এমএনএ প্রতিবেদক
দেশের ব্যাংকিং খাতের বহুল আলোচিত পাঁচটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রত্যাশিত গতিতে কার্যক্রম চালু না হওয়া, আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা এবং অংশীদার ব্যাংকগুলোর একে একে সরে যাওয়ার আগ্রহ—সব মিলিয়ে এই বৃহৎ পুনর্গঠন উদ্যোগটি ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। ইতোমধ্যে একটি ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন করেছে, আরেকটি একই পথে এগোচ্ছে বলে জানা গেছে।
গত বছরের ২১ ডিসেম্বর এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—এই পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে নতুন এই প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একটি কাঠামোর অধীনে এনে পুনর্গঠন করা, তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
তবে প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম এখনও পুরোপুরি সচল হয়নি। গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া ধীরগতির এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এগোচ্ছে না। ফলে শুরুতে যে আস্থার সংকট ছিল, তা কাটার বদলে আরও গভীর হয়েছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে অংশীদার ব্যাংকগুলোর সরে যাওয়ার উদ্যোগ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল) ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একীভূত কাঠামো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন করেছে। ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালক ও সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল হকের পক্ষ থেকে করা এই আবেদন আর্থিক খাতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ব্যাংকটির সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশের ১৮(ক) ধারার সুযোগ নিয়ে এই আবেদন করা হয়েছে এবং সাবেক পর্ষদের সম্মতি রয়েছে। একই সময়ে এক্সিম ব্যাংকও একই পথে হাঁটার বিষয়ে আলোচনা করছে বলে জানা গেছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, একীভূত কাঠামোর ভেতরে সমন্বয় ও আস্থার ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই একীভূত উদ্যোগ শুরু থেকেই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ একীভূত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪৮ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা, আর মোট ঋণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা—যার বড় অংশই অনাদায়ী।
এমন পরিস্থিতিতে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধুমাত্র একীভূতকরণ টেকসই সমাধান দিতে পারে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাপক তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রয়োজনে টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সরকারি অর্থায়নের মাধ্যমেও এই একীভূত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়।
কিন্তু এত সহায়তার পরও কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা না আসায় প্রশ্ন উঠেছে—নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো কতটা কার্যকর ছিল এবং এসব সহায়তা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাতে কী প্রভাব ফেলবে।
সম্প্রতি প্রণীত ব্যাংক রেজ্যুলেশন কাঠামোতে লিকুইডেশন, ব্রিজ ব্যাংক, নতুন বিনিয়োগকারীর কাছে হস্তান্তর এবং সাবেক শেয়ারধারীদের ফিরে আসার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ১৮(ক) ধারা যুক্ত হওয়ার ফলে সাবেক মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, আগের মালিকানায় ফিরে গেলে পুরোনো অনিয়ম ও দুর্বলতা আবার ফিরে আসতে পারে।
বর্তমানে এই ব্যাংকের অধীনে প্রায় ৯১ লাখ ৫০ হাজার হিসাব এবং ১৫ হাজারের বেশি কর্মী রয়েছে। ফলে এর ভবিষ্যৎ সরাসরি বিপুলসংখ্যক মানুষের সঙ্গে জড়িত।
তবে বাস্তবতা হলো—অনেক শাখায় গ্রাহকের উপস্থিতি কমেছে, নতুন আমানত জমার প্রবণতা কমেছে এবং টাকা উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা থাকায় ভোগান্তি বেড়েছে। ফলে আস্থা পুনরুদ্ধার এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকের ভেতরেও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অস্থিরতা রয়েছে। একাধিক ব্যাংকার মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দেয় এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা যায়, তাহলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, একীভূত প্রক্রিয়া এখনও চলমান এবং পরিচালনা কাঠামো শক্তিশালী করার কাজ চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। পরিস্থিতি উন্নত হলে আবার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের স্বাগত জানানো হবে বলেও জানানো হয়েছে।
এসআইবিএল তাদের আবেদনে ব্যাংকটিকে পৃথক করে পুনর্গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে— খেলাপি ঋণ ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা; ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ কমানো; মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করা; ২২টি সরকারি হিসাব পুনরায় চালু করে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা পুনরুদ্ধার ও ১০ বছরের জন্য ১১ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় এসব লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে— একীভূত উদ্যোগটি টেকসই হবে কি? অংশীদার ব্যাংকগুলো সরে গেলে কাঠামো টিকবে কীভাবে? সাবেক মালিকরা ফিরে এলে পুরোনো সমস্যা কি আবার দেখা দেবে? গ্রাহকদের আস্থা কীভাবে ফিরবে? সরকারের চূড়ান্ত কৌশল কী হবে?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— ১. নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা; ২. সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ও ৩. খেলাপি ঋণ কার্যকরভাবে পুনরুদ্ধার।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এটি হয় পুনর্গঠনের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াবে, নয়তো ব্যর্থ একীভূত উদ্যোগ হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, তার প্রভাব পড়বে লাখো গ্রাহক, হাজারো কর্মী এবং দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর। এখন সবার নজর সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

