Don't Miss
Home / জীবনচর্চা / বৈশাখের উৎসবে তারুণ্যের ফ্যাশন

বৈশাখের উৎসবে তারুণ্যের ফ্যাশন

এমএনএ ফিচার ডেস্ক : বৈশাখের রঙ লাল-সাদা হওয়ার কারণ যা-ই হোক, তা শুরু থেকে সর্বজনীনভাবে মান্য হয়েছিল। রমনার বটমূলে ছায়ানটের আনুষ্ঠানিক বর্ষবরণের মাধ্যমে এর কিছুটা বিস্তৃতি ঘটে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের তাদের বৈশাখী আয়োজনে লাল-সাদাকেই প্রেরণা হিসেবে বেছে নেয়ার ধারাটি গতিশীল থাকে এবং স্বাভাবিকভাবে বৈশাখের রঙ হিসেবে সাদা-লাল ফ্যাশনে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে যায়।

আইলো আইলো রে রঙ্গে ভরা বৈশাখ আবার আইলো রে
পাগলা মনে রঙিন চোখে, নাগরদোলায় বছর ঘুরে

একতারাটার সুরটা বুকে, হাজার তালের বাউল সুরে
দেশটা জুড়ে খুশির ঝড়ে একটা কথাই সবার মনে
আইলো আইলো রে রঙ্গে ভরা বৈশাখ আবার আইলো রে।

গানের ছন্দে তালে, নতুন বছর আসছে ঘুরে, উদাসী হাওয়ার সুরে সুরে রাঙা মাটির পথটি জুড়ে। বাংলা বছরের প্রথম দিনে আরো একবার বাঙালি পোশাক পরার ধুম পড়ে যায় পুরো দেশজুড়ে। এমনকি কলকাতা আর ত্রিপুরার বাঙালিরাও নানা রঙে রাঙিয়ে তালে দিনটি। নববর্ষের প্রথম দিনে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম পড়ে যায় ঘরে ঘরে। অনেকেই আবার পান্তা-ইলিশের খোঁজে ছুটে যায় মেলায়।

সাদা-লালের চিরায়ত রঙে রাঙাতে বৈশাখ এখন দোরগোড়ায়। ইতোমধ্যে চারদিকে বৈশাখের আমেজ শুরু হয়ে গেছে। বৈশাখের প্রথম দিনে উৎসব-আনন্দে মেতে ওঠা তো বাঙালির অনেক দিনের ঐতিহ্য। দিনে দিনে এ উৎসবের পরিধি শুধুই বেড়েছে। পহেলা বৈশাখে সবাই বিগত বছরের সব দুঃখ-কষ্ট ঝেড়ে নতুন বছর বরণ করতে উদ্যোগী হয়। উৎসবপ্রিয় বাঙালি বৈশাখ পালনের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে অনেক আগে থেকেই।

পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার উৎসব এটি। দিন দিন উৎসবটির সর্বজনীনতা বা ব্যাপকতা যেন বাড়ছে। আর এ উৎসব পালনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রস্তুতি নেয়া হয় পোশাককে ঘিরেই। আমাদের দেশি ফ্যাশন বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করেই যেহেতু গড়ে উঠেছে তাই পোশাকের ক্ষেত্রে ঋতু বা মৌসুমও পায় বিশেষ গুরুত্ব। সেই সঙ্গে রঙটাও সমান গুরুত্ব পায়।

যেহেতু পহেলা বৈশাখ বাঙালির অন্যতম প্রধান উৎসব তাই একে সামনে রেখে প্রতি বছরই পোশাকের ডিজাইনে আসে নানা পরিবর্তন। এ বছর রঙে যেমন বৈচিত্র্য আছে তেমন বৈচিত্র্য এসেছে কাটিং ও কাজেও। বাঙালির বর্ষ শুরু লাল-সাদা দিয়ে। ফ্যাশনে এর কি কোনো ব্যাখ্যা আছে? প্রকৃতিতে বৈশাখের নিজস্ব একটা রঙ আছে, তার প্রকাশ ঘটলে বদলে যায় বাঙালির রূপ। নতুন রঙে বাংলার জীবন রাঙাতে আসে বৈশাখ। বৈশাখের চিরায়ত রঙ সাদা-লালের চল কেন বা কবে থেকে, এ বিষয়ে মতভেদ আছে। কারো মতে, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বৈশাখের প্রধান আয়োজন হালখাতা, যার মোড়কের অংশ লাল এবং ভেতরের পাতার রঙ সাদা, সেখান থেকে লাল-সাদা আসতে পারে।

