অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
উচ্চ সুদের হার, কমে আসা ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত এবং রপ্তানি বাজারে স্থবিরতার কারণে দেশের অর্থনীতি বাড়তি চাপে রয়েছে বলে মনে করছে ব্যবসায়ী মহল। তাদের মতে, রপ্তানি বৈচিত্র্য, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং নীতিগত সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক সেমিনারে এসব উদ্বেগ তুলে ধরেন সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ। ‘বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা’ শীর্ষক এই সেমিনারে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
তাসকীন আহমেদ বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতিমালা হালনাগাদ করা জরুরি। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখা, বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করা এবং রপ্তানিমুখী খাত বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ বাস্তবায়ন জরুরি। এতে খাতভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
ডিসিসিআই সভাপতি জানান, ২০২৫ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্ধারিত ২ লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হয়নি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ১ শতাংশ।
তিনি বলেন, ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এ প্রবণতা রাজস্ব আহরণ সক্ষমতার জন্য উদ্বেগজনক।
কর ব্যবস্থার দুর্বলতা কাটাতে সম্পূর্ণ অটোমেশন ও ডিজিটাল ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এ জন্য ই-নিবন্ধন, ই-রিটার্ন, ই-পেমেন্ট, ই-অডিট ও ই-রিফান্ডসহ পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা চালুর পাশাপাশি ভ্যাট, আয়কর ও কাস্টমসের তথ্য সমন্বিত একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরির প্রস্তাব দেন।
তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে নীতিগত সুদহার ১০ শতাংশে স্থির রয়েছে। এর প্রভাবে বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার ১৬ শতাংশ বা তারও বেশি হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ গ্রহণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রম ধীর হয়ে গেছে।
তিনি মনে করেন, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ধাপে ধাপে নীতিসুদ কমানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশীয় ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে, যা সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ১ শতাংশে এলেও খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে রয়েছে।
তার মতে, মূল্যস্ফীতি কোনো সাময়িক সংকট নয়; বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা ও নীতিগত দুর্বলতার ফল। বাজারে অব্যবস্থাপনা, অবৈধ সিন্ডিকেট এবং অতিরিক্ত সরকারি ঋণ গ্রহণ এর পেছনে ভূমিকা রাখছে।
তিনি বাজার তদারকি জোরদার করা, মজুতবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ, সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
ডিসিসিআই সভাপতি জানান, ২০২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২২ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে ঋণপত্র খোলা ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও কমে গেছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ মনোভাব তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে আমদানি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
এই পরিস্থিতিতে ঐতিহ্যগত বাজারের বাইরে নতুন বাজার সম্প্রসারণে কৌশলগত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার বাজারে পণ্যভিত্তিক রপ্তানি কৌশল গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন।
তাসকীন আহমেদ বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কৃষি খাতের জিডিপিতে অবদান কমে ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি জানান, বর্তমানে মাত্র ৫০ শতাংশ কৃষক যান্ত্রিক চাষাবাদ ব্যবহার করেন, যেখানে ভারতে এ হার প্রায় ৮০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে টার্গেটেড ভর্তুকি এবং জামানতবিহীন স্বল্পসুদের ঋণের মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ত্বরান্বিত করার সুপারিশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি ১৯ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার হলেও আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে। এ পরিস্থিতিতে ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন, মারকোসুর এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ম্যানমেড ফাইবারভিত্তিক পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক

