ঢাবিতে ছাত্রী নির্যাতন, ছাত্রলীগ নেত্রী বহিষ্কার
Posted by: News Desk
April 11, 2018
এমএনএ ক্যাম্পাস রিপোর্ট : কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবিতে) কবি সুফিয়া কামাল হলের এক ছাত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইফাত জাহান এশার বিরুদ্ধে।
গতকাল মঙ্গলবার গভীর রাতের এ ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। রাতভর চলে উত্তেজনা। ছাত্রী নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কবি সুফিয়া কামাল হলের সামনে এসে বিক্ষোভ করতে থাকেন।
এ ছাড়া ছাত্রী হল থেকে সাধারণ ছাত্রীরা বের হয়ে এসে বিক্ষোভ করেন। তারা ইফফাত জাহানকে বহিষ্কারের দাবিতে স্লোগান দেন। এমন উত্তেজক পরিস্থিতিতে হল শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি ইফফাত জাহানকে বিশ্ববিদ্যালয় ও সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়ছে। গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি।
হলের সাধারণ ছাত্রীরা অভিযোগ করেন, গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাতে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী মোর্শেদা আক্তারকে নিজের কক্ষে নিয়ে মারধর করেন ইফফাত জাহান। একপর্যায়ে মোর্শেদার পা কেটে দেয়।
হলের শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকদের বলেন, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত তিন শিক্ষার্থীকে গত সোমবার রাতে ডেকে নিয়ে নির্যাতন চালান এশা। তবে ভয়ে তারা ঘটনাটি চেপে গিয়েছিলেন।
গতকাল মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে মোর্শেদা আক্তার নামে উদ্ভিদ বিজ্ঞানের এক শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে আবারও নির্যাতন চালানোর পর ঘটনাটি প্রকাশ পেলে অন্য শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।
কয়েকশ ছাত্রী হল ছাত্রলীগের সভাপতি এশাকে তার কক্ষে অবরুদ্ধ করে স্লোগান দিতে থাকেন। খবর পেয়ে অন্যান্য হল থেকেও শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে সুফিয়া কামাল হলের সামনে জড়ো হন। তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন তারা। মোর্শেদার ব্যান্ডেজ বাঁধা রক্তাক্ত পায়ের ছবিও ফেসবুকে তুলে দেন ওই হলের কয়েকজন ছাত্রী।
এই পরিস্থিতিতে ছাত্রী নির্যাতনের খবর পেয়ে রাত পৌনে ১টার দিকে বিশ্বিবদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক গোলাম রব্বানী হলে ঢোকেন। রাত আড়াইটার দিকে প্রক্টর বেরিয়ে এসে নির্যাতনের অভিযোগে ছাত্রলীগ নেত্রী এশাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানান। নির্যাতিত শিক্ষার্থীর চিকিৎসার ব্যবস্থাও তিনি করেন।
পরে রাতেই ব্রিফিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান রাতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুঃখজনক। এটা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। আমি তাৎক্ষণিক প্রক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রক্টরের টিমকে ওখানে পাঠিয়েছি। হল প্রশাসনকে বলেছি, মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। তারপর আমি বিস্তারিত জেনেছি। আমি অবহিত হয়েছি—ফিলসফি বিভাগের একজন শিক্ষার্থী, ওর নাম হল ইফফাত জাহান এশা, ও নাকি আরেকটি মেয়েকে মেরেছে। এবং বেশ ভালোভাবেই… সোশাল মিডিয়াতে দেখলাম যে তার একটা ছবি এসেছে। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।
একজন ছাত্রীর ওপর আরেকজন ছাত্রী নির্মামভাবে যে আচরণটা করেছে, তার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই।… হল প্রশাসনকে বলেছি, তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হল। আগামীকাল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করব, তদন্ত কমিটিও ঠিক করে দেব। প্রকৃত কী ঘটনা ঘটেছিল সেটি যেন আসে, কারণ সকলের জন্য একটি শিক্ষা রাখতে চাই। কেউ যেন সীমা লঙ্ঘন না করে। আইনহীনতা, বিচারহীনতা চলতে পারে না। সে যেই হোক, বিচার হবে।
-

-
রাতে সুফিয়া কামাল হল প্রাঙ্গণে বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা। ছবি : ফেসবুক থেকে সংগৃহিত।
-

-
ছাত্রলীগ নেত্রী ইফফাত জাহান এশা। ছবি : ফেসবুক থেকে সংগৃহিত।
-

-
নির্যাতিত শিক্ষার্থীর এই ছবি ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে।
-

-
ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে কবি সুফিয়া কামাল হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইসরাত জাহান এশাকে বহিষ্কার করা হয়।
ইফাত জাহান এশাকে এর আগেও বহিষ্কার করা হয়েছিল এবং পুনরায় বহিষ্কারাদেশ প্রতাহ্যার করা হয়। এবারও কি সেরকম হবে কিনা সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ভিসি বলেন, ‘আমরা সজাগ থাকবো, সেরকম যাতে না হয়। রাজনৈতিক পরিচয় যাই থাকুক, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঘটনার পর মধ্যরাতেই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইফফাত জাহানকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে ইফফাত জাহানকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করা হবে।
ইফফাত জাহানকে বহিষ্কার করার খবর জানার পর হলের সামনে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীরা ভোররাত চারটার দিকে ফিরে যান।
আহত মোর্শেদা সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তার আত্মীয়ের বাসায় চলে যান। কবি সুফিয়া কামাল হলের সিনিয়র আবাসিক শিক্ষক শামীম বানু বলেন, ‘ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেখানে যাই। আহত শিক্ষার্থীকে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর একটি অ্যাম্বুলেন্সে তাকে স্বজনের সঙ্গে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ছাত্রীর সামান্য পা কেটে গেছে। তার আঘাত গুরুতর না। তবে এটা বড় অপরাধ। আমরা সেভাবেই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।’
মোর্শেদাকে দেওয়া চিকিৎসা সম্পর্কে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের ইমারজেন্সির মেডিক্যাল অফিসার ডা. গালিব বলেন, ‘মোর্শেদার পায়ের পেছনে ও সামনে কেটেছে। পেছনের কাটা একটু গভীর। ড্রেসিং করেছি, সেলাই লেগেছে।’
উল্লেখ্য, গত রবিবার রাতে পুলিশ আন্দোলনকারীদের শাহবাগ থেকে হটিয়ে দেওয়ার পর ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী তাদের উপর চড়াও হয়েছিলেন। রাতভর সংঘর্ষের মধ্যে গুলি ছোড়ারও অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
গতকাল মঙ্গলবার ছাত্রলীগের এক সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান বলেন, যতদিন আন্দোলনকারীরা ‘শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি’ ছিল, ততদিন ছাত্রলীগ তাদের বাধা দেয়নি।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এই আন্দোলনে ষড়যন্ত্র দেখলেও নিচের সারির নেতাদের অনেকে কোটা সংস্কারের আন্দোলনে যুক্ত। নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বিমত জানিয়ে কয়েকজন পদত্যাগও করেছেন।
বহিষ্কার ছাত্রলীগ নির্যাতন ছাত্রী ঢাবিতে নেত্রী 2018-04-11