অনেকে মনে করেন, আগের দিনে হিন্দু নারী লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে বিভিন্ন পূজা-পার্বণে অংশ নিত, সেখান থেকেও লাল-সাদা আসতে পারে। যদিও এসব কারণের পেছনে গ্রহণযোগ্য যুক্তি তেমন পাওয়া যায় না। কারণ, সাধারণভাবেই অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারে মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাল পেড়ে সাদা শাড়ির প্রচলন ছিল। বাস্তবতা হলো, ধীরে ধীরে তা উৎসবের পোশাকে পরিণত হয়েছে।

শুরুটা লাল-সাদা দিয়ে হলেও বৈশাখের পোশাকে ২০০৬-০৭ সালের দিক থেকে অন্যান্য রঙ যেমন পেস্ট, কালো, হলুদ, মেরুন, গোল্ডেন, ম্যাজেন্টা ও সবুজের বিভিন্ন শেডের ব্যবহার দেখা যায়। তবে আগেরটি মূল প্রেরণার মধ্যে রয়ে যায়। এভাবে বিভিন্ন রঙ সংযোজনের চেষ্টা চলতে থাকে। ২০১০-১১ সালের দিকে লাল-সাদার পাশাপাশি কোড়া, হলুদ, অফ-হোয়াইট, কমলা, বাসন্তী, নীল, বেগুনি, সবুজ, টিয়া, কালো, ম্যাজেন্টা, লাইমগ্রিন, ফিরোজা, ইটলাল ইত্যাদি রঙের ব্যবহার দেখা যায়।

২০২২ সালে লাল-সাদা তার শক্ত অবস্থান বজায় রাখলেও পাশাপাশি কর্তৃত্ব করে লালের গ্রুপের রঙ। এ ছাড়া ছিল কালো, ফিরোজা, সবুজ, নীলের মৃদু ব্যবহার। ফ্যাশন হাউসগুলো যখন থেকে বৈশাখের পোশাক নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছিল তখন সাদা-লালেই আটকে ছিল, পরে অন্যান্য রঙ ব্যবহার করার চেষ্টা হলেও কোনো রঙই সুবিধা করতে পারেনি এবং পারবেও না। এটি ফিক্সড হয়ে গেছে সাদা-লালে। ফলে এবার বৈশাখে ট্র্যাডিশনাল লাল-সাদা, লাল-কোড়া বা অফ-হোয়াইট প্রধান রঙ হিসেবে থাকবে। সঙ্গে সাপোর্টিং হিসেবে থাকবে ম্যাজেন্টা, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল ও গ্রুপ রঙের ব্যবহার। তবে ট্র্যাডিশনাল রঙে লালের বিভিন্ন শেড চোখে পড়বে।

মানুষ বৈশাখের উৎসবে লাল-সাদাকেই বেশি পছন্দ করে ফলে এর প্রাধান্য বেড়েছে এবং এটিই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। অন্যসব উৎসবে বিচিত্র রঙ ব্যবহার করার এবং সেসব পাল্টে নেয়ার সুযোগ আছে কিন্তু বৈশাখের ফ্যাশনে তা নেই এবং এটাই ভালো। যেহেতু এদিন উদযাপন করতে, বাঙালিয়ানার ষোলকলা পূর্ণ করতে সবার আগে চাই লোকজ ঐতিহ্যের পোশাক আর পহেলা বৈশাখ যেহেতু সবার, তাই সবার কথা মাথায় রেখেই, বৈশাখী আয়োজন নিয়ে এসেছে ফ্যাশন হাউসগুলো আর তাই নববর্ষের পোশাকের কথা মাথায় রেখে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ডিজাইনাররাও।

