এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছেন থেরেসা মে। বিবিসি জানাচ্ছে, থেরেসা মের পদত্যাগের সম্ভাবনা ‘আধাআধি’।
যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচনে ফলাফলে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ঝুলন্ত সংসদ হতে চলেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের ওপর পদত্যাগের চাপ বাড়ছে বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, তেরেসা মে হঠাৎ করে সাধারণ নির্বাচন দিয়ে আসন বাড়াতে গিয়ে উল্টো সংসদে দলের যত আসন ছিল এই নির্বাচনে আসন সংখ্যা তার চেয়েও কমেছে। তাতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন থেরেসা মে। বিপরীতে বিরোধী দল লেবার পার্টিকে করে দিয়েছেন আরও শক্তিশালী। এতে করে তেরেসা মেকে তার সিদ্ধান্তের জন্য লজ্জায় পড়তে হয়েছে।
ক্যামেরন লেবার দলের সঙ্গে এক শ আসনের যে ব্যবধান রেখে গিয়েছিলেন, থেরেসা তা অর্ধেকে নামিয়ে এনেছেন। সরকারে না গেলেও প্রত্যাশার চেয়ে বেশ ভালো করেছে লেবার পার্টি।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, টোরিরা (কনজারভেটিভ) ৩১৮টি আসন পাচ্ছে, লেবার ২৬১ এবং এসএনপি ৩৫ আসন পাচ্ছে। লেবারের ঝুলিতে যোগ হয়েছে ২৯টি নতুন আসন এবং কনজারভেটিভ ১৩টি আসন হারিয়েছে।
নিকোলা স্টারজেনের স্কটিশ ন্যাশানালিস্ট পার্টি, এসএনপি, খুবই খারাপ ফল করেছে। তারা ২২টি আসন হারিয়েছে। তাদের আসনগুলো গেছে টোরি, লেবার এবং লিবারেল ডেমোক্রাটদের কাছে।
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ভোটের ৪২ শতাংশ পেয়েছে কনজারভেটিভরা, লেবার ৪০ শতাংশ, লিবারেল ডেমোক্রাট ৭ শতাংশ এবং গ্রিন পার্টি পেয়েছে ২ শতাংশ ভোট।
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ভোট দিয়েছে ৬৮ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার, ২০১৫ সালের নির্বাচনের তুলনায় এই হার ২ শতাংশ বেশি। তবে দেশের অনেক জায়গায় দেখা গেছে রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে শুধু বড় দুটি দলকে কেন্দ্র করে। কনজারভেটিভ আর লেবার যত ভোট পেয়েছে, ১৯৯০এর পর শুধু দুটো দলেরএত ভোট পাওয়ার এটা রেকর্ড।

ইউনাইটেড কিংডম ইন্ডিপেনডেন্স পাটি (ইউকিপ) পার্টি হারিয়েছে প্রচুর আসন, তবে যেমনটা মনে করা হচ্ছিল তাদের ভোটগুলো পাবে শুধু টোরিরা, সেটা হয়নি। টোরিদের পাশাপাশি তাদের ভোট পেয়েছে লেবারও।
যুক্তরাজ্যের পরবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। ৩৩০ আসন নিয়ে সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল কনজারভেটিভ পার্টির। নির্বাচনের কোনো প্রয়োজন না থাকলেও প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ইচ্ছামাফিক ব্রেক্সিট বাস্তবায়নে (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ) নিজের ক্ষমতাকে আরও নিরঙ্কুশ করতে হুট করে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেন। মে শতাধিক আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরবেন বলে মনে করা হচ্ছিলে। কিন্তু নতুন করে আসন জেতা দূরের কথা, উল্টো তিনি ১২টি আসন হারিয়েছেন। যে কারণে ঝুলে গেছে দলটির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। এককভাবে সরকার গঠন করতে প্রয়োজন ৩২৬ আসন।
ঘোষিত ৬৪৭টি আসনের ফলাফলে কনজারভেটিভ পেয়েছে ৩১৬ আসন। লেবার দল পেয়েছে ২৬১ আসন। স্কটিশ জাতীয়তাবাদী দল ৩৫টি ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটস দল ১২টি আসন পেয়েছেন। গ্রিন পার্টি ১টি ও অন্যান্য দল পেয়েছে ২২টি আসন।
কনজারভেটিভ দল থেকেই দাবি উঠেছে, থেরেসা যেন নেতৃত্ব থেকে সরে যান। দলটির নেতারা গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে এখনো কিছু না বললেও মের পদত্যাগের পক্ষে অভিমত তুলে ধরছেন। দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা গোপন বৈঠকে বসেছেন বলেও গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়।
কনজারভেটিভ দলীয় সাবেক মন্ত্রী অ্যানা সোবরি অবশ্য প্রকাশ্যেই বলেছেন, থেরেসা মে ‘শক্তিশালী ও স্থিতিশীল’ নেতৃত্বের জন্য এই নির্বাচন দিয়েছেন। কিন্তু তিনি তা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই তাঁর সরে যাওয়া উচিত।
লেবার দলের নেতা জেরেমি করবিন তাঁর ইজলিংটন নর্থ আসনে বিজয়ী ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী থেরেসা তাঁর নেতৃত্ব শক্তিশালী করতে জনরায় চেয়েছেন। কিন্তু আসন হারিয়েছেন। ভোট হারিয়েছেন। সমর্থন হারিয়েছেন। তিনি যে জনরায় পেয়েছেন, তা তাঁর সরে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।
জনগণের প্রত্যাশিত সরকার গঠনে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য থেরেসার বিদায় নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন করবিন।
