এমএনএ বিনোদন ডেস্ক : কেয়ারলেস হুইসপার, লাস্ট ক্রিসমাস, ওয়েক মি আপ বিফোর ইউ গো-গো এবং দি এজ অফ হেভেনের মত সাড়া জাগানো গানের শিল্পী ব্রিটিশ পপ তারকা জর্জ মাইকেল গতকাল রবিবার বড়দিনের রাতে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ারে নিজের বাড়িতে মারা গেছেন।
তার মুখপাত্রের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, গতকাল রবিবার রাতে ৫৩ বছর বয়সে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ারে নিজের বাড়িতে এই শিল্পী, গীতিকার ও সংগীত প্রযোজকের মৃত্যু হয়।
টেমস ভ্যালি পুলিশ জানিয়েছে, জর্জ মাইকেলের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নয়। তবে সন্দেহজনক কিছু তারা দেখছে না।
স্কুলের বন্ধু অ্যান্ড্রু রিজলিকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৮১ সালে জর্জ মাইকেল গড়ে তোলেন ব্যান্ড দল ওয়্যাম! ১৯৮৬ সাল থেকে একক পারফরম্যান্সে যে ক্যারিয়ার তিনি গড়ে তোলেন, তাতে তিনি বিশ্বের অন্যতম ব্যবসা সফল সংগীত শিল্পীতে পরিণত হন।
ওয়েক মি আপ বিফোর ইউ গো-গো, কেয়ারলেস হুইসপার, লাস্ট ক্রিসমাস এবং দি এজ অফ হেভেনের মত গানগুলো জর্জ মাইকেলকে বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
বিলবোর্ডের সর্বকালের সেরা ১০০ গায়কের তালিকায় জর্জ মাইকেল আছেন ৪০ নম্বরে। তিন দশকের সংগীত জীবনে আটবার তিনি জিতেছেন গ্র্যামি। তার অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে ১০ কোটির বেশি কপি।
তার মুখপাত্রের বিবৃতিতে বলা হয়, “ক্রিসমাসের মধ্যে আমাদের প্রিয় সন্তান, ভাই ও বন্ধু জর্জের শান্তিপূর্ণ মৃত্যু হয়েছে তার বাড়িতে।”
জর্জ মাইকেলের মৃত্যুতে শোকাহত এলটন জন বলেছেন, “আমি আমার একজন প্রিয় বন্ধুকে হারালাম, যে ছিল একজন মহৎ, মমতাময় মানুষ, একজন মেধাবী শিল্পী।”
গ্রিস থেকে যুক্তরাজ্যে অভিবাসী হওয়া এক দম্পতির সন্তান জর্জ মাইকেলের পারিবারিক নাম জিওরগোস কিরিয়াকোস পানাইয়োতু। ১৯৬৩ সালের ২৫ জুন লন্ডনে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর সংগীত জীবনের শুরুটা হয়েছিল পাতাল রেলে গিটারের সঙ্গে গান গেয়ে।
তবে অ্যান্ড্রু রিজলিকে সঙ্গে নিয়ে ওয়্যাম! শুরুর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ হওয়ার আগেই ১৯৮২ সালে ইয়ং গানস (গো ফর ইট) গানটি তাদের খ্যাতির পথে তুলে দেয়। এরপর ওয়্যাম র্যাপ অ্যালবামটি লন্ডনের বাজারে সাড়া ফেলে দেয়। ১৯৮৪ সালে ‘মেইক ইট বিগ’ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও দারুণ সাফল্য পায়।
জর্জ মাইকেল ওয়্যামের সেই সাফল্যকে বর্ণনা করে গেছেন এভাবে- “অ্যন্ড্রুকে ছাড়া আমি কোনোভাবেই এটা পারতাম না। আমি আর কারও কথা ভাবতে পারি না যে এতোটা নিখুঁতভাবে আমাদের এই যৌথ প্রয়াসকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে পারত, পুরোপুরি দ্বৈত পরিবেশনা হয়েও যা ছিল একান্তই আমার।”
আর জর্জের মৃত্যুর পর এক টুইটে রিজলি বলেছেন, প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুতে তার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে।
ওয়্যামের টিনএজ শ্রোতাদের সীমানা ছাড়িয়ে নিজের সংগীত নিরীক্ষা আরও এগিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল জর্জের। ১৯৮৬ সালে ভেঙে যায় ওয়্যাম।
এরপর একক অভিযাত্রায় গানের গলার সঙ্গে মঞ্চের পারফরমেন্স মিলিয়ে সুদর্শন জর্জ মাইকেল ব্রিটেনের কনসার্ট সার্কিটের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পীদের একজনে পরিণত হন। টিন আইডল থেকে পরিণত হন সুপারস্টারে।
অবশ্য এই সাফল্যের পেছনে জর্জ মাইকেলের গানের কথায় যৌন উসকানির ভূমিকার কথাও অনেকে বলেন। তার গাওয়া ‘আই ওয়ান্ট ইওর সেক্স’ ব্রিটিশ রেডিও স্টেশনগুলোতে দিনের বেলায় প্রচার নিষিদ্ধ করা হলেও তাতে গানটির ‘হিট’ হওয়া আটকায়নি।
এর পরের পাঁচ বছরে জর্জ মাইকেলের ‘ফেইথ’, ‘ফাদার ফিগার’, ‘ওয়ান মোর ট্রাই’, ‘প্রেইং ফর টাইম’ এবং ‘আই নিউ ইউ অয়্যার ওয়েটিং ফর মি’ যুক্তরাষ্ট্রের টপ চার্টের শীর্ষে স্থান করে নেয়।
খ্যাতির পাশাপাশি ভিন্ন কারণেও তাকে সংবাদ শিরোনামে আসতে হয়েছে। ২০০৬ সালে তার বিরুদ্ধে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ২০০৮ সালে তার কাছে পাওয়া যায় কোকেইন। গাড়ি নিয়ে এক দোকানে ঢুকে পড়ায় ২০১০ সালে আট সপ্তাহ জেলেও কাটাতে হয় জর্জ মাইকেলকে।
১৯৮৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি পাবলিক টয়লেট থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর নিজেকে সমকামী ঘোষণা করেন তখনকার ৩৪ বছর বয়সী জর্জ মাইকেল।
মার্গারেট থ্যাচার যখন যুক্তরাজ্যের ক্ষমতায়, জর্জ মাইকেল তখন ভোট দিয়েছিলেন বিরোধী দলে থাকা লেবার পার্টিকে। কিন্তু টনি ব্লেয়ার ২০০৩ সালে জর্জ বুশের ইরাক অভিযানে সমর্থন দিলে তার সমালোচনা করেছিলেন তিনি।
লেবার পার্টির বর্তমান নেতা জেরেমি করবিন এই পপ তারকাকে বর্ণনা করেছেন একজন অনন্য শিল্পী হিসেবে, যিনি সমকামী ও শ্রমিক অধিকারের জন্য সোচ্চার ছিলেন।
আর অভিনেতা ও সমকামী অধিকারকর্মী স্টার ট্রেক জর্জ মাইকেলকে সম্পর্কে বলেছেন, “তারাদের সঙ্গে শান্তিতে ঘুমাও জর্জ মাইকেল, অবশেষে তুমি মুক্তি খুঁজে পেয়েছ। এটা ছিল তোমার শেষ ক্রিসমাস, আমরা তোমাকে মিস করব।”
জীবন বৃত্তান্ত
জর্জ মাইকেল: ১৯৬৩-২০১৬

