হলি আর্টিজান হামলা মামলায় ৭ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড
Posted by: News Desk
November 27, 2019
এমএনএ রিপোর্ট : বহুল আলোচিত রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা মামলার রায়ে আট আসামির মধ্যে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। এক আসামির বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও প্রত্যেক আসামিকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়।
আজ বুধবার ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলো : হামলার মূল সমন্বয়ক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরীর সহযোগী আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদুল ইসলাম ওরফে র্যাশ ওরফে আবু জাররা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী নব্য জেএমবির নেতা হাদিসুর রহমান সাগর, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী, হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী আব্দুস সবুর খান (হাসান) ওরফে সোহেল মাহফুজ, শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদ। আট আসামির মধ্যে নব্য জেএমবির অস্ত্র ও বিস্ফোরক শাখার প্রধান মিজানুর রহমান ওরফে বড়ো মিজানকে খালাস দিয়েছে আদালত। রায় পড়ার সময় সব আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে, আজ বুধবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে প্রিজনভ্যানে কারাগার থেকে আসামিদের ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়।
বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আজ বুধবার সকাল থেকে আদালত পাড়াসহ রাজধানী ঢাকা ও সারাদেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। রায়সাহেব বাজার মোড় থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পুরো সড়কে বাড়তি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে পুলিশ। সাদা পোশাকেও তৎপর রয়েছেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।
গত ১৭ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে বিচারক রায় ঘোষণার জন্য ২৭ নভেম্বর নির্ধারণ করেন। এ পর্যন্ত মোট ১১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। একই বছরের ২৩ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাউন্টার টেররিজম বিভাগের পরিদর্শক হুমায়ূন কবির মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতের জিআর শাখায় মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে ২৬ জুলাই সিএমএম আদালত মামলাটি ট্রাইব্যুনালে বদলির আদেশ দেয়।
অভিযোগপত্রে নাম থাকা ২১ আসামির মধ্যে ১৩ জন মারা যাওয়ায় তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। নিহত ১৩ জনের মধ্যে আট জন বিভিন্ন অভিযানে এবং পাঁচ জন ঘটনাস্থলে নিহত হয়।
ঘটনাস্থলে নিহত পাঁচ আসামি হলো : রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল। আর বিভিন্ন ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযানের সময় নিহত আট আসামি হলো তামিম চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সারোয়ার জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোটো মিজান।
২০১৬ সালের পহেলা জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়ে বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তা এএসপি রবিউল করিম এবং ওসি সালাউদ্দিন খান নিহত হন। পরদিন সকালে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রেস্তোরাঁর কর্মী সাইফুল। ঐ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গুলশান থানায় মামলা দায়ের করে পুলিশ।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে তদন্তের পর ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই হামলায় জড়িত ২১ জনকে চিহ্নিত করে তাদের মধ্যে জীবিত আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)।। ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবর রহমানের আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক বিচার। বিচার শুরুর এক বছরের মাথায় রায় ঘোষণা করা হলো আজ।
আসামিদের কার কী সম্পৃক্ততা
জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী : জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে গুলশান হামলার পরিকল্পনাকারী ও হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের সরবরাহকারী হিসেবে তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ২০১৭ সালের ১৩ জানুয়ারি ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এরপর আদালতে ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি গুলশান হামলার আদ্যোপান্ত স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয় রাজীব গান্ধী। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে গাইবান্ধা জেলার বোনারপাড়া বাজারে বাইক হাসানের বাসায় তামিম চৌধুরী, মেজর (অব) জাহিদ, সরোয়ার জাহান, রায়হানুল কবির রায়হান, নুরুল ইসলাম মারজান ও শরীফুল ইসলাম খালেদের সঙ্গে বৈঠকে হোলি আর্টিজানে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করে রাজীব।
আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে র্যাশ : গুলশান হামলার পরিকল্পনা সহযোগী ও বাস্তবায়নকারী হিসেবে তদন্তে নাম এসেছে আসলাম হোসেনের। এই গ্রুপের শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ। তাকে ২০১৭ সালের ২৮ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছরের ১০ আগস্ট হামলায় দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। তার বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেন, হামলাকারীদের প্রশিক্ষণকারী জঙ্গিদের কাছে নিয়ে যাওয়া, বোম চার্জ শিক্ষা দেওয়া এবং হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে তদন্তে। হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া রোহানকে আসাদ গেটের আড়ং থেকে ২০১৫ সালে নিয়ে যায়। পরে প্রশিক্ষক জঙ্গি নেতা রিগ্যানের কাছে পৌঁছে দেয়। সদরঘাটের বুড়িগঙ্গায় হামলাকারীদের নৌকায় করে নিয়ে গ্রেনেড ছোড়া শেখায়। গুলশান হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে হানিফ পরিবহনে করে ঢাকায় আনে। এছাড়া হামলাকারীদের জন্য ঢাকায় বাসা ভাড়া করাসহ নানা রকম লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়। নওগাঁর মান্দা এলাকার আব্দুস সালামের ছেলে আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ উচ্চ মাধ্যমিক পড়া অবস্থায়ই প্রথমে অনলাইনের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে নব্য জেএমবির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তার। ঢাকায় আসার পর তামিম চৌধুরী ও মারজানের সঙ্গে থেকে জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। গুলশান হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তামিম ও মারজানের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। ২০১৭ সালের ২৮ জুলাই নাটোর থেকে গ্রেফতার হওয়ার পর আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে রাশেদ।
সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ : তার প্রকৃত নাম আব্দুস সবুর খাঁন ওরফে হাসান। জঙ্গি সংগঠনে সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ ওরফে মুসাফির ওরফে জয় ওরফে নসরুল্লাহ নামে জঙ্গিরা তাকে চিনতো। ২০১৭ সালের ৮ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে কয়েক দফা রিমান্ড শেষে ২৩ জুলাই গুলশান হামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় সোহেল। এ হামলায় অর্থ, অস্ত্র, বিস্ফোরক, বোমা তৈরি ও সরবরাহকারী সোহেল মাহফুজ এক সময় পুরনো জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিল। পরবর্তীতে মতবিরোধের কারণে নব্য জেএমবির সুরা সদস্য হয়। সুরা সদস্যরাই গুলশান হামলার পরিকল্পনা করে সোহেল মাহফুজকে হামলাকারী, অস্ত্র ও বোমা সরবরাহ করার দায়িত্ব দেয়।
হাদীসুর রহমান সাগর : ২০১৮ সালের ২১ মার্চ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ৫ মে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। গুলশান হামলার মামলা তদন্তে হাদীসুর রহমান সাগরের বিরুদ্ধে বোমা তৈরি ও অস্ত্র,বোমা সরবরাহের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। পুরানো জেএমবির সদস্য সাগর ২০০১ সালে জয়পুরহাট সদরের বানিয়াপাড়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করার পর থেকেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। ভারত থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আনার সবগুলো রুট জানা ছিল তার। ২০১৪ সালে নব্য জেএমবির হয়ে কাজ শুরুর পর হলি আর্টিজানে হামলার জন্য অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহ করেন।
রাকিবুল হাসান রিগ্যান : মামলার তদন্তে রাকিবুল হাসান রিগ্যান ওরফে রাফিউল ইসলাম রাফি ওরফে রিপন ওরফে হাসান ওরফে অন্তরের (২০) নাম এসেছে হামলাকারীদের প্রশিক্ষক হিসেবে। বসুন্ধরার যে বাসা থেকে হামলার পরিকল্পনা হয় সেই বাসায় তার যাতায়াত ছিল। সেখানে হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ দেয়। বয়সে তরুণ রিগ্যান ২০১৫ সালে বগুড়া সরকারি শাহ সুলতান কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। ওই বছরের ২৬ জুলাই সকালে কোচিংয়ের কথা বলে ঘর ছাড়ে।
মামুনুর রশিদ রিপন : গুলশান হামলার পরিকল্পনা ও হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের সরবরাহকারী হিসেবে নাম এসেছে নব্য জেএমবির নেতা মামুনুর রশীদ রিপনের। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গাইবান্ধা জেলার শাখাডায় জঙ্গি সরোয়ার, মারজানা, বাশার, রায়হানের সঙ্গে হামলার পরিকল্পায় বৈঠক করে। হামলার জন্য জঙ্গি হাদিসুর রহমান সাগরের সঙ্গে একে ২২ রাইফেল, পর্যাপ্ত গুলি এবং চারটি গ্রেনেড, দুটি ৭.৬২ পিস্তল ও ১২ রাউন্ড গুলি মারজানের মাধ্যমে তামিম চৌধুরীর কাছে পৌঁছে দেয়।
শরীফুল ইসলাম খালিদ : রিপনের মতো খালিদও হলি আর্টিজানে হামলার পরিকল্পনায় সহযোগিতা, হামলা বাস্তবায়ন ও হামলাকারী সরবরাহে ভূমিকা রেখেছিল। এছাড়া হামলাকারীদের জায়গা মতো পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের অর্থ সহায়তা করে। খালিদ জঙ্গি রাজীব গান্ধীর মাধ্যমে হামলাকারী পায়েল ও শরীফুল ইসলাম ডনকে বাছাই করে। এছাড়া আগে থেকেই মোবাশ্বর, রোহান ও উজ্জল তার কাছে ছিল। তাদের সবাইকে গাইবান্ধার চরাঞ্চলে প্রশিক্ষণ দেয়। খালিদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর সঙ্গে প্রথম থেকেই যোগাযোগ ছিল তার। রাজশাহী জেলার বাগমারা থানার শ্রীপুর এলাকায় তার গ্রামের বাড়ি। বাবার নাম আব্দুল হাকিম।
হামলা মৃত্যুদণ্ড হলি আর্টিজান ৭ জঙ্গির মামলায় 2019-11-27