দেশীয় মোটিফ আর রঙের আকর্ষণীয় পোশাক আনছে নামকরা ফ্যাশন হাউসগুলো। পোশাকের সঙ্গে থাকছে কানের দুল, মালা আর চুড়ি। সবুজ, ম্যাজেন্টা, অফ-হোয়াইট, হালকা বাদামি রঙের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। তরুণীরা এসব রঙে অ্যাড করছেন নানা ধরনের ফিউশন, যা তাদের আরো ট্রেন্ডি করে তুলছে। তবে লাল-সাদার ঐতিহ্য ধরে রেখে নগরীর ফ্যাশন হাউসগুলো সেজেছে বৈশাখী রঙে।

পোশাকের রঙে কোনো ভিন্নতা না থাকলেও বৈচিত্র্যতা এসেছে এর কাটিং, ভ্যালু অ্যাডে আর মেটেরিয়ালসে, যা বরাবরই বৈশাখে যোগ করে নতুনত্ব। আর এরই রেশ ধরে এবারের বৈশাখেও রয়েছে নতুন চমক। বাংলা নববর্ষ, পহেলা বৈশাখ এবং নতুন পোশাক এ উৎসব উদযাপনেরই এক দৃষ্টিনন্দন অনুষঙ্গ। বাহারি পোশাকে পহেলা বৈশাখের উৎসব উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে সারাদেশে। ছোট-বড় সবাই সাজবে রঙিন পোশাকে। তবে এদিন গরমের প্রভাব বেশি থাকবে। তাই পোশাক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে চাই একটু সাবধানতা।

পোশাকের মেটেরিয়ালস হতে হবে গরম উপযোগী। সুতি হলে বেশ ভালো। বিশেষ করে ছোটদের জন্য অবশ্যই সুতি পোশাক বাছাই করুন। ছেলেদের জন্য আছে ফতুয়া, শার্ট, টি-শার্ট আর পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির সঙ্গে পায়জামা বেশি চলছে। গরমের কথা মাথায় রেখে পাতলা সুতি ও খাদি কাপড় ব্যবহার করে অধিকাংশ পোশাক তৈরি করা হয়েছে। পাওয়া যাচ্ছে সুতি বা খাদি কাপড়ের শার্ট ও হাফ প্যান্টের সেট। ফতুয়ায় অন্যান্য রঙের থেকে লাল-সাদার প্রাধান্য দেখা গেলেও টি-শার্টে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারটাই বেশি চোখে পড়ে।

মেয়েদের জন্য আছে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, স্কাট আর টপ, ফ্রক। পাশ্চাত্যের পোশাকগুলোয় বিভিন্ন রঙের পাশাপাশি প্রিন্টেড কাপড়ের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। ফ্যাশন হাউসগুলোর মধ্যে এবারে ব্যতিক্রম ডিজাইন এনেছে বিবিয়ানা। প্রতি বছরই তাদের পোশাকের সম্ভারে ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। এবারের বৈশাখেও তারা ব্যতিক্রমী নয়।

এবারে বৈশাখী পোশাকে তারা প্রয়োগ করছে নানাবিধ ভঙ্গিমায় ‘রিকশা বিলাস’ সম্ভার। অফ-হোয়াইট আর লালের মধ্যে রিকশার ঝালরের ব্যবহৃত রঙগুলোকে উপস্থাপিত করা হয়েছে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, পাঞ্জাবি, বস্নাউজ পিস ও শিশুদের পোশাকে। তাদের পোশাকে মূলত কটনকে প্রাধান্য দেয়া হলেও এন্ডি, মসলিন, হাফ সিল্কও রয়েছে পোশাকের সম্ভারে। শুধু বড়দের নয়, বৈশাখে ছোটদের আনন্দ বেশি থাকে, তাই তাদের পোশাকে আনন্দের ছোঁয়া তো থাকবেই।