নিজের নামে চলচ্চিত্র ‘জর্জ মাইকেল- এ ডিফরেন্ট স্টোরি’র সংবাদ সম্মেলন শেষে জর্জ মাইকেল। ২০০৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি, বার্লিনের ছবি।

২০১০ সালের ২৪ অগাস্ট পুলিশি পাহারায় লন্ডনের আদালতে জর্জ মাইকেল; নেশাগ্রস্ত অবস্থায় উত্তর লন্ডনের একটি দোকানে গাড়ি উঠিয়ে দেওয়ার ওই ঘটনায় তার ৮ সপ্তাহের কারাদণ্ড হয়।

২০০৫ সালের ২ জুলাই, লন্ডনের হাইড পার্কে লাইভ এইট কনসার্টে পল ম্যাকার্টনির সঙ্গে পরিবেশনায় জর্জ মাইকেল।

ইতালিয় গায়ক লুসিয়ানো পাভারোত্তির সঙ্গে মদেনা শহরে ২০০০ সালের ৬ জুন ‘পাভারোত্তি অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ কনসার্টে জর্জ মাইকেল।

১৯৯৫ সালের ২৩ নভেম্বর জেনিথ কনসার্ট হলে এমটিভি ইউরোপের পুরস্কার বিতরণে জর্জ মাইকেল। পাশে ফরাসি ডিজাইনার আনেস বি তুলে ধরেছেন পরিবেশবাদী দল গ্রিনপিসের দেওয়া ‘ফ্রি ইউর মাইন্ড’ পুরস্কার।

এইডস দিবসে লন্ডনের ওয়েম্বলি অ্যারেনায় ‘কনসার্ট ফর হোপ’ এর আগে প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে সামনে জর্জ মাইকেল, তার দুপাশে কানাডার শিল্পী কে ডি ল্যাং ও ব্রিটিশ শিল্পী মিক হাকনল।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক












