দেখা গেছে।
তবে কী কারণে কেরির সফর এতো তাৎপর্যপূর্ণ? কেরির সফরকে ঘিরে এরই মধ্যে বেশ আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। আগামী নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব, বৈশ্বিক জঙ্গিবাদ- এমন অনেক বিষয় উঠে আসছে বিশ্লেষেকদের মন্তব্যে।
এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, অফিসিয়ালি আমরা জানি, দু’দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালি করতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে তার এ সফর। নিরাপত্তা, অর্থনীতিসহ বেশ কিছু বিষয়ে দু’দেশ এক সঙ্গে কাজ করছে। এগুলোসহ বাংলাদেশের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ে সন্ত্রাস দমনে কাজ করার বিষয়টিও আলোচনায় প্রাধান্য পাবে।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন ফ্যাক্টর। বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার করতে পারলে এ অঞ্চলের নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে পারবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
কেরির সফর নিয়ে কথা হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারেক সামসুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, তার এ সফর ইতিবাচক। বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক। দু’দেশের সম্পর্ক ভালো হবে।
তিনি মনে করেন, কেরির এ সফরে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। তাছাড়া মানবাধিকার, যুদ্ধাপরাধ ইস্যূসহ যেসব বিষয়ে আগে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
প্রসঙ্গত, জন কেরি বিশেষ ফ্লাইটে জেনেভা থেকে আজ সোমবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে জন কেরি রাজধানীর একটি হোটেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। হোটেল থেকে তিনি সরাসরি ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে যান।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন। জন কেরি সেখানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটাই প্রথমবারের মতো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন। জন কেরি জাদুঘর থেকে দুপুর ১২টার দিকে বের হয়ে যান।
এরপর জন কেরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করবেন।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে জন কেরি ঢাকায় এসেছেন। সকাল-সন্ধ্যার এই সফরে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। সন্ধ্যায় তিনি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি যাবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুর ১টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় জন কেরির সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী মধ্যাহ্নভোজ করবেন। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। ওই আলোচনায় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অংশ নেবেন।
দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে বৈঠক হবে। এতে ১০ সদস্যের দুটি প্রতিনিধি দল অংশ নেবে। এখানে কেরি ও তার সফরসঙ্গী তিনজনকে বাংলাদেশের বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা চিত্রকর্ম উপহার দেয়া হবে।
মধ্যাহ্নভোজের মেন্যুতে অন্যান্য আইটেমের পাশাপাশি খাবারের টেবিলে দেয়া হবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পিঠা।
সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে যাওয়ায় এই সফরে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে সহযোগিতায় বিশেষ গুরুত্ব দেবেন জন কেরি। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট গতকাল রবিবার রাজধানীতে এক সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের বলেন, নিরাপত্তা সহযোগিতায় ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং কিছু ব্যাপারে সহযোগিতা চলছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে এই সফরে আলোচনা হবে।
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ সামর্থ্য অর্জন করেছে। নিজের দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সচেষ্ট আছে—এই বার্তা দেওয়া হবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আলোচনায় অংশ নিতে গতকাল ঢাকায় এসেছেন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম জিয়াউদ্দিন।
জন কেরির সফর উপলক্ষে বিমানবন্দরসহ রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স’ (এসএসএফ) সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে।
এর বাইরে নিরাপত্তা তদারকি করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অগ্রবর্তী দল ঢাকায় অবস্থান করছে।
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের পাশে থাকার বার্তা নিয়েই মূলত জন কেরি ৯ ঘণ্টার এ ঝটিকা সফর করছেন।
গত পাঁচ বছরে এটি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বিতীয় সফর। ২০১২ সালের ৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন দুই দিনের সফরে ঢাকায় এসেছিলেন। হিলারির ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারত্ব সংলাপ শুরুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
জন কেরির বাংলাদেশ সফরসূচি: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পর পদ্মায় দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন। ওই বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলা আড়াইটায় ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর সড়কের এডওয়ার্ড এম কেনেডি সেন্টারে (ইএমকে সেন্টার) যাবেন। ইএমকে সেন্টারে তিনি তরুণ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এরপর বিকাল ৩টায় তিনি মিরপুরে একটি পোশাক তৈরির কারখানা পরিদর্শন করবেন। সেখান থেকে তিনি দূতাবাসে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। বিকালে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও আলাদা বৈঠক করবেন জন কেরি। এরপর সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে বিশেষ ফ্লাইটে কেরি নয়াদিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানাবেন।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

