সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের অধিকার জাতিসংঘের নেই : মিন অং হ্লাইং
Posted by: News Desk
September 24, 2018
এমএনএ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক : মিয়ানমারের ক্ষমতাধর সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং বলেছেন, তার দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার জাতিসংঘের নেই।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’ চালানোর দায়ে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ অন্য শীর্ষ জেনারেলদের বিচারের মুখোমুখি করতে জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন আহ্বান জানানোর এক সপ্তাহ পর গতকাল রবিবার সেনা সদস্যের উদ্দেশ্য দেওয়া এক ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
মিয়ানমারের সামরিকবাহিনী নিয়ন্ত্রিত একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, এর মধ্য দিয়ে বিষয়টি নিয়ে প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে প্রতিক্রিয়া দিলেন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান।
মিয়ানমারের রাজনীতি থেকে সেনাবাহিনীকে সরে যাওয়ার যে দাবি জাতিসংঘ জানিয়েছে তারও সমালোচনা করেন মিন অং হ্লাইং। তিনি বলেন, একটি দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ করার এবং দেশটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কোনো দেশ, সংস্থা বা গোষ্ঠীর নেই।
গত বছরের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা অভিযানের নামে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সে সময় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানকে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ বলে অভিহিত করে, যা আন্তর্জাতিক আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ।
মিয়ানমারে গণতন্ত্র বিকাশের পথ তৈরি করতে ‘সশস্ত্র সংঘাত থামিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার’ কাজ সেনাবাহিনী চালিয়ে যাবে এবং রাখাইনের ঘটনা নিয়ে ‘অগ্রহণযোগ্য কোনো দাবি’ সেনাবাহিনী মেনে নেবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) রাখাইনের ঘটনা নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরুর পর এই প্রথম জেনারেল মিন অং হ্লাইং প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বললেন।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা মায়াবতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রবিবার নে পি দোতে সেনাবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে গণতন্ত্র, জাতিসংঘ ও রাখাইন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেন জেনারেল মিন অং হ্লাইং।
তিনি বলেন, বিশ্বের একেক দেশের গণতন্ত্র চর্চার ধরন একেক রকম। একটি দেশ সেই ধরনের গণতন্ত্রের চর্চা করে, যা তার জন্য উপযুক্ত। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারও স্বাধীন একটি পররাষ্ট্র নীতির চর্চা করে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ একটি অবস্থান বজায় রেখে চলে।
‘তাছাড়া জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমার জাতিসংঘের যেসব চুক্তিতে সই করেছে, সেগুলো প্রতিপালন করে। প্রতিটি দেশ যেহেতু নিজের মত করে আলাদা মানদণ্ড ও আদর্শ নির্ধারণ করে, সেহেতু তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার বা তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কোনো দেশ, কোনো সংস্থা বা কোনো গোষ্ঠীর নেই।
অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলতে গেলে যেমন ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে, একইভাবে কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রেও একই ফল হতে পারে বলে সতর্ক করেন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান।
রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর থেকে প্রায় ৭ লাখের মতো রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, রাখাইনে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ করছে এবং তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
অবশ্য বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে মিয়ানমার সরকার। বরং রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের দমনেই রাখাইনে সেনা অভিযান চালানো হয় বলে দাবি করে তারা।
তবে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন যে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে তাতে সেনাবাহিনীর এই অভিযানকে ‘প্রকৃত নিরাপত্তা হুমকির ক্ষেত্রে যথাযথ ও সঙ্গতিপূর্ণ নয়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৭ সালের ২৫ অগাস্টের পর রাখাইনে সেনাবাহিনীর যে অভিযানের কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, সেই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে জাতিসংঘ।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপন করা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য মিয়ানমারের সেনাপ্রধান এবং জ্যেষ্ঠ পাঁচ জেনারেলকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) বা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে বিচারের মুখোমুখি করার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তও শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত।
আন্তর্জাতিক চাপে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গতবছরের শেষ দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও এখনও প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি।
রাখাইনে কয়েকশ বছর ধরে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসবাসের ইতিহাস থাকলেও ১৯৮২ সালে এক আইনের মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং সরকার রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ না করে বোঝাতে চায় যে, ওই নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারে নেই। এর বদলে রোহিঙ্গাদের তারা বর্ণনা করে ‘বাঙালি ‘ বা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে।
জেনারেল মিন অং হ্লাইং বলছেন, ‘বাঙালিসহ’ সবার ক্ষেত্রেই ওই আইন প্রযোজ্য। মিয়ানমারে থাকতে হলে ওই আইন মেনেই চলতে হবে। যারা অন্য দেশে পালিয়ে গেছে, এ আইনে যাচাই করেই তাদের ফেরত নেওয়া হবে।
২০১৭ সালের মার্চে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল গঠিত এই মিশনের প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে বলেও জানানো হয়।
মিন অং হ্লাইং হস্তক্ষেপের সার্বভৌমত্বে জাতিসংঘের অধিকার 2018-09-24