Don't Miss
Home / হোম স্লাইডার / কবি সুফিয়া কামালের ১০৬তম জন্মদিন আজ

কবি সুফিয়া কামালের ১০৬তম জন্মদিন আজ

এমএনএ রিপোর্ট : নারীমুক্তি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুরোধা কবি এবং মহিয়সী নারী সুফিয়া কামালের ১০৬তম জন্মদিন আজ। ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে একটি অভিজাত পরিবারে তার জন্ম।

স্বাধীন বাংলাদেশে নারী জাগরণের অগ্রদূত জননী সাহসিকা কবি বেগম সুফিয়া কামাল। কবিতাকে শাণিত হাতিয়ার করে আজীবন কথা বলেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। বহুমাত্রিক প্রতিভাময়ী এই নারী আমৃত্যু মুক্তবুদ্ধির চর্চার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিপক্ষে সংগ্রাম করেছেন। সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যে কোন গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামেও রেখেছেন সোচ্চার ভূমিকা। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে এবং অন্যায় ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে চিরকালই ছিলেন সোচ্চার।

সুফিয়া কামাল যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেখানে নারী শিক্ষাকে প্রয়োজনীয় মনে করা হতো না। তার বাবা সৈয়দ আবদুল Sufia-Kamal-04.বারী ছিলেন একজন আইনবিদ। মা সাবেরা বেগমের কাছে পড়তে শেখেন তিনি। তিনি ছিলেন বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক।

মাত্র বারো বছর বয়সে সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তার স্বামী সাহিত্য পাঠে তাকে আগ্রহী করে তোলেন। যা তাকে পরবর্তীকালে সাহিত্য রচনায় উদ্বুদ্ধ করে তোলে। তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ না করেও তার মনোগঠনে দেশ, মানুষ, সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতি মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। বাংলার মানুষ তাকে ‘জননী সাহসিকা’ উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯১৮ সালে কলকাতায় গিয়েছিলেন সুফিয়া কামাল। সেখানে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিলো। বেগম রোকেয়ার আদর্শ তাকে প্রভাবিত করে। সুফিয়া কামালের কাজেকর্মেও বেগম রোকেয়ার ছাপ পাওয়া যায়।

১৯২৩ সালে তিনি রচনা করেন প্রথম গল্প ‘সৈনিক বধূ’ যা বরিশালের তরুণ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯২৬ সালে সওগাত পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা বাসন্তী প্রকাশিত হয়। মহাত্মা গান্ধীর সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি কিছুদিন চরকায় সুতা কাটেন। সে সময়ে ‘মাতৃমঙ্গল’ নামে একটি নারী কল্যাণমূলক সংগঠনে যোগ দেন। ১৯২৯ সালে তিনি বেগম রোকেয়ার ‘আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলামে যোগ দেন। ১৯৩১ সালে তিনি মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম ইন্ডিয়ান মহিলা ফেডারেশনের সদস্য নির্বাচিত হন।

Sufia-Kamal....তার স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে ১৯৩২ থেকে ৪১ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা কর্পোরেশন প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ত্রিশের দশকে কলকাতায় থাকার সময় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র ও বেগম রোকেয়ার মতো দিকপালদের সান্নিধ্য পান তিনি। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’। এই কাব্যগ্রন্থে ভূমিকা লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। বাড়তি প্রাপ্তি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রশংসা। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো হচ্ছে- সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মন ও জীবন, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী, দিওয়ান, মোর জাদুদের সমাধি পরে প্রভৃতি। গল্পগ্রন্থ ‘কেয়ার কাঁটা’। ভ্রমণকাহিনী ‘সোভিয়েত দিনগুলি’। স্মৃতিকথা ‘একাত্তরের ডায়েরি’। সুফিয়া কামাল ৫০টিরও বেশি পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি, সোভিয়েত লেনিন, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পুরস্কার, স্বাধীনতা দিবস পদক উল্লেখযোগ্য।

