Don't Miss
Home / আজকের সংবাদ / তক্ষক নিয়ে কোটি টাকার রহস্যময় গোলক ধাঁধা

তক্ষক নিয়ে কোটি টাকার রহস্যময় গোলক ধাঁধা

এমএনএ রিপোর্ট : তক্ষক নিয়ে কোটি টাকার রহস্যময় এক গোলক ধাঁধার ফাঁদে পা দিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাজারো মানুষ। এই তক্ষককে ঘিরে রয়েছে লাখ, কোটি টাকার গল্প। লোভ-লালসার বশবর্তী হয়ে নিজের সর্বস্বটুকু খোয়াচ্ছেন এসব সরল মনের মানুষ। মূলত প্রতারকরা এমন গল্পের ফাঁদ পেতে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ টাকা। প্রতারিতরা হচ্ছেন সর্বশান্ত। ধ্বংস হচ্ছে বিলুপ্ত প্রায় এই প্রজাতির প্রাণীটি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বৃহত্তর সিলেট ও দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন লাগোয়া জেলাতে তক্ষক পাওয়া যায়। এসব জেলায় তক্ষক নিয়ে রয়েছে নানা গল্প। নানা রহস্য। কিন্তু সেই রহস্য আজও কেউ উদঘাটন করতে পারেনি। বরং প্রতারকদের ফাঁদে পড়ে ‘রহস্যময়’ তক্ষকের পিছনে ছুটছে অনেকেই। প্রতারিত হয়ে সর্বশান্ত হচ্ছেন অনেকেই।
তাদেরই একজন মাইন উদ্দিন (ছদ্ম নাম)। তিনি গত ১০ বছর ধরে তক্ষকের পিছনে ছুটছেন। সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় তার। তার বাড়ি পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলায়।
কীভাবে তিনি এই প্রতারণার ফাঁদে পা দিলেন সেই গল্পই শোনা যাক তার বয়ানে—
মাইন উদ্দিন বলেন, ‘‘আমার পরিচিত মো. নোমান বেড়ানোর নাম করে ঢাকা থেকে আসেন। তিনি গল্পের ছলে বলেন, বিদেশ থেকে একটা পার্টি এসেছে বাংলাদেশে। এখান থেকে তক্ষক কিনবেন। ১৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের ২৫০ গ্রাম ওজনের একেকটি তক্ষকের জন্য তারা ১ কোটি টাকা করে দিবেন।’’
তিনি বলেন, ‘নোমান আমাকে ৫০ লাখ টাকা দেয়ার প্রস্তাব করেন। তারপর আমি গাঁটের টাকা খরচ করে তক্ষক শিকারে নেমে পড়ি। এর মধ্যে এক শ্রেণির প্রতারকও জুটে যায়। তাদের কাছ থেকে ৬ লাখ টাকায় একটি তক্ষক কিনে আর লাখ টাকা খরচ করে ঢাকায় আসার পর আমার মাথায় হাত।’
মাইন উদ্দিন বলেন, ‘বায়াররা তাকে জানান, ১১/১২ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের আনুমানিক এক দেড়শ গ্রাম ওজনের তক্ষককে সিজার করে লেজ বাড়িয়ে এবং লোহার গুলি বা মারবেল খাইয়ে ওজন বাড়ানো হয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘বায়ারের কথায় বিশ্বাস না হয়ে আমার সেই পরিচিত জনের মাধ্যমে তক্ষকটি কাটা হয়। দেখলাম ভেতরে ৬টি ছোট ও ভারি লোহার মারবেল। লেজও জোড়া দেয়া। কিন্তু এতটাই সুক্ষ্মভাবে করা যে ধরতেই পারিনি। পরে যাদের কাছ থেকে কিনছিলাম তাদের জানালে তারা আমাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।’
মাইন উদ্দিন বলেন, ‘‘আমার সাত লাখ টাকা শেষ। আমি ভেঙে পড়ি। তখন বায়ারের লোকজন আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, আপনি ১৫ ইঞ্চির এবং আড়াইশ গ্রাম পেলে কোটি টাকা পাবেন। কিন্তু তেমন না পেলেও যদি কাছাকাছি সাইজের পান তাহলে জোড়া দিবেন না। কিছু খাওয়াবেনও না। আমাদের খবর দিবেন। আমরা গিয়ে দেখে তবেই কিনবো।’’
কিন্তু আমি ২৫০ গ্রাম ওজন বা এর কাছাকাছি ওজন ও দৈর্ঘের তক্ষক এখনো পাইনি, যোগ করেন তিনি।
এই প্রতারক চক্রের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘কোটি টাকার গল্প শুনে অনেক অনভিজ্ঞ লোক টাকার লোভে এই ব্যবসায় নেমেছে। আমরা তাদের লোভের সুযোগ নিয়ে কিছু কামাই করেছি। আমাদের গ্রুপে ৮/১০ জন ছিলাম। আমি এখন এসব ছেড়ে দিয়েছি। আমরা অনেক খুঁজে দেখেছি এমন সাইজের তক্ষক পাওয়া যায়না।’’
তিনি বলেন, মাঝারি ১০০ গ্রাম বা তার আশেপাশের ওজনের ৯ থেকে ১১ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের তক্ষকের জন্য আমাদের ১০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতো। সেগুলো আমরা ৫০ হাজার থেকে ২/৩ লাখ টাকায়ও বিক্রি করেছি। কিন্তু কিভাবে যেনো থানা পুলিশ ও স্থানীয় গোয়েন্দা সদস্য ও কিছু দলীয় নেতারা জেনে যায়। তাদের ভাগ দিয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা একেকজন ১০/২০ হাজার টাকার বেশি পাইনি।
তিনি বলেন, ‘তক্ষকের পিছনে ঘুরতে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাছে-কানাছে ঘুরেছি। আমাদের গ্রুপের কিছু সদস্য মারও খেয়েছে। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ-জেএসএসকেও টাকা দিতে হয়েছে। ৫ বছর আগে এক পাহাড়ি বাড়িতে তক্ষক দেখতে গেলে অস্ত্র নিয়ে এসে আমাদের দুইজনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। পরে ১ লাখ টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনা হয়।’
ওই দু’জনের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, কোটি টাকায় তক্ষক কেনা একটা প্রতারণা। কোটি টাকার একটা ধোঁয়া তুলে কিছু মানুষ ফায়দা লুটেছে। আসলে কি কোনো কাজে লাগে এই তক্ষক? তা আমরা জানি না।
তবে কেউ বলেছেন, তক্ষক দিয়ে ক্যান্সারের ওষুধ বানানো হয়। কেউ বলেছেন এটা যৌন ক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধ বানাতে ব্যবহার করা হয়। আবার কেউ বলেছেন, যে বাড়িতে পূর্ণ বয়স্ক তক্ষক থাকে সে বাড়িতে বাজ পড়ে না। তাই বিদেশে অনেক ধনি পরিবার বাড়িতে এই তক্ষক লালন পালন করেন।
এ ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, তক্ষক এর ইংরেজি নাম Tokay gecko, বৈজ্ঞানিক নাম Gekko gecko, তক্ষক একটি সরিসৃপ জাতীয় নিশাচর প্রাণি। পিঠের দিক ধূসর, নীলচে-ধূসর বা নীলচে বেগুনি-ধূসর। সারা শরীরে থাকে লাল ও সাদাটে ধূসর ফোঁটা। পিঠের সাদাটে ফোঁটাগুলো পাশাপাশি ৭-৮টি সরু সারিতে বিন্যস্ত। পাহাড় জঙ্গলতো বটেই এক সময় আমাদের গ্রামের বাড়িগুলোতেও তক্ষক পর্যাপ্ত দেখা যেত। তক্ষক মূলত গাছের গর্তে বাস করে, পোকামাকড়, পাখির ডিম ইত্যাদি খেয়ে বাঁচে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ায় অনেক দেশেই প্রচুর তক্ষক রয়েছে। আমরা তক্ষকের মূল্যবান হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য পাইনি। কোটি টাকার গল্প করে পাচার চক্রটি প্রতারণা করছে বলেও মনে করেন তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকতা কাজি কামাল হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, এক সময়ে এই বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির তক্ষক পাওয়া যেত। কিন্তু পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য ও স্থানীয় উপজাতীদের শিকারের কারণে এখন তক্ষকের অনেক প্রজাতি হারিয়ে গেছে। তবে অন্যান্য জায়গার মত বান্দরবানে তল্লাশি পোস্ট থাকায় বন বিভাগসহ নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পাচাকারীরা বাইরে খুব একটা নিতে পারে না। তবে কৌশলে যে পাচার হচ্ছেনা তাও বলা যায় না।
তিনি বলেন, আমরা যতটুকু জানি বা শুনেছি বিশেষ করে হাঁসের পা এর মত দেখতে তক্ষকগুলো মূল্যবান হয়ে থাকে। এ ধরনের তক্ষক আমাদের দেশেও কম দেখা যায়। প্রথম দিকে হয়ত ভুল ধারণার কারণে পাচারকারীরা সবধরনের তক্ষক পাচার করতো। এখন সেটি কমেছে। তবে বন বিভাগ পাচার ঠেকাতে সক্রিয় আছে।
সুন্দরবন পূর্ব ‌বিভাগীয় বন কর্মকর্ত মো. মাহমুদুল হাসান এ গণমাধ্যম কর্মীকে বলেন, ‘আমাদের এখানে তক্ষক পাচারকারীরা সক্রিয়। কিন্তু তারা খুব একটা সফল হতে পারেনা। আমাদের নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারিতে ধরা পড়ে যায়।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিস্তারিত তথ্য পেতে হলে কয়েকদিন সময় দিতে হবে। এখন আমরা রাশ মেলা নিয়ে ব্যস্ত।
তিনি বলেন, তক্ষক নিয়ে কোটি টাকা, লাখ টাকার অনেক গল্প শোনা যায়। আসলে আমরা এর কোনো প্রমাণ পাইনি। এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও নেই। বরং আমাদের কাছে এসব প্রতারণা বলেই প্রতীয়মান হয়।
র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব-১) সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৭ আগস্ট এক অভিযানে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার জৈনাবাজার নগরহাওলা এলাকা থেকে ৪৮টি তক্ষক উদ্ধার করা হয়। এসময় আটক করা হয় ১০ জনকে। তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিচার করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও জরিমানা করা হয়। পরে তক্ষকগুলো গাজীপুর ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান অবমুক্ত করা হয়।
র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল সরোয়ার বিন কাশেম গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের কাছে এমন অভিযোগ এসেছিলো। আমরা যাদের ধরেছি তারাও আমাদের এমন গল্প শুনিয়েছেন। তক্ষক দিয়ে বিদেশে ওষুধ বানানো হয়, এর চামড়া দামি ইত্যাদি। তবে এর কোনো বৈজ্ঞিানিক প্রমাণ আমরা পাইনি।
তবে একটি রহস্য এখনো বের হয়নি। এই তক্ষক দিয়ে আসলে কি করা হয়? তক্ষক বিক্রি করে কে পেয়েছেন সেই হাজার কোটি টাকা। তথ্যসূত্র : পরিবর্তনডটকম
x

Check Also

সক্ষমতা

জেলা-উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে সরকারঃ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

এমএনএ জাতীয় ডেস্কঃ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় ...