
এমএনএ ডেস্ক রিপোর্ট : আজ ১৯ জুন (রবিবার) বিশ্ব বাবা দিবস। বাবার জন্য উৎসর্গিত একটি দিন। প্রতিবছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্ববাসী বাবা দিবস পালন করে।
বাবা ভরসা ও ছায়ার নাম। পরম নির্ভরতার নাম। সন্তানের জন্য কী-ই না করেন তিনি!
আজ বিশ্ব বাবা দিবস। ভাষাভেদে শব্দ আর স্থানভেদে বদলায় উচ্চারণ, তবে বদলায় না রক্তের টান। দেশ থেকে দেশে কিংবা সময় থেকে সময়ে একই মমতায় চিরন্তন পিতা-সন্তানের বন্ধন।
‘বাবা, তোমার রাজ্য ছাড়া আমার জন্য আর কোনো সিংহাসন নেই। বাবা, তুমি ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নেই, যে আমাকে রাজকুমারীর মতো দেখে। তুমি ছাড়া আমার হাতের পাতায় কেউ চুমু খায়নি গো বাবা। তোমার তো কোনো রয়েল কিংডম নেই। কিন্তু তোমার রাজকীয় এক হৃদয় রয়েছে।
যার জন্য আমি অনুভব করি – আমার জীবনে ভালোবাসার রাজকীয় গল্প রয়েছে, আমার নির্ভরতার সোনার সিংহাসন রয়েছে। আরও রয়েছে সম্মানের মুকুট। আমি তো রাজার মেয়ে, তাই না বাবা?’
বিয়ের পর বরের সঙ্গে দূরদেশে পাড়ি দিয়ে বাবাকে এমনই একটি মেইল করেছিলো মোনামী। দৃঢ় ব্যক্তিত্ব অার নরম চিত্তের বাবা নামের এ মানুষটির বুকেই তো অনায়াসে লুটোপুটি খাওয়া যায়। আর কোথায় মেলে এমন উদার মনপ্রাঙ্গণ?
‘কাটে না সময় যখন আর কিছুতে/বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না/জানলার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা/মনে হয় বাবার মতো কেউ বলে না/আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়…।’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদারের গাওয়া এই গানটি সন্তানদের এক অসীম আবেগে জড়িয়ে দেয়।

প্রতিথযশা কণ্ঠশিল্পী জেমসের কালজয়ী এ গানের প্রতিটি অক্ষরে অটুট গাঁথুনিতে জড়িয়ে আছে বাবার প্রতি সন্তানের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং বাবার ভালোবাসা বঞ্চিত চিরন্তন আকাক্ষার প্রতিচ্ছবি।
বাবা মানে একটু শাসন, অনেক ভালোবাসা। বাবা মানে একটু কঠিন, মাথার ওপর ছায়া। বাবা মানে নির্ভরতার আকাশ, আর একরাশ নিরাপত্তা।
হ্যাঁ, বাবারা এমনি হন। রাগ, শাসন আর রাশভারী চেহারার পেছনে এ মানুষটির যে কোমল হৃদয় তা মাতৃ হৃদয়ের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।
একজন বাবার শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হচ্ছে তার সন্তান। বাবার প্রতি সব সন্তানের মনে থাকে গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগ। কিন্তু পরিবারের পরিবেশগত কারণে ক্ষেত্রবিশেষ এই শ্রদ্ধা কখনো পায় না পূর্ণ মর্যাদা।
বাবা আমাদের যতটুকু শাসন করেন তার চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসেন। মাঝে মধ্যে বাবার শাসনে আমরা বিরক্ত হই ঠিকই, কিন্তু চোখ বন্ধ করে শুধু এক মুহুর্তের জন্য ভাবুন মাথার ওপর বাবা নামের ছায়াটি আর নেই! দেখবেন মাথার দূরের ওই আকাশকে মনে হবে ওটা আপনার মাথার ওপরেই রয়েছে।

মা’ এর মতো ‘বাবা’ও ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ এর ব্যাপকতা বিশাল। ডাকটার মাঝেই লুকিয়ে থাকে কী গভীর ভালবাসা, নিরাপত্তা, নির্ভরতা। সাহিত্যে, গীত-আনন্দ ও লোককথা-শিল্পকর্মে বাবা স্থান করে নিয়েছেন এক দায়িত্বশীল স্নেহময় পুরুষ হিসেবে। সন্তানের দুঃসময়ে বাবা ডেকে নেন তাকে। বুকে চেপে রাখেন। ঘুচিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন সব কষ্ট। বাবার সাথে সন্তানের সম্পর্ক বন্ধুত্বেরও।
শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যে শব্দগুলো সবার আগে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে তার অন্যতম হচ্ছে `বাবা`। এ যেন সন্তানের কাছে চিরন্তন আস্থার প্রতীক। কোনো শিশু যখন এই শব্দ উচ্চারণ করতে শেখে তখন বাবার মন পুলকে ভরে যায়। বাবা বলে ডাকতে পারাতে বাবার হাস্যোজ্জ্বল অনুভূতি যেন সেই অবুঝ শিশুর হৃদয়কে মুহুর্তেই আন্দোলিত করে তোলে।
বাবার প্রতি সন্তানের সেই চিরন্তন ভালোবাসার প্রকাশ প্রতিদিনই ঘটে। তারপরও পৃথিবীর মানুষ বছরের একটা দিনকে বাবার জন্য রেখে দিতে চায়। যেমনটা মায়ের জন্য করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাবা দিবসের প্রচলন। সন্তানের কাছে বাবা পথপ্রদর্শক ও বন্ধুর মতে। অনেকেই বাবাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। অনেক দেশে কার্ড উপহার দেওয়া হয়। অনেকেই বাবাকে নিয়ে বাইরে খেতে যায়
নিয়ে যায় সিনেমা দেখতে, উপহার দেয় প্রয়োজনীয় সামগ্রী। যাদের বাবা বেঁচে নেই, তাঁরা হয়তো আকাশে তাকিয়ে অলক্ষ্যে বাবার স্মৃতি হাতড়ায়।
বাবা, সে তো বাবাই। যার কারণে এই পৃথিবীর রং, রূপ ও আলোর দর্শন। সেই বাবা শব্দটির সঙ্গেই অপার স্নেহ আর মমতার মিশেলে এক দৃঢ় বন্ধনে জড়িয়ে থাকি আমরা। একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে প্রিয় এবং সর্বাধিকবার উচ্চারণ করতে হয় যে শব্দগুলো তার মধ্যে `বাবা` অন্যতম।
নতুন প্রজন্মের কাছে মা দিবস-বাবা দিবসের ধারণাগুলো দিন দিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। গত শতাব্দীর প্রথমদিকে বাবা দিবস পালন শুরু হয়। আসলে মায়েদের পাশাপাশি বাবারাও যে তাদের সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল- এটা বোঝানোর জন্যই এ দিবস পালন শুরু।
যদিও আগের দিনে বাবার সাথে সন্তানের সম্পর্ক ছিল খানিকটা দূরত্ব, খানিকটা সঙ্কোচ ও খানিকটা ভীতি মেশানো শ্রদ্ধা। তবে সেই অবস্থা এখন আর নেই বললেই চলে। এখনকার সময়ে অনেক বাবাই সন্তানদের বন্ধুর মতো, একদম কাছের মানুষ। স্নেহশীল। কর্তব্যপরায়ণ।
ডাক যাই হোক না কেন, রক্তের সম্পর্ক বদলায় না। বদলায় না এই ডাকের আবেগও। এই ডাকের মধ্যেই জড়িয়ে থাকে পৃথিবীর সব আবেগ ও ভালোবাসা।
আসুন এই ‘বাবা দিবসে’ আমারা সবাই বাবাকে বলি, ‘বাবা, খুব ভালোবাসি তোমাকে, যেভাবে পাশে আছো সেভাবেই থেকো চিরদিন’।
আর যার বাবা বেঁচে নেই তারাও একবার হলেও ভাবুন বাবাকে। বাবার প্রতি এত ভালোবাসা কিভাবে প্রদর্শন করব? কাকে সেই প্রিয় ‘বাবা’ বলে ডাকবে? অগণিত ভাগ্যবিড়ম্বিতের এ আক্ষেপ অন্তরের, এই জ্বালা চিরকালের।
জীবন চিরায়ত বহমান। সব হারানো কিংবা শোক-তাপের ঊর্ধ্বেও জীবন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এ সত্যটাই চিরন্তন। ভালোবাসার বহতার কথা বলেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি তার বাবার শেষ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রার্থনায় বলেছিলেন, ‘বাবা আলোকের ন্যায়, সমীরণের ন্যায়, তাহা শিশুকাল হইতে আমাদিগকে নিয়ত রা করিয়াছে, কিন্তু তাহার মূল্য কেহ কখনো চাহে নাই!’
বাবা দিবসের সূচনা হয়েছিলো গ্রেস গোল্ডেন ক্লেটন নামের এক নারীর হাত ধরে। তিনিই প্রথম দিনটি পালনের জন্য আবেদন জানান।

ক্লেটনের মাথায় ধারণাটি আসে ১৯০৭ সালে। সে বছর ডিসেম্বরে ভার্জিনিয়ার মোনোংয়াতে ভয়াবহ খনি বিস্ফোরণে প্রাণ হারান সাড়ে তিনশোর বেশি পুরুষ। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন সন্তানের বাবা। ফলে প্রায় এক হাজার শিশু বাবা হারায়। এসব শিশুর বেদনা পশ্চিম ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমন্টবাসী ক্লেটনকেও পীড়া দেয়।
ক্লেটন স্থানীয় মেথোডিস্ট গির্জার যাজককে খনি বিস্ফোরণে শহীদ বাবাদের সম্মানে ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই (রবিবার) বাবা দিবস
হিসেবে উৎসর্গ করার অনুরোধ জানান। ৫ জুলাইকে বাবা দিবস করার দাবি জানানোর কারণ, সেদিন ছিলো ক্লেটনের বাবার জন্মদিন। তবে তার বাবা বেঁচে ছিলেন না।
১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রপক্ষ একটি ঐতিহাসিক ফলক স্থাপনের মাধ্যমে ফেয়ারমন্টকে বাবা দিবসের জন্মস্থান হিসেবে ঘোষণা করে। ওই সময় থেকে প্রতি বাবা দিবসে গির্জায় দিনটির মাহাত্ম বর্ণনা করা হতো।
উইকিপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ধারণা করা হয়, ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই প্রথম ‘বাবা দিবস’ পালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমন্টের এক গির্জায় প্রথম এ দিনটি পালিত হয়।
বাবা দিবসকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে ভূমিকা রেখেছেন আরও এক নারী। সোনোরা স্মার্ট ডড নামে ওয়াশিংটনের এক নারীর মাথাতেও বাবা দিবসের আইডিয়া আসে। যদিও তিনি ১৯০৯ সালে ভার্জিনিয়ার বাবা দিবসের কথা একেবারেই জানতেন না। কারণ ১৯০৯ সালের আগে ওয়াশিংটনে বাবা দিবস পালিত হতো না। ডড এই আইডিয়াটা পান গির্জার এক পুরোহিতের বক্তব্য থেকে, সেই পুরোহিত আবার মাকে নিয়ে অনেক ভালো কথা বলছিলেন। মা দিবস পালনের কথা শোনেন। মা দিবস পালনের রীতি রয়েছে। কিন্তু বাবা দিবস পালনের রীতি নেই জেনে তিনি অবাক হন। তার মনে হয়েছিল, তাহলে বাবাদের নিয়ে কিছু করা দরকার। ডড আবার তার বাবাকে খুব ভালোবাসতেন। তাই বাবা দিবস পালনের আবেদন জানিয়ে তিনি স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সোনোরা স্মার্ট নিজের বাবার জন্মদিনের দিন (৫ জুন) বাবা দিবস পালন করার অনুমতি চান। অতঃপর তিনি সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগেই পরের বছর ১৯১০ সালের ১৯ জুন বাবা দিবস পালন করা শুরু করেন।
১৯১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংসদে বাবা দিবসকে ছুটির দিনের তালিকায় তুলতে একটি বিল উপস্থাপন করা হয়। ১৯১৬ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন বিলটি অনুমোদন করেন।সাত বছর পর, ১৯২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০তম প্রেসিডেন্ট কেলভিন ক্যুলিজ বাবা দিবসকে জাতীয় দিবসের মর্যাদা দেন।
১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন রাষ্ট্রীয়ভাবে জুনের তৃতীয় রবিবার বাবা দিবস বলে ঘোষণা করেন। সেই সময় থেকেই বিশ্বের সব বাবাদের সম্মানে প্রতি বছর পালিত হচ্ছে বাবা দিবস।
কিছু দেশ ভিন্ন মাসের কয়েকটি ভিন্ন তারিখে বাবা দিবস পালন করে। কিন্তু পৃথিবীর একটি বড় অংশ যেমন- বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, চিলি, কলাম্বিয়া, কোস্টারিকা, কিউবা, সাইপ্রাস, চেক প্রজাতন্ত্র, ফ্রান্স, গ্রিস, হংকং, ভারত, আয়ারল্যান্ড, জ্যামাইকা, জাপান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ড, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলংকা, সুইজারল্যান্ড, ভেনিজুয়েলা ও জিম্বাবুয়েসহ আরও কিছু দেশে জুনের তৃতীয় রবিবার বাবার জন্য পালন করা হয়।

বাংলাদেশে বাবা দিবস অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ঘরে ঘরে নানা আয়োজনে পালন হবে বাবা দিবস। বাঙালি সন্তানদের হৃদয়ে দিবসটি উৎসবে পরিণত হয়েছে। হাজার কষ্ট সয়ে তিলে তিলে যে সন্তানকে বড় করেছেন একজন বাবা, তাকে ঘিরেই এদিন হবে ব্যতিক্রমী উৎসব। তবে বাবা কি শুধুই একটি বিশেষ দিনের জন্য! এরকম বিতর্ক থাকলেও এই বিশেষ দিনটিতে একটি ফুল অথবা একটি কার্ড নিয়ে শুভেচ্ছা জানালে বাবা তাতেই খুশি। বাবার চাহিদা এতটুকুই। ছোট-বড়, অখ্যাত-বিখ্যাত সকলের কাছেই বাবা অসাধারণ। বাবার স্নেহ-ভালোবাসা সকলেরই প্রথম চাওয়া আর পাওয়া।
বাবা দিবসে, বিশ্বের সব বাবাদের জন্য মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ)-এর পক্ষ থেকে রইলো অান্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