প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯৩৯ সালে কামালউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে সংসার শুরু করেন সুফিয়া কামাল। ১৯৪৭ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। সে সময়ের নারী বিষয়ক উপমহাদেশের প্রথম সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন তিনি। এর মাঝে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সরাসরি যোগ দেন। ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন শিশুদের সংগঠন ‘কচিকাঁচার মেলা’। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার Sufia-Kamalবিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন তিনি। এ সময় একদল তরুণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গঠন করেন সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ছায়ানটের সভাপতি ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম পরিষদ (বর্তমানে মহিলা পরিষদ) গঠিত হলে প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাচিত হন। এ বছরই তিনি অংশ নেন গণঅভ্যুত্থানে। বর্জন করেন পাকিস্তান সরকারের দেয়া ‘তমঘা-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে গেছেন অকুতোভয় সহযোগিতা।

তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো হচ্ছে- সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মন ও জীবন, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী, দিওয়ান, মোর জাদুদের সমাধি পরে প্রভৃতি। গল্পগ্রন্থ ‘কেয়ার কাঁটা’। স্মৃতিকথা ‘একাত্তুরের ডায়েরি’।

সুফিয়া কামাল ৫০টির বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মাঝে উল্ল্যেখযোগ্য কয়েকটি:

বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬২), সোভিয়েত লেনিন পদক (১৯৭০), একুশে পদক (১৯৭৬), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯২), জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (১৯৯৫), দেশবন্ধু সি আর দাস গোল্ড মেডেল (১৯৯৬), স্বাধীনতা দিবস পদক (১৯৯৭)।

১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়। বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এ সম্মান লাভ করেন।

Sufia-Kamal-7..সাহিত্যে তাঁর সৃজনশীলতা ছিল অবিস্মরণীয়। শিশুতোষ রচনা ছাড়াও দেশ, প্রকৃতি, গণতন্ত্র, সমাজ সংস্কার এবং নারীমুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর লেখনী আজও পাঠককে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত করে। সুফিয়া কামালের জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে নানা কর্মসূচী। ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট জন্মদিনে স্মরণ করবে সুফিয়া কামালকে। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিকে একক ও সম্মেলক গান, পাঠ ও আবৃত্তিতে জানাবে ভালবাসা। আজ সোমবার বেলা ১১টায় ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনের রমেশচন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

এছাড়াও কবির জন্মদিন উদযাপন করবে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। আজ সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে এ উপলক্ষে সুফিয়া কামাল স্মারক বক্তৃতা, সম্মাননা প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ অনুষ্ঠানে কবি সুফিয়া কামাল সম্মাননা প্রদান করা হবে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হককে।

‘সুফিয়া কামাল ও একুশ শতকের নারী আন্দোলন’ স্মারক বক্তৃতা দেবেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন। কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সংগীত পরিবেশন করবেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পীরা। এ Sufia-Kamal-6বছর সুফিয়া কামাল সম্মাননা পদক পাচ্ছেন অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক।

এদিকে দিনটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, কবি সুফিয়া কামাল নারী সমাজকে কুসংস্কার আর অবরোধের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের নারী সমাজের এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় আদর্শ। দেশের সকল প্রগতিশীল আন্দোলন সংগ্রামে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সুফিয়া কামাল নারীদের সংগঠিত করে মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা, দেশাত্মবোধ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, সুফিয়া কামাল ছিলেন একদিকে আবহমান বাঙালি নারীর প্রতিকৃতি, মমতাময়ী মা; অন্য দিকে বাংলার প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে ছিল তার দৃপ্ত পদচারণা। বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামসহ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তার প্রত্যক্ষ উপস্থিতি তাকে জনগণের ‘জননী সাহসিকা’ উপাধিতে অভিষিক্ত করেছে।

x

Check Also

জুলাই অভ্যুত্থান মামলায় কাদেরসহ যুবলীগ-ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ১৪ জুন

আদালত প্রতিবেদক জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ...