বাচ্চু পরিবারের ব্যাংক লেনদেনের তথ্য চেয়েছে দুদক
Posted by: News Desk
December 25, 2017
এমএনএ অর্থনীতি রিপোর্ট : বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক লেনদেনের সব নথিপত্র চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক।
গতকাল রবিবার বিকেলে দুদক উপ পরিচালক শামসুল আলমের সই করা চিঠিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মহাব্যবস্থাপকের কাছে পাঠানো হয়। দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে এই চাহিদাপত্র পাঠানো হয় বলে দুদকের সূত্র মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ) কে নিশ্চিত করেছে।
দুদকের এই চাহিদাপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংক থেকে আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করে দুদককে দেবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পাঠানো চিঠিতে দুদক বলেছে, বাচ্চুসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের অ্যাকাউন্টে বেসিক ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত অর্থ তাদের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে দুদকের কাছে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংদেশ ব্যাংক থেকে ওইসব তথ্য সংগ্রহ করে অভিযোগটি যাচাই করা হবে।
দুদকের চিঠিতে বাচ্চু ছাড়াও তাঁর স্ত্রী, দুই সন্তানসহ পরিবারের দশজন সদস্যের লেনদেন–সংক্রান্ত তথ্য এবং তাঁর ভাই শেখ শাহরিয়ার পান্নার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ক্রাউন প্রোপার্টিজ, বিএম কম্পিউটার্স এবং ইডেন ফিসারিজ লিমিটেডের আর্থিক লেনদেনের তথ্য চেয়েছে দুদক।
বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে ৪ ও ৬ ডিসেম্বর জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। এর আগে দুদক বেসিক ব্যাংকের সাবেক ১০ জন পরিচালককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
সূত্র জানায়, বেসিক ব্যাংকে বাচ্চুর ঋন জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত করছে দুদকের একটি বিশেষ টিম। একই সঙ্গে উপ পরিচালক শামসুল আলমকে তার নামে-বেনামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগটি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বাচ্চু ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবে লেনদেনের তথ্য চাওয়া হলো।
দুদক সূত্র জানায়, বাচ্চু চেয়ারম্যান থাকাকালে স্ত্রী শেখ শিরিন আখতার, ছেলে শেখ সাবিদ হাই অনিক ও মেয়ে শেখ রাফা হাইর নামে খোলা হয়েছিল ইডেন ফিশারিজ লিমিটেড নামের একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে খোলা হিসাবে মাত্র ১১ মাসেই জমা করা হয় ১৩ কোটিরও বেশি টাকা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ঋণের টাকা সরাসরি জমা হয়েছে বাচ্চু ও তার ভাই পান্নার ব্যাংক হিসাবে। ২০১২ ও ২০১৩ সালে কয়েক মাসের ব্যবধানে দুইজনের ব্যাংক হিসাবে ৩০ কোটির বেশি টাকা স্থানান্তরের তথ্যও রয়েছে দুদকের কাছে।
ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকটিরে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গত ৪ ও ৫ ডিসেম্বর বাচ্চুকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা। এরপর গত ১৭ ডসেম্বর তাকে তৃতীয়বারে মতো ডাকা হলে অসুস্থ্যতার কারণ উল্লেখ করে ৩০ দিনের সময় চেয়েছেন। তার সময় চাওয়ার আবেদনও নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। শিগগির তাবে আবারও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হবে।
২০১৫ সালের ২১-২৩ সেপ্টেম্বর ব্যাংকের ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের দায়ের করা ৫৬ মামলায় বাচ্চু ও পর্ষদের কোন সদস্যকেই আসামি করা হয়নি। এবার তদন্ত পর্যায়ে তাদের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী গত ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাচ্চুর দুই মেয়াদে ব্যাংকের সাড়ে ৪ হাজার কোটি লোপাট হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ওই ৫৬টি মামলা করা হয়। বাকি ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ৩৪ লাখ ৫ হাজার ৬৫৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের কয়েক দফা পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক বাচ্চুকে জিজ্ঞাসাবাদে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। আবদুল হাই বাচ্চুসহ পর্ষদের ১১ জনকে পর্যায়ক্রমে তলব করা হয়।
আবদুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন পর্ষদ ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত মাত্র ১১ মাসে নজিরবিহীন অনিয়মের মাধ্যমে ৩ হাজার ৪৯৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ঋণের নামে বিভিন্নজনকে দিয়ে দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক তখন তদন্ত করে বলেছিল, ‘৪০টি দেশীয় তফসিলি ব্যাংকের কোনোটির ক্ষেত্রেই পর্ষদ কর্তৃক এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় না। এই ঋণ আদায়ের সম্ভাবনাও কম।’
বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে ২০১৫ সালের শেষ দিকে রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও গুলশান থানায় ১২০ জনকে আসামি করে ৫৬টি মামলা করে দুদক। এসব মামলায় বেসিক ব্যাংকের ২৭ কর্মকর্তা, ১১ জরিপকারী ও ৮২ ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের মালিককে আসামি করা হয়। তবে কোনো মামলাতেই আবদুল হাই বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি। এ নিয়ে জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞ এবং সর্বশেষ আদালত পর্যন্ত সমালোচনা করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫৩ শতাংশ (৭ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা), যা যেকোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হারের চেয়ে বেশি।
দুদক ব্যাংক তথ্য লেনদেনের চেয়েছে পরিবারের বাচ্চু 2017-12-25