অর্জিত ফলাফলে সন্তোষ প্রকাশ করে করবিন বলেন, কৃচ্ছ্রসাধনের রাজনীতি ব্যর্থ হয়েছে। রাজনীতি বদলে গেছে। এটা আর পুরোনো অবস্থায় ফিরে যাবে না।
কনজারভেটিভ দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঝুলন্ত সংসদ হলে তেরেসা মে আগে সরকার গঠনের সুযোগ পাবেন।
যুক্তরাজ্যের সাবেক একজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা লর্ড ওডনেল বিবিসিকে বলেছেন প্রধানমন্ত্রীকে ‘আপাতত’ তার পদে থাকতে
হবে – সেটা তার দায়িত্ব। তিনি তাকে পরামর্শ দেবেন আজ শুক্রবার যেন তিনি রানির সঙ্গে দেখা করে তিনি কী করতে চান তা ব্যাখ্যা করেন।
তবে ব্রিটেনের ফিক্সড টার্ম পার্লামেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী যুক্তরাজ্যে এই গ্রীষ্মের শেষের দিকে আরেকটা নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্রেক্সিট নিয়ে যে আলোচনা হতে যাচ্ছে এই ফলাফল তার ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তেরেসা মে’র রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন।
একজন কনজারভেটিভ মন্ত্রী বিবিসির বিশ্লেষক লরা কুয়েন্সবার্গকে বলেন, ‘এই ফলাফলের পর কীভাবে ক্ষমতায় থাকা তেরেসা মে’র জন্য কঠিন হবে।’
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য কোনো দলকে ৩২৬টি আসনে জিততে হবে। তবে তারা ৩১৮টি আসন পেলে এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির সমর্থন পেলে তারা সরকার গঠনের জন্য রানির অনুমতি পাবে।
ব্রেক্সিট বিরোধী কনজারভেটিভ এমপি অ্যানা সোব্রি বলেন, ”খুবই খারাপ নির্বাচন” হয়েছে এবং ‘তেরেসা মের উচিত এখন তিনি কী করবেন তা ভাবা’।
তবে ব্রেক্সিটপন্থি এমপি স্টিভ বেকার বলেন, দলের উচিত তেরেসা মেকে সমর্থন করা যাতে ‘স্থিতিশীলতা বজায় থাকে’।
নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে জেতার পর তেরেসা মে বলেন, পুরো চিত্র এখনও পরিষ্কার হয়নি, এবং ‘এখন দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্থিতিশীলতা বজায় রাখা’।
‘যদি পূর্বাভাস সঠিক হয় এবং কনজারভেটিভ পার্টি সবচেয়ে বেশি আসন পায় এবং সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে থাকে, তাহলে আমাদের দায়িত্ব হবে একটা স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা এবং আমরা সেটাই করব,’ তিনি বলেন।
বেসরকারি এক টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবর্ন বলেন, ‘তেরেসা মে সম্ভবত ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বল্প সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।’ অসবর্নকে তেরেসা মে গত বছর বরখাস্ত করেন।
ডিইউপিরএম পি সাইমন হ্যামিল্টন বলেন, তার দলের ভোট টোরিদের সরকার গঠনের জন্য ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ’ এবং ‘ইইউ ছাড়ার সময় উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্য ভালো সুযোগসুবিধা চাওয়ার ব্যাপারে তারা দরকষকষি করবেন।’
কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ এমপি তাদের আসন হারিয়েছেন। যেমন এসএনপির অ্যালেক্স স্যামন্ড হেরে গেছেন এক টোরি প্রার্থীর কাছে এবং লিবডেম নেতা ও সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী নিক ক্লেগ পরাজিত হয়েছেন একজন লেবার প্রার্থীর কাছে।
কনজারভেটিভ দল এককভাবে সরকার গঠন করতে না পারায় ব্রেক্সিট সমঝোতার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হলো। কেননা একমাত্র নর্দান আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি (ডিইউপি) সরকার গঠনে কনজারভেটিভ দলকে সমর্থন দিতে রাজি। কিন্তু ওই দল ব্রেক্সিটের ঘোরবিরোধী। ফলে ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন প্রশ্নে দুই দলের একমত হওয়ার সমীকরণ অত্যন্ত জটিল।
মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এটি যুক্তরাজ্যে তৃতীয় জাতীয় নির্বাচন। ২০১৫ সালে ডেভিড ক্যামেরনের নেতৃত্বে কনজারভেটিভ দল ৩৩০টি আসন পেয়ে এককভাবে ক্ষমতায় ফেরে। এরপর ২০১৬ সালের জুনে ব্রেক্সিট প্রশ্নে অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। ওই গণভোটে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইইউতে থাকার পক্ষে ছিলেন। জনগণ বিচ্ছেদের পক্ষে রায় দিলে ক্যামেরন পরাজয় মেনে পদত্যাগ করেন। যার ফলে প্রধানমন্ত্রী হন থেরেসা মে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে থেরেসা মের ইচ্ছায় এই মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়। আর এই নির্বাচনে প্রত্যাশিত জয় না পাওয়ায় থেরেসার বিদায় অনেকটা নিশ্চিত। ব্রেক্সিট ইস্যু যুক্তরাজ্যের আরেকজন প্রধানমন্ত্রীর বিদায় ঘণ্টা বাজাচ্ছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