ফ্যাশনের পাশাপাশি তাদের আরামের দিকটাও খেয়াল রাখতে হবে পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে। পোশাকের রঙের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিন কাপড় নির্বাচন করার প্রতিও। সবকিছু বিবেচনা করে বাচ্চার কাপড় কিনুন। আপনার বাচ্চার স্বাচ্ছন্দ্য ও নতুন ফ্যাশনের পোশাক দুইয়ে মিলিয়ে রাঙিয়ে নিন আপনাদের বৈশাখ উৎসব। এত গেল পোশাকের কথা। পোশাকের পূর্ণতা দেয়ার জন্য যেসব অনুষঙ্গ ব্যবহার হয় এবার তাদের কথায় আসি। বছরের প্রথম থেকেই ভিন্ন ভিন্ন রঙের কন্ট্রাস্ট বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। পোশাকের সঙ্গে তাই মিলিয়ে নয়, এবার বৈশাখী ট্রেন্ডে আছে পোশাকের সঙ্গে কন্ট্রাস্ট করে অনুষঙ্গ ধারণ করার ব্যাপারটি।

পোশাকের রঙের কোনো একটি বেছে নিয়ে গয়না বা ব্যাগ ব্যবহার করা যেতে পারে। পায়ে দেয়ার জন্য হাইহিল স্যান্ডেলের পাশাপাশি শুও থাকছে এবারের ট্রেন্ডে। গয়নার ক্ষেত্রে রুপার পাশাপাশি তামা বা পিতলের এবং সেই সঙ্গে আধুনিক ডিজাইনের পুঁতির, কাপড়ের বা স্টোনের গয়নারও চল থাকবে। দেশি মাটির গয়না ব্যবহারে আপনার রুচি এবং পছন্দের যোগসূত্র পাইয়ে দেবে অন্য মাত্রা। বৈশাখের রঙিন পোশাকের সঙ্গে মাটির তৈরি গয়না আপনাকে করে তুলবে আরো অনন্য। মাটির মালা, কানের দুল, লম্বা পুঁতির মালা, কাঠের চুড়ি, গলার হার, পিতলের বালা, কানের দুল, অক্সিডাইজড কানের দুল ইত্যাদি গয়না বেছে নিতে পারেন আর নিজেকে করে তুলতে পারেন আরো আকর্ষণীয়। এসব গয়নায় থাকবে রঙের উজ্জ্বল উপস্থিতি।

হাতভরা চুড়ির বদলে মোটা একটা ব্রেসলেট, চুড়ি বা কড়ার চলটাই থাকছে সব থেকে বেশি। আর থাকছে আঙুলে বড় আংটি পরার ট্রেন্ড। পোশাক ও ঋতুর সঙ্গে মিলিয়ে হালকা মেকআপের ট্রেন্ড থাকছে। তবে লাল টিপ ও লিপস্টিকের সাজটাও চোখে পড়বে অনেক। জানা হয়ে গেল এ বছরের বৈশাখী ফ্যাশন ট্রেন্ডের ব্যাপারে। এখন এ ট্রেন্ডের সঙ্গে আপনার স্বাচ্ছন্দ্য, স্বস্তি ও বাজেট মিলিয়ে কিনে ফেলুন পছন্দের পোশাকটি। চাইলে টেইলরকে দিয়ে বানিয়েও নিতে পারেন নিজের ডিজাইনমতো। বৈশাখ শুধু আমাদের কাছে নতুন বছরের শুরু নয়, বৈশাখ মানে জীবনের নতুন স্পন্দন। নতুন বছর বয়ে আনুক নতুন শুভ আগামী।

x

Check Also

পলিথিন

সুপারশপে ১ অক্টোবর থেকে পলিথিন ও পলিপ্রপিলিন ব্যাগ নিষিদ্ধ

এমএনএ জীবনচর্চা ডেস্কঃ ১ অক্টোবর থেকে সুপারশপে কোনো পলিথিন শপিং ব্যাগ ও পলিপ্রপিলিনের ব্যাগ রাখা ...