শিক্ষাঙ্গন প্রতিবেদক
রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মুগদা শাখায় ‘কিশোর গ্যাং’-এর আধিপত্য এবং এক শিক্ষার্থীকে ধারাবাহিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগকারী অভিভাবক আয়েশা সিদ্দিকা দাবি করেছেন, তার চতুর্থ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছেলে দীর্ঘদিন ধরে বুলিং, র্যাগিং ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। একাধিকবার প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না পাওয়ায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরবর্তীতে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।
মামলায় আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রওশন জাহান, শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক মাহবুবুর রহমান, অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা হয়েছে।
মামলা ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আইডিয়াল স্কুলের মুগদা শাখার ইংরেজি ভার্সনের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। একই প্রতিষ্ঠানের বাংলা মাধ্যমের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন কিশোর দীর্ঘদিন ধরে তাকে বুলিং ও র্যাগিং করত বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথম বড় ঘটনা ঘটে গত ১৫ জানুয়ারি। ওইদিন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার পর সে ক্ষিপ্ত হয়ে ভুক্তভোগীকে মারধর, গলা চেপে ধরা এবং হুমকি দেয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর মা মুগদা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরবর্তীতে ৬ মে আরেকটি ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়েশা সিদ্দিকার দাবি, স্কুলের শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের প্ররোচনায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন কিশোর তার ছেলেকে স্কুলের পঞ্চম তলা থেকে মারতে মারতে নিচে নামিয়ে আনে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি ২০ মে সংঘটিত ঘটনার। মামলায় বলা হয়েছে, ওইদিন টিফিন ও নামাজের বিরতির সময় অভিযুক্তরা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভুক্তভোগীর চোখের পাশ ও কপালে আঘাত করে। পরে তাকে মারধর করে নিচে নিয়ে যাওয়া হয় এবং গলা চেপে ধরা হয়। সহপাঠীদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।
প্রথমে তাকে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ইসলামিক ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ঘটনার পরদিন ২১ মে মুগদা থানায় আরেকটি জিডি করেন ভুক্তভোগীর মা।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মা আয়েশা সিদ্দিকা দাবি করেন, তার ছেলে দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘কিশোর গ্যাং’-এর টার্গেটে পরিণত হয়েছিল।
তিনি বলেন, “ঘটনার দিন ক্লাসের অন্য শিক্ষার্থীরা আমাকে জানিয়েছে, একজন শিক্ষক আমার ছেলেকে মারধরের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমি বিষয়টি পুলিশকেও জানিয়েছি। একজন শিক্ষক কেন শিক্ষার্থীদের দিয়ে আরেক শিক্ষার্থীকে মারতে বলবেন, সেটিই আমার প্রশ্ন।”
তার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষকও অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের ভয় পান এবং অতীতেও তাকে সতর্ক করে বলেছেন যে অভিযুক্ত কিশোরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তারা আরও ক্ষিপ্ত হতে পারে।
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সাবেক সদস্য শাহাদত ঢালীও প্রতিষ্ঠানে কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, “কিছু শিক্ষার্থীর কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা জিম্মি অবস্থায় রয়েছে। অভিভাবকরা অভিযোগ জানাতে চাইলে অনেক সময় যথাযথ গুরুত্ব পান না। বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও ভয়ের কারণে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে চান না।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থী স্থানান্তর এবং প্রশাসনিক কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রওশন জাহান তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে জানান, ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “কমিটি শিক্ষার্থীদের বক্তব্য নেবে এবং প্রতিবেদন জমা দেবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চাপাতি দিয়ে হামলার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি প্রাথমিকভাবে খোঁজ নিয়ে এমন তথ্য পাইনি। তবে অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল বলে জানা গেছে।”
রওশন জাহান আরও জানান, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী একসময় ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিল এবং সে সময় কিছু শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, অভিযোগকারী অভিভাবক পূর্বে শিক্ষার্থীকে মুগদা শাখা থেকে মতিঝিল মূল ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের আবেদনও করেছিলেন।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে কোনো শিক্ষার্থী কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত বা গুরুতর অনিয়ম করেছে, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, এমনকি টিসি দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করা হবে।”
মামলায় আসামি হওয়া শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক মাহবুবুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, “অভিভাবক তার সন্তানকে অন্য শাখায় স্থানান্তর করতে চেয়েছিলেন। সেটি সম্ভব না হওয়ায় তিনি বিভিন্ন অভিযোগ তুলছেন বলে শুনেছি। আমাদের স্কুলে এমন ঘটনা ঘটে না।”
মুগদা শাখার প্রধান সহকারী প্রধান শিক্ষক (ডে শিফট, ইংরেজি ভার্সন) আবু বকর সিদ্দিক জানান, ঘটনার দিন তিনি অন্য একটি প্রশাসনিক কাজে মতিঝিলে অবস্থান করছিলেন। পরে বিষয়টি জেনে লিখিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।
কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কিছু বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অতীতে হুমকি-ধমকির অভিযোগ উঠেছিল।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, থানায় দায়ের করা জিডি এবং আদালতে চলমান মামলার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী পদক্ষেপ। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে। অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
