Don't Miss
Home / আজকের সংবাদ / ২০২৭ থেকে ৪র্থ ও ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে চার নতুন বই, জিপিএতে নম্বর যোগ না হলেও পাস বাধ্যতামূলক

২০২৭ থেকে ৪র্থ ও ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে চার নতুন বই, জিপিএতে নম্বর যোগ না হলেও পাস বাধ্যতামূলক

শিক্ষাঙ্গন প্রতিবেদক

শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেবে, মূল্যায়নের মুখোমুখিও হবে; তবে সেই নম্বর বার্ষিক ফলাফল বা জিপিএতে যোগ হবে না। তবুও বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না, কারণ পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে হলে এসব বিষয়ে পাস করতে হবে। নম্বর ও জিপিএকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে মানবিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, জীবনদক্ষতা এবং আনন্দময় শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে ২০২৭ সাল থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি নতুন বই চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা প্রশাসন।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসি) সূত্রে জানা গেছে, নতুন শিক্ষাক্রমের আওতায় চতুর্থ শ্রেণিতে ‘সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ বিষয়ক দুটি বই যুক্ত হবে। অন্যদিকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে চালু হবে কর্মমুখী বা দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার একটি বই এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষাবিষয়ক আরেকটি বই।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশ, সামাজিক আচরণ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং বাস্তবজীবনমুখী দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এসব বই চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডের ঘাটতির বিষয়টি বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় উঠে আসে। একই সঙ্গে পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে শেখার আনন্দকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত পরীক্ষা ও নম্বরকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করলেও তাদের মধ্যে সামাজিক আচরণ, সাংস্কৃতিক চর্চা, মানবিক মূল্যবোধ ও জীবনদক্ষতার বিকাশ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না।

তিনি বলেন, “একজন শিক্ষার্থী শুধু জিপিএ নিয়ে বড় হবে, আর তার মধ্যে সংস্কৃতি, মানবিকতা কিংবা সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি হবে না—এটা কোনো শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হতে পারে না। নতুন বইগুলো সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার একটি উদ্যোগ।”

নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে জোর

শিক্ষা প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সামাজিক আচরণ গড়ে তোলার বিষয়টি নতুন শিক্ষাক্রমে বিশেষ গুরুত্ব পাবে। তবে এ জন্য আলাদা করে ‘নৈতিক শিক্ষা’ নামে কোনো বই যুক্ত করা হচ্ছে না। সংস্কৃতি, খেলাধুলা, আনন্দময় শিক্ষা এবং অন্যান্য পাঠ্যবিষয়ের মধ্য দিয়েই এসব মূল্যবোধ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

নতুন বইগুলোতে কী থাকবে

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, চতুর্থ শ্রেণির সংস্কৃতিবিষয়ক বইয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য, সামাজিক রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রাথমিক ধারণা তুলে ধরা হবে। শিশুদের নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে পরিচিত করা এবং সংস্কৃতিচর্চায় আগ্রহী করে তোলাই হবে এর মূল লক্ষ্য।

একই শ্রেণির খেলাধুলাবিষয়ক বইয়ে গুরুত্ব পাবে শারীরিক সুস্থতা, শরীরচর্চা, দলগত কাজ, নেতৃত্ব, ক্রীড়া-নৈতিকতা এবং মানসিক বিকাশ। নিয়মিত শরীরচর্চা ও দলগত অংশগ্রহণের মাধ্যমে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও সহমর্মিতার মতো গুণাবলি বিকাশের বিষয়েও জোর দেওয়া হবে।

ষষ্ঠ শ্রেণির কর্মমুখী শিক্ষাবিষয়ক বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই দক্ষতা ও কাজভিত্তিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করা হবে। যদিও বিষয়টির নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে ‘ভোকেশনাল’ শব্দটি ব্যবহার না করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। কারণ সমাজের একটি অংশের মধ্যে ভোকেশনাল শিক্ষা নিয়ে এখনও নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। নতুন বইটির মাধ্যমে দক্ষতা ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাকে মূলধারার মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হবে।

সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সংযোজন হিসেবে আসছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’। শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, বইটির মূল দর্শন হবে—‘আনন্দের মাধ্যমে শেখা’। এতে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা, সৃজনশীল কার্যক্রম, দলগত কাজ, ব্যবহারিক বিজ্ঞানচর্চা এবং বাস্তবজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন শিক্ষণ পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

নম্বর নয়, গুরুত্ব পাবে শেখার অগ্রগতি

নতুন চারটি বইয়ের মূল্যায়ন পদ্ধতিও হবে ভিন্নধর্মী। এসব বিষয়ে পরীক্ষা বা মূল্যায়ন থাকলেও নম্বর চূড়ান্ত ফলাফল বা জিপিএতে যোগ হবে না। তবে শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত মান অর্জন করে পাস করতে হবে।

এনসিটিবির সদস্য (কারিকুলাম) এ কে এম মাসুদুল হক বলেন, “নতুন বইগুলোর লক্ষ্য নম্বরের প্রতিযোগিতা বাড়ানো নয়; বরং শিক্ষার্থীদের বাস্তবজীবনমুখী দক্ষতা, সামাজিক মূল্যবোধ ও ইতিবাচক আচরণ গড়ে তোলা। এজন্য মূল্যায়ন থাকবে, তবে সেটি হবে শেখার অগ্রগতি নিশ্চিত করার জন্য, ফলাফলে অতিরিক্ত চাপ তৈরির জন্য নয়।”

তিনি আরও বলেন, “বিদ্যমান বিভিন্ন বইয়েও মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বিষয় রয়েছে। তবে নতুন শিক্ষাক্রমে এসব বিষয়কে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, সৃজনশীলতা, আগ্রহ এবং ব্যবহারিক দক্ষতার বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে শেখার আনন্দও বৃদ্ধি পাবে।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ বড় চ্যালেঞ্জ

তবে নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে শিক্ষক প্রস্তুতিকে। কারণ সংস্কৃতি, খেলাধুলা, কর্মমুখী শিক্ষা বা আনন্দময় শিক্ষার মতো বিষয় কেবল পাঠ্যবই পড়ে শেখানো সম্ভব নয়। এগুলোর জন্য প্রয়োজন অংশগ্রহণমূলক, অভিজ্ঞতাভিত্তিক ও সৃজনশীল পাঠদান পদ্ধতি।

এ কারণে শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রস্তুতিও চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

২০২৭ সালের বই মুদ্রণ শুরু

এদিকে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ ইতোমধ্যে শুরু করেছে এনসিটিবি। সংস্থাটির সদস্য (টেক্সট) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু জানান, প্রি-প্রাইমারি ও ইবতেদায়ী স্তরের বইয়ের মুদ্রণকাজ ৩ জুন শুরু হয়েছে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের মুদ্রণও শুরু হয়েছে ৪ জুন থেকে।

তিনি বলেন, “পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। আমরা যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিতে সক্ষম হবো।”

এনসিটিবির উৎপাদন শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের জন্য ২ জুন পর্যন্ত ২২ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার ৯২৩টি পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নতুন যুক্ত হওয়া চারটি বইয়ের মধ্যে তিনটির চাহিদাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে সম্প্রতি আরও একটি নতুন বই অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় চাহিদাপত্র পাঠাতে হবে। এরপরই ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ের চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে।

উল্লেখ্য, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের জন্য মোট ৩০ কোটি ২ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৪টি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী স্তরে ১১ কোটি ৭০ লাখ ৪৬ হাজার ৪৬১টি এবং মাধ্যমিক স্তরে ১৮ কোটি ৩২ লাখ ৮ হাজার ৬৯৩টি বই বিতরণ করা হয়। এছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতিতে ৬ হাজার ২৬টি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৭১৫টি পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা হয়েছিল।

শিক্ষা প্রশাসনের প্রত্যাশা, নতুন চারটি বই চালুর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংস্কৃতিচর্চা, খেলাধুলা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং জীবনঘনিষ্ঠ দক্ষতার বিকাশ ঘটবে। একই সঙ্গে নম্বরনির্ভর শিক্ষার বাইরে গিয়ে শেখার আনন্দ ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

x

Check Also

সক্ষমতা

জেলা-উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে সরকারঃ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

এমএনএ জাতীয় ডেস্কঃ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় ...