মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী (এমএনএ) : নবগঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। ঢাবি ছাত্রলীগের বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা-কর্মী এবং কখনও ছাত্রদলের কর্মসূচিতে অংশ নেননি এমন অনেককেই পদায়ন করা হয়েছে কমিটিতে।
অভিযোগ রয়েছে, সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার বিবাহিত এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল বাসার সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা রয়েছে।
গত শনিবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর বিভিন্ন হলের কমিটি গঠন করা হয়। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাজীব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান কমিটি অনুমোদন করেন। কমিটি গঠনের পর থেকেই তৃণমূল থেকে সর্বত্র শুরু হয় তুমুল বিতর্ক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কমিটিতে এমন অনেকেই আছেন যারা বর্তমানে ছাত্রলীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল উভয় শিবিরেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ছাত্রদলের একাংশের অভিযোগ, জাতীয়তাবাদী আদর্শ ধারণ না করা সত্ত্বেও ছাত্রদলের কমিটিতে ছাত্রলীগের পদবিধারীদের রাখা সংগঠনের আদর্শের পরিপন্থী।
অপরদিকে ছাত্রলীগে বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একটি অংশ বলছে, ছাত্রলীগের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরির উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হয়েছে। অন্য একদল বলছে, ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকাতেই তারা পদ পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে ছাত্রলীগ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের কমিটিতে এমন অনেকেই রয়েছেন যারা কখনোই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। কমিটি ঘোষণার পর এমন অনেকেই তাদের অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাংবাদিকদের কাছে। জহুরুল হক হলের কমিটিতে সদস্য পদ দেয়া হয়েছে এমন তিনজন কাছে অভিযোগে বলেন, তারা কখনোই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণে তারা কমিটিতে দেয়া নাম এবং নিজেদের সার্টিফিকেটের নামের ভিন্নতার বিষয়টি জানান।
তাদের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকে নাম সংগ্রহ করে তাদের মতামত ছাড়াই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যার সঙ্গে তাদের আসল নামের মিল নেই।
তাদের অভিযোগ, ছাত্রদলের কমিটিতে নাম দিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় করতেই এমনটি করা হয়েছে। ওই তিনজন হলেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের মো. শরীফ রাফাসান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের আশরাফুল আলম ও লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নাফিস সাদিক। এদের প্রত্যেকেই দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
এছাড়া ছাত্রদলের হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের কমিটিতে ওই হলের ছাত্রলীগের সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক মারুফ হাসান, ছাত্র বৃত্তিবিষয়ক উপ-সম্পাদক মহিউদ্দিন মহি এবং উপপ্রচার সম্পাদক আবদুর রহমান রনি নামের তিনজনকে সদস্য করা হয়েছে। তবে তারা ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলসহ বেশ কয়েকটি হলের কমিটিতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে ছাত্রলীগের পদে থেকে যারা ছাত্রদলে পদ পেয়েছেন তাদের ব্যাপারে ছাত্রলীগ তদন্ত শুরু করেছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। বিষয়টি নিয়ে ছাত্রলীগ আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সংবাদ সম্মেলন করতে পারে।
এছাড়া নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের ২০০২-০৩ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি সূর্যসেন হলে ছিলেন। বর্তমানে তার কোনো ছাত্রত্ব নেই। ড্রপ আউটের কারণে স্নাতক শেষ করলেও শেষ করতে পারেননি স্নাতকোত্তর।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৬ সালে রাজধানীর পুরান ঢাকায় তিনি বিয়ে করেন। এর দুই বছর পর প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিয়ে আরও একটি বিয়ে করেন। এছাড়া ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম চুরির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ফলে হল শাখার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক করিম সরকার তাকে কিছুদিনের জন্য হল থেকে বের করে দেন বলে জানা গেছে।
সাধারণ সম্পাদক আবুল বাসার সিদ্দিকী ২০০৩-০৪ সেশনের পালি বিভাগের ছাত্র। তিনি জসীমউদদীন হলে ছিলেন। ২০১১ সালের ১৪ মার্চ ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগে শাহবাগের হোটেল ইয়ামেনী ইন্টারন্যাশনালে র্যাবের হাতে ধরা পড়েন। পরে শাহবাগ থানায় তার বিরুদ্ধে এসআই অহিদুর রহমান মজুমদার বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। মামলা নং-২৯/১৪১। মামলার এজাহার অনুযায়ী এ সময় সিদ্দিকীর কাছ থেকে ৫০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। যার ভিত্তিতে পরবর্তীকালে তিনি কারাভোগও করেন।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নন এমন অনেককে নবঘোষিত ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এদের মধ্যে কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদক পদ পাওয়া সৈয়দ শামসুজ্জামান রয়েছেন। তিনি কবি জসীমউদদীন হলের আবাসিক ছাত্র পরিচয় দিলেও মূলত তিনি ঢাবির ছাত্র নন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে।
এদিকে ছাত্রদলের কমিটি গঠনের পরই ক্যাম্পাসে সতর্ক অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ। গতকাল রবিবার সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পাহারা বসায়। তবে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা কিংবা কোনো কর্মসূচি দেয়া হয়নি।
এসব বিষয়ে জানতে ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কাউকেই ফোনে পাওয়া যায়নি। পরে কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক মো. আবদুস সাত্তার পাটোয়ারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সীকে জানান, আমার জানা মতে এমন কেউ কোনো পদে আসেননি। যারা কমিটিতে এসেছেন ইতিপূর্বে তাদের নিয়ে টিম করে আমরা মিটিং করেছি। তারা সেখানে দস্তখত করেছেন। সেভাবেই পরবর্তীকালে কমিটি দেয়া হয়েছে। পরে যদি বিবাহিত কিংবা ছাত্রলীগের কেউ কমিটিতে এসে থাকেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ছাত্রলীগের পদধারীদের ছাত্রদলে পদ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সীকে বলেন, এমন কয়েকটি ঘটনা আমরা শুনেছি। অভিযুক্তদের ব্যাপারে তদন্ত চলছে। ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রমাণিত হলে তাদের ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হবে। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। ছাত্রলীগ আদর্শবাদী সংগঠন। এখানে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ মেনে নেয়া হবে না।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক





