Don't Miss
Home / অর্থনীতি / বিদেশে আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ ফেরত চায় ইরান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তহবিল মুক্তি বড় ইস্যু

বিদেশে আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ ফেরত চায় ইরান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তহবিল মুক্তি বড় ইস্যু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা জোরদার করেছে ইরান। দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক বিধিনিষেধ এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বিদেশে জমে থাকা এই বিপুল অর্থ এখন তেহরানের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ও নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান অন্তত ২৪ বিলিয়ন ডলার ধাপে ধাপে ছাড় করার দাবি জানিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, বিদেশে দেশটির মোট আটকে থাকা সম্পদের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থ ফেরত পাওয়া গেলে তা ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় তেহরান এই তহবিলকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের আটকে থাকা সম্পদের সবচেয়ে বড় অংশ চীনে রয়েছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, চীনে আটকে থাকা ইরানি তহবিলের পরিমাণ ২০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে।

এই অর্থের বড় অংশই বছরের পর বছর ধরে চীনের কাছে তেল বিক্রির মাধ্যমে জমা হয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও চীন ইরানের অন্যতম প্রধান জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হিসেবে রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল বিক্রির বিপুল অর্থ সরাসরি ইরানে পাঠানো সম্ভব হয়নি।

জানা গেছে, এই অর্থের একটি অংশ চীনা পণ্য ও শিল্পযন্ত্র আমদানিতে ব্যবহৃত হলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তহবিল এখনও চীনের বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলে আটকে রয়েছে।

ইরানের আটকে থাকা সম্পদের বেশির ভাগই এসেছে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিদ্যুৎ রপ্তানি থেকে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক দেশ এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংক ইরানের কাছে সরাসরি অর্থ স্থানান্তর করতে পারে না।

ফলে তেল আমদানিকারক দেশগুলো অর্থ পরিশোধ করলেও তা স্থানীয় ব্যাংক হিসাবে বা বিশেষ তহবিল হিসেবে জমা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এসব অর্থ কেবল মানবিক পণ্য—যেমন খাদ্য, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম—ক্রয়ের জন্য ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।

এছাড়া ডলারের পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ জমা থাকার কারণে ইরান অনেক সময় সেই অর্থও স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারে না।

ইরানের প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ আমদানির বিপরীতে ইরাকের কাছে প্রায় ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার আটকে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

ইরাক দীর্ঘদিন ধরে ইরানের জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বাগদাদ সরকার এই অর্থ সরাসরি তেহরানে পাঠাতে পারছে না। ফলে অর্থগুলো বিভিন্ন সীমিত ব্যবহারের অ্যাকাউন্টে সংরক্ষিত রয়েছে।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল ইরানি তেলের বড় ক্রেতা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশের কাছেই প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার করে ইরানি অর্থ আটকে রয়েছে। তেল আমদানির বিপরীতে প্রদেয় অর্থ স্থানীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জমা থাকলেও পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞার কারণে তা আর ইরানের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার কাতারে স্থানান্তর করা হয়।

তবে এই অর্থ শুধুমাত্র মানবিক খাতে ব্যয়ের জন্য নির্ধারিত ছিল। একই বছরের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর ওই তহবিল ব্যবহারের ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। ফলে অর্থ স্থানান্তরিত হলেও ইরানের জন্য তা পুরোপুরি ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠেনি।

চীন, ইরাক, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি জাপান, ওমান, লুক্সেমবার্গসহ আরও কয়েকটি দেশে তুলনামূলক ছোট অঙ্কের ইরানি সম্পদ আটকে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক দশক ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এসব সম্পদ বিভিন্ন দেশে বিচ্ছিন্নভাবে জমা হয়েছে।

বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান আলোচনা এবং সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রে আটকে থাকা তহবিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান প্রাথমিক পর্যায়ে ৬ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড় করার জন্য চাপ দিচ্ছিল। অন্যদিকে মার্কিন আলোচনাকারীরা মানবিক ব্যয়, পরমাণু কর্মসূচি এবং ভবিষ্যৎ চুক্তি বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের সঙ্গে সম্পদ মুক্ত করার বিষয়টি যুক্ত করতে চাইছেন।

এদিকে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, একটি সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে ইরানি কর্মকর্তারা অন্তত ২৪ বিলিয়ন ডলার ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের আলোচনাপত্রেও ইরানের জব্দ অর্থ উন্মুক্ত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আটকে থাকা সম্পদ ফেরত পেলে ইরানের জন্য তা হতে পারে সাম্প্রতিক দশকগুলোর অন্যতম বড় অর্থনৈতিক অর্জন।

এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে, জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের ওপর চাপ কমাতে, প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে অর্থায়ন করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের নতুন অধ্যায়েরও ভিত্তি তৈরি করতে পারে, যেখানে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, তেল রপ্তানি পুনরুদ্ধার, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা এবং হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

তবে চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত বিদেশে আটকে থাকা এই বিপুল সম্পদ ইরানের জন্য যেমন অর্থনৈতিক আশার প্রতীক, তেমনি আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির উপাদান হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

x

Check Also

অনলাইন জুয়া ও অবৈধ অর্থপাচার চক্রে জড়িত আরও ৩ সদস্য গ্রেফতার: সিআইডি

এমএনএ প্রতিবেদক অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ থেকে কমিশন কেটে নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও ...