টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের নতুন কহেলা কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগকে কেন্দ্র করে নতুন করে জটিলতা দেখা দিয়েছে। সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলী আহসান দায়িত্ব ছাড়ার পর শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া মো. তাজুল ইসলামকে বাদ দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এক প্রভাষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, কলেজের পলাতক সাবেক অধ্যক্ষ ইমাম হোসেন মোহাম্মদ ফারুক এবং মির্জাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আশুতোষ ভৌমিককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব কলেজের সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
তবে শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে বর্তমানে মো. তাজুল ইসলামের প্রতি স্থানীয় শিক্ষক ও এলাকাবাসীর সমর্থন রয়েছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে কলেজ এলাকায় অস্থিরতা বিরাজ করছে।
কলেজ সূত্রের দাবি, আশুতোষ ভৌমিককে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ সফল না হলে একজন নারী প্রভাষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার চেষ্টা হতে পারে। ওই শিক্ষিকার স্বামী সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রকাশ্যে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাঈদ সোহরাবের পক্ষে কাজ করেছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। এ কারণে স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে ওই পরিবারের বিরোধ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। ওই শিক্ষিকাকে দায়িত্ব দেওয়া হলে কলেজের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
ফুটবল টুর্নামেন্টের নামে অর্থ দাবির অভিযোগ
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে জটিলতার পাশাপাশি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দারের বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত ‘প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’ আয়োজনের জন্য নতুন কহেলা কলেজের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে।
কলেজ সূত্রের দাবি, এ অর্থ সংগ্রহের জন্য আসন্ন উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ২০০ টাকা করে নেওয়ার মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু নতুন কহেলা কলেজ নয়, উপজেলার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও একইভাবে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
কলেজ সূত্র জানায়, নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্রে জালিয়াতি ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে কারিগরি শাখায় এমপিওভুক্ত হয়ে ২০১৭ সাল থেকে অবৈধভাবে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে সাবেক অধ্যক্ষ ইমাম হোসেন মোহাম্মদ ফারুকের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তারা ফারুককে কলেজ থেকে বের করে দেন। এরপর থেকে তিনি এলাকায় প্রবেশ করতে পারেননি। তবে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দারের সহযোগিতায় গত দুই বছর ধরে কলেজে দায়িত্ব পালন না করেও তিনি নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কলেজ সূত্র আরও জানায়, জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তোলন করা অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে একাধিকবার নির্দেশ ও তাগাদা দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা তা মানেননি। গত দুই বছর ধরে এসব দপ্তর থেকে তাগাদা দেওয়া হলেও অর্থ এখনো সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি বলে সূত্রের দাবি।
সাবেক অধ্যক্ষ ফারুকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতিষ্ঠানের গাছ কেটে বিক্রি, অর্থ আত্মসাৎ এবং কলেজের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তাকে সহযোগিতা করছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এ ছাড়া সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো সাবেক অধ্যক্ষ ফারুককে পুনরায় চাকরিতে ফিরিয়ে নিতে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মো. নাসির উদ্দিন বাবলুর ওপর চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগও উঠেছে জুলফিকার হায়দারের বিরুদ্ধে। তাকে চাকরিতে ফিরিয়ে না নিলে কলেজের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব ঘটনায় কলেজের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষক ও স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। তারা সাবেক অধ্যক্ষ ইমাম হোসেন মোহাম্মদ ফারুক ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দারের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
নিয়োগ ও এমপিও নিয়ে পুরোনো বিতর্ক
জানা গেছে, ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত নতুন কহেলা কলেজের সাধারণ শাখায় অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পান ইমাম হোসেন মোহাম্মদ ফারুক। ২০০৪ সালে কলেজটির কারিগরি শাখা এমপিওভুক্ত হলে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি ওই শাখায় অধ্যক্ষ হিসেবে এমপিওভুক্ত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ২০১০ সালের ৮ মার্চ তিনি পদত্যাগ করেন। একই বছরের ১ এপ্রিল ঢাকার উত্তরায় উত্তরা ক্রিডেন্স কলেজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। সেখানেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তার চাকরি চলে যায় বলে কলেজ সূত্র জানিয়েছে।
পরবর্তীতে কলেজের তৎকালীন সভাপতি ও টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান খানের কাছে নিজের আগের চাকরি ও পদত্যাগের তথ্য গোপন করে এবং কাগজপত্রে জালিয়াতির মাধ্যমে ছয় বছর পর, ২০১৭ সালে, নতুন কহেলা কলেজে পুনরায় যোগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর থেকে তিনি অবৈধভাবে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করে আসছেন বলে সূত্রের দাবি।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয়রা তাকে কলেজ থেকে বের করে দেন। এরপর কলেজের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তার হেফাজতে চলে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। নথিপত্র ফেরত দেওয়ার জন্য সরকারি বিভিন্ন দপ্তর থেকে চিঠি দেওয়া হলেও তিনি সেগুলো ফেরত দেননি বলে কলেজ সূত্র জানিয়েছে।
এ ঘটনায় নথিপত্র উদ্ধারের জন্য টাঙ্গাইল জেলা আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মির্জাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার এবং কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ইমাম হোসেন মোহাম্মদ ফারুকের বক্তব্য জানতে চাইলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মোহাম্মদী নিউজ এজেন্সী নিউজ – ফিচার – ফটো নেটওয়ার্